কিভাবে আমরা দ্রুত আল্লাহর সাথে সুসম্পর্ক করতে পারি?

মানুষের হৃদয়কে মহান আল্লাহ তায়ালা এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, এটি পৃথিবীর কোনো ধন-সম্পদ, খ্যাতি বা ভালোবাসায় পরিপূর্ণ তৃপ্তি পায় না; যতক্ষণ না সে তার রবের সাথে যুক্ত হয়। আমরা যখন আল্লাহর থেকে দূরে সরে যাই, তখন আমাদের ভেতরে এক অজানা শূন্যতা ও হাহাকার তৈরি হয়। রবের সাথে ছিন্ন হওয়া এই সম্পর্ক পুনরায় জুড়ে দেওয়া এবং তাঁর নৈকট্য লাভ করা খুব কঠিন কিছু নয়। আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দার জন্য সবসময় অধীর অপেক্ষায় থাকেন। নিচে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আল্লাহর সাথে দ্রুত সুসম্পর্ক গড়ার কিছু কার্যকরী ও হৃদয়স্পর্শী উপায় আলোচনা করা হলো:

চোখের পানিতে একনিষ্ঠ তওবা (প্রথম ধাপ)

আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপনের প্রথম দরজা হলো 'তওবা' বা ফিরে আসা। আপনার গুনাহের পাহাড় যত বড়ই হোক না কেন, আল্লাহর রহমতের সাগর তার চেয়ে অনন্ত গুণ বড়। শয়তান আমাদের হতাশ করে বোঝায় যে, "তোর দ্বারা আর হবে না।" কিন্তু আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত মমতার সাথে ডাক দিয়ে বলেন:

قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا
অর্থ: "বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন।" (সূরা আয-যুমার: ৫৩)
হৃদয়ের উপলব্ধি: রাতের অন্ধকারে যখন কেউ দেখবে না, তখন ওজু করে জায়নামাজে বসুন। নিজের অতীতের সব ভুলের কথা স্মরণ করে শিশুর মতো কাঁদুন এবং বলুন, "হে আমার রব! আমি পথ হারিয়ে ফেলেছিলাম, আমি আবার আপনার কাছে ফিরে এসেছি, আমাকে আপনি ফিরিয়ে দিয়েন না।" এই একটি মুহূর্তের সত্য তওবা আপনাকে নিমেষেই আল্লাহর সবচেয়ে কাছের বান্দায় পরিণত করতে পারে।

নামাজের মাধ্যমে রবের সাথে সরাসরি কথোপকথন

আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গড়ার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো সালাত বা নামাজ। নামাজ শুধু কোনো রুটিন কাজ নয়, এটি হলো রবের সাথে বান্দার সরাসরি প্রাইভেট মিটিং। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত চমৎকার একটি কথা বলেছেন:

وَإِنْ تَقَرَّبَ إِلَيَّ شِبْرًا تَقَرَّبْتُ إِلَيْهِ ذِرَاعًا، وَإِنْ أَتَانِي يَمْشِي أَتَيْتُهُ هَرْوَلَةً
অর্থ: "বান্দা যদি আমার দিকে এক বিঘত অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে এক হাত অগ্রসর হই। সে যদি আমার দিকে হেঁটে আসে, আমি তার দিকে দৌড়ে যাই!" (সহীহ বুখারী: ৭৪০৫)
বাস্তব আমল: আজ থেকে সিদ্ধান্ত নিন, আজানের সাথে সাথে পৃথিবীর সব ব্যস্ততা ছেড়ে দেবেন। নামাজে দাঁড়িয়ে যখন আপনি "আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন" বলেন, মনে করবেন স্বয়ং আল্লাহ আপনার কথার জবাব দিচ্ছেন। সিজদায় গিয়ে মন খুলে নিজের ভাষায় আল্লাহর কাছে আপনার সব দুঃখ, কষ্ট ও চাওয়াগুলো পেশ করুন। কারণ, সিজদারত অবস্থায় বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে কাছাকাছি থাকে।
"যে ব্যক্তি আল্লাহকে পেয়ে গেল, সে আসলে কী হারালো?
আর যে আল্লাহকে হারালো, সে জীবনে কী-ই বা পেল!"

নিভৃত রজনীতে তাহাজ্জুদ ও মোনাজাত

দিনের বেলায় আমরা সবাই আল্লাহকে ডাকি, কিন্তু রাতের গভীরে যখন পৃথিবী ঘুমিয়ে থাকে, তখন যে ব্যক্তি শুধু তাঁর রবের ভালোবাসায় বিছানা ছাড়ে, আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা অকল্পনীয়।

প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ তায়ালা প্রথম আসমানে নেমে আসেন এবং ডাকতে থাকেন, "কে আছো আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আছো আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব?" (সহীহ মুসলিম)। দ্রুত সম্পর্ক গড়তে চাইলে সপ্তাহে অন্তত ২/১ দিন তাহাজ্জুদের জায়নামাজে চোখের পানি ফেলার অভ্যাস করুন। আপনার আর আল্লাহর মাঝের সমস্ত পর্দা এই চোখের পানি ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে দেবে।

সার্বক্ষণিক আল্লাহর জিকির ও কুরআনের সাথে বন্ধুত্ব

যার সাথে আমাদের সম্পর্ক ভালো থাকে, আমরা সবসময় তার কথাই স্মরণ করি। আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গভীর করতে চাইলে উঠতে-বসতে, চলতে-ফিরতে সব অবস্থায় তাঁকে স্মরণ করতে হবে।

أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
অর্থ: "জেনে রাখো, কেবল আল্লাহর স্মরণেই (জিকির) অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।" (সূরা আর-রাদ: ২৮)
কীভাবে করবেন? রাস্তায় হাঁটার সময় বা বাসে বসে থাকার সময় অযথা ফোন না টিপে মনে মনে 'সুবহানাল্লাহ', 'আলহামদুলিল্লাহ', 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ', 'আস্তাগফিরুল্লাহ' পড়তে থাকুন। এবং প্রতিদিন অল্প হলেও অর্থসহ কুরআন তিলাওয়াত করুন। মনে রাখবেন, আপনি যখন দোয়া করেন, তখন আপনি আল্লাহর সাথে কথা বলেন। আর আপনি যখন কুরআন পড়েন, তখন আল্লাহ আপনার সাথে কথা বলেন।

আল্লাহর বান্দাদের প্রতি সদয় হওয়া

আল্লাহর প্রেম পেতে হলে তাঁর সৃষ্টির প্রতি দয়ালু হতে হবে। মানুষের উপকার করুন, কারো মনে কষ্ট দেবেন বিন্দু পরিমাণও, সাধ্যমতো দান-সদকা করুন এবং রাগ নিয়ন্ত্রণ করুন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমরা জমিনবাসীদের প্রতি দয়া করো, আসমানওয়ালা (আল্লাহ) তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।"

শেষ কথা

আল্লাহর সাথে সম্পর্ক একদিনে তৈরি হয় না, এটি একটি ধারাবাহিক সাধনা। আজই, এই মুহূর্ত থেকেই শুরু করুন। একটি সুন্দর ওজু করে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ুন এবং আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করুন। দেখবেন, আপনার জীবনের সমস্ত হতাশা কেটে গিয়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি আপনার হৃদয়কে ভরিয়ে দিয়েছে।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর প্রিয় ও নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করে নিন। আমিন।