ইসলামিক প্রশ্নোত্তর - বিবাহ না করার হুকুম
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيم

ফতোয়া ও মাসআলা বিভাগ

প্রশ্নকারী: আব্দুল্লাহ

প্রশ্ন: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। যে ব্যক্তি দৃঢ় সংকল্প করে যে, সে বিবাহ করবে না—যাতে ইসলাম ও মুসলমানদের সেবায় (ইলম অর্জনসহ অন্যান্য বিভিন্ন উপায়ে) নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করার অবকাশ পায়; এবং তার এ ব্যাপারে পূর্ণ আস্থা থাকে যে, সে যিনায় লিপ্ত হবে না—এমন ব্যক্তির হুকুম কী? তার জন্য কি বিবাহ না করা হারাম বা গুনাহের কাজ হবে? নাকি কোনো কোনো পরিস্থিতিতে তার জন্য বিবাহ না করাই ফযীলত বা উত্তম আমল হতে পারে?

ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

ইসলাম ও মুসলমানদের খেদমতে নিজেকে পূর্ণরূপে নিয়োজিত করার যে মহতী সংকল্প আপনি করেছেন, আল্লাহ তাআলা তা কবুল করুন এবং আপনাকে এর উত্তম জাযা দান করুন। তবে, ইলম অর্জন বা দ্বীনের খেদমতের উদ্দেশ্যে চিরতরে বিবাহ না করার দৃঢ় সংকল্প করা ইসলামী শরীয়ত এবং হানাফী মাযহাবের দৃষ্টিকোণ থেকে সুন্নাহ পরিপন্থী একটি কাজ। নিচে কুরআন, হাদিস এবং নির্ভরযোগ্য ফিকহের আলোকে বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. পবিত্র কুরআনের নির্দেশনা

ইসলামে বৈরাগ্যবাদ বা সংসারবিরাগী (Rahbaniyyah) জীবনযাপনের কোনো স্থান নেই। আল্লাহ তাআলা বৈরাগ্যবাদকে প্রত্যাখ্যান করে এরশাদ করেন:

وَرَهْبَانِيَّةً ابْتَدَعُوهَا مَا كَتَبْنَاهَا عَلَيْهِمْ إِلَّا ابْتِغَاءَ رِضْوَانِ اللَّهِ فَمَا رَعَوْهَا حَقَّ رِعَايَتِهَا

"আর বৈরাগ্যবাদ—এটা তো তারা নিজেরাই উদ্ভাবন করেছিল; আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় আমি তাদেরকে এর বিধান দিইনি; তবুও তারা এটা যথাযথভাবে পালন করেনি।"

— (সূরা আল-হাদীদ: ২৭)

২. হাদিস শরীফের আলোকে

রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) উম্মতকে বিবাহ করার প্রতি জোরালো তাগিদ দিয়েছেন এবং চিরকুমার থাকার সংকল্পকে সরাসরি নিষেধ করেছেন।

أَمَا وَاللَّهِ إِنِّي لَأَخْشَاكُمْ لِلَّهِ وَأَتْقَاكُمْ لَهُ، لَكِنِّي أَصُومُ وَأُفْطِرُ، وَأُصَلِّي وَأَرْقُدُ، وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ، فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي

হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিন ব্যক্তি নবীজীর ইবাদত সম্পর্কে জানার পর তাদের একজন বলেছিলেন, "আমি কখনোই বিবাহ করব না (যাতে সারাজীবন ইবাদত করতে পারি)।" নবীজী (সা.) এই কথা শুনে কঠোরভাবে বললেন: "আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভয় করি... আমি রোযা রাখি আবার ভাঙি, রাতে নামাজ পড়ি আবার ঘুমাই এবং আমি নারীদের বিবাহ করি। সুতরাং যে ব্যক্তি আমার সুন্নাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, সে আমার দলভুক্ত নয়।"

— (সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৫০৬৩; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৪০১)

হযরত সাদ ইবনে হিশাম (রা.) বর্ণনা করেন:

نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ التَّبَتُّلِ

"রাসূলুল্লাহ (সা.) তিবাত্তুল (নারীসঙ্গ ত্যাগ করে চিরকুমার থেকে ইবাদতে মগ্ন হওয়া)-কে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।"

— (সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৫০৭৩)

৩. হানাফী মাযহাবের ফতোয়া

হানাফী মাযহাবের নির্ভরযোগ্য ফিকহ গ্রন্থগুলোতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, নফল ইবাদত বা ইলম অর্জনের জন্য বিবাহ বর্জন করার চেয়ে বিবাহ করা উত্তম।

ফতোয়ায়ে শামী (রদ্দুল মুহতার) গ্রন্থে আল্লামা ইবনে আবিদীন (রহ.) উল্লেখ করেন:

"বিবাহ হলো সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ... এবং নফল ইবাদতে নিজেকে সম্পূর্ণ নিয়োজিত করার চেয়ে বিবাহ করা উত্তম। কারণ এর মাধ্যমে রাসূল (সা.) এর উম্মত বৃদ্ধি পায়, সমাজ পুতঃপবিত্র থাকে এবং চোখ ও লজ্জাস্থানের হেফাজত হয়।" (রদ্দুল মুহতার: ৩/৬)

হানাফী মাযহাবের ইমামগণের মতে, যদি কোনো ব্যক্তির শারীরিক সক্ষমতা থাকে এবং বিবাহের সামর্থ্য থাকে, তবে তার জন্য আজীবন বিবাহ না করার সংকল্প করা 'মাকরুহে তাহরীমী' (হারামের কাছাকাছি) বা অন্তত মাকরুহে তানযীহী।

৪. ইসলামিক স্কলারগণের অভিমত

  • ইলমের জন্য সাময়িক বিলম্ব: ইলম (জ্ঞান) অর্জনের জন্য বা দ্বীনের বিশেষ কোনো প্রজেক্ট শেষ করার জন্য সাময়িক সময়ের জন্য বিবাহ পিছিয়ে দেওয়া জায়েজ আছে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) তাঁর বিখ্যাত ছাত্র ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-কে ইলম অর্জন শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিবাহে তাড়াহুড়ো করতে নিষেধ করেছিলেন।
  • কিছু স্কলার কেন অবিবাহিত ছিলেন? ইতিহাসে ইমাম নববী (রহ.), ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) প্রমুখ মহান স্কলার অবিবাহিত ছিলেন। শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ (রহ.) তাঁর 'আল-উলামাউল উযযাব' গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, তারা বিবাহকে অবজ্ঞা বা সুন্নাহর খেলাফ মনে করে বিবাহ ছাড়েননি; বরং তারা ইলম চর্চায় এতটাই ডুবে ছিলেন যে, তারা ভয় পেয়েছিলেন বিবাহ করলে স্ত্রীর হক (অধিকার) ঠিকমতো আদায় করতে পারবেন না। স্ত্রীর হক নষ্ট হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকলে তখন বিবাহ না করাই বৈধ।

সারসংক্ষেপ ও শরয়ী হুকুম

১. হারাম কি না? যদি আপনার যিনায় লিপ্ত হওয়ার কোনো ভয় না থাকে, তবে বিবাহ না করা সরাসরি 'হারাম' বা কবিরা গুনাহ হবে না।

২. মাকরুহ বা অপছন্দনীয়: তবে, ইলম চর্চার অজুহাতে আজীবন চিরকুমার থাকার দৃঢ় সংকল্প করা সুন্নাহর খেলাফ এবং হানাফী মাযহাব অনুযায়ী এটি মাকরুহ। এটি কখনোই উত্তম আমল বা ফযীলতের কাজ হতে পারে না।

৩. সঠিক পন্থা: শ্রেষ্ঠ আমল হলো নবীজীর সুন্নাত অনুসরণ করা। দ্বীনের খেদমত এবং বিবাহ—দুটোই একসাথে চালিয়ে নেওয়া সম্ভব, যেমনটা সাহাবায়ে কেরাম এবং সালাফে সালেহীনগণ করেছেন। একজন নেককার স্ত্রী আপনার দ্বীনের কাজে বাধা নয়, বরং বড় সহায়ক হতে পারেন।

আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।