ইসলামিক প্রশ্নোত্তর - তালাকের ওয়াসওয়াসা ও সন্দেহ
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيم

ফতোয়া ও মাসআলা বিভাগ

প্রশ্নকারী: Mahdi hasan Tanvir

প্রশ্ন: আসসালামুয়ালাইকুম হুজুর। আমার নাম তানভীর। আমি গোপালগঞ্জ থেকে বলছি। আমি সদ্য বিবাহিত। হুজুর আমি চরম ভাবে তালাকের ওয়াসওয়াসাতে আক্রান্ত। আমার কয়েকটি প্রশ্ন আছে:
১. একবার আমি নামাজে যাওয়ার সময় আমার স্ত্রী আমাকে মজা করে বললো, তুমি নামাজে যাওয়ার পর আমি ঘর থেকে বের হয়ে চলে যাবো। তখন আমি বললাম "তুমি যাও তো"। তখন আমার মনে তালাক দেয়ার ইচ্ছা ছিল না কখনোই, কিন্তু ইচ্ছা ছিল এমন, "যে তুমি একেবারেই চলে যাও। তুমি চলে গেলে তো আমার ভালোই হয়"।
২. আবার মাঝে মাঝে বলে যে তুমি আমাকে বিয়ে করেছো কেনো তখন আমি বলি যে "তুমি ইচ্ছা করলে চলে যেতে পারো একেবারেই"। উদ্দেশ্য থাকে "তোমার ইচ্ছা হলে তুমি চলে যাও", তালাক দেয়ার কোনো ইচ্ছা নেই।
৩. মাঝে মাঝে আমার অনেক তালাক সংক্রান্ত চিন্তা আসে কিন্তু যখন চিন্তা চলে যায় তখন আমি মনে করতে পারি না যে এইগুলো আমি কি আসলেই বলেছি নাকি শুধু চিন্তা করেছি। এমতাবস্থায় আমি কি করবো?
৪. হুজুর তালাকের শব্দ যদি কেউ উচ্চারণ করে জোরে না বলে, শুধু মুখ ঠোঁট নাড়িয়ে নাড়িয়ে বলে তাহলে কি তালাক হবে?

ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

প্রিয় ভাই তানভীর, সর্বপ্রথম আপনাকে আশ্বস্ত করতে চাই যে, আপনার বিবাহ সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ন আছে এবং আপনার কোনো তালাক পতিত হয়নি। আপনি মূলত "ওয়াসওয়াসা" (শয়তানের ধোঁকা ও মানসিক শুচিবাই) নামক একটি সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। শয়তান নতুন বিবাহিত দম্পতিদের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটানোর বা মানসিক অশান্তি সৃষ্টির জন্য এমন ধোঁকা দিয়ে থাকে। নিচে আপনার প্রতিটি প্রশ্নের শরয়ী সমাধান নির্ভরযোগ্য দলিলের আলোকে দেওয়া হলো:

১ ও ২নং প্রশ্নের উত্তর: অস্পষ্ট বা কিনায়া শব্দের হুকুম

আপনি আপনার স্ত্রীকে বলেছেন, "তুমি যাও তো" বা "তুমি ইচ্ছা করলে চলে যেতে পারো একেবারেই"। ইসলামী ফিকহের পরিভাষায় এ ধরনের শব্দগুলোকে 'কিনায়া' বা অস্পষ্ট শব্দ বলা হয়। এসব শব্দের দ্বারা তালাকও উদ্দেশ্য হতে পারে, আবার কেবল রাগের মাথায় দূরে সরে যাওয়াও উদ্দেশ্য হতে পারে।

হানাফী ফিকহের সুনির্দিষ্ট নিয়ম হলো: কিনায়া বা অস্পষ্ট শব্দের মাধ্যমে তালাক পতিত হওয়ার জন্য 'তালাকের সুস্পষ্ট নিয়ত বা ইচ্ছা' থাকা শর্ত। নিয়ত ছাড়া এ ধরনের শব্দ বললে তালাক হয় না।

أَلْفَاظُ الْكِنَايَاتِ لَا يَقَعُ بِهَا الطَّلَاقُ إلَّا بِالنِّيَّةِ

"কিনায়া (অস্পষ্ট) শব্দসমূহের দ্বারা নিয়ত ব্যতীত তালাক পতিত হয় না।"

— (ফতোয়ায়ে শামী বা রদ্দুল মুহতার: ৩/২৯৬, ফতোয়ায়ে আলমগীরী: ১/৩৭৪)

যেহেতু আপনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, আপনার তালাকের কোনোই ইচ্ছা বা নিয়ত ছিল না, বরং আপনার উদ্দেশ্য ছিল "সে আমার সামনে থেকে সরে যাক", তাই আপনার কোনো তালাক পতিত হয়নি।

৩নং প্রশ্নের উত্তর: মনের চিন্তা ও ওয়াসওয়াসার হুকুম

মনের মধ্যে তালাকের চিন্তা আসা, আর তা বাস্তবে উচ্চারণ করার মাঝে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। মনের চিন্তার উপর শরীয়তে কোনো পাকড়াও নেই।

إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ عَنْ أُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا مَا لَمْ تَعْمَلْ أَوْ تَتَكَلَّمْ

রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) এরশাদ করেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতের মনের ওয়াসওয়াসা বা কল্পনার কথাগুলো ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না সে তা কাজে পরিণত করে অথবা মুখে উচ্চারণ করে।"

— (সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৫২৬৯; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ১২৭)

ফিকহী মূলনীতি: ইসলামী ফিকহের একটি বিখ্যাত মূলনীতি হলো—

"الْيَقِينُ لَا يَزُولُ بِالشَّكِّ" (নিশ্চিত বিষয় সন্দেহের দ্বারা বাতিল হয় না)।

আপনার বিবাহ একটি নিশ্চিত বিষয়। আর তালাকের উচ্চারণ করেছেন কি করেননি—তা একটি সন্দেহ। সুতরাং নিশ্চিত বিবাহ কেবল সন্দেহের বশবর্তী হয়ে কখনোই ভেঙে যাবে না। আপনার যখনই সন্দেহ হবে যে "আমি কি মুখে বলেছি নাকি মনে মনে ভেবেছি?"—তখন ধরে নিতে হবে আপনি মুখে বলেননি। এ ধরনের সন্দেহকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করতে হবে।

৪নং প্রশ্নের উত্তর: ঠোঁট নাড়িয়ে আওয়াজ ছাড়া তালাক

ইসলামী ফিকহে 'উচ্চারণ' বা 'কথা' (কালাম) হিসেবে গণ্য হওয়ার জন্য শর্ত হলো, অন্তত এতটুকু আওয়াজ করে বলা যাতে নিজের কান পর্যন্ত শব্দ পৌঁছায় (যদি আশেপাশে কোলাহল না থাকে এবং শ্রবণশক্তি স্বাভাবিক থাকে)।

ফতোয়ায়ে শামীতে আল্লামা ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:

"শব্দ উচ্চারণের সর্বনিম্ন স্তর হলো, নিজের কান পর্যন্ত আওয়াজ পৌঁছানো। যদি নিজের কান পর্যন্ত আওয়াজ না পৌঁছে (অর্থাৎ কেবল ঠোঁট নাড়ায়), তবে তাকে 'উচ্চারণ' বা কথা বলা ধরা হবে না।" (রদ্দুল মুহতার: ১/৫৩৩)

সুতরাং, আওয়াজ ছাড়া শুধু মনে মনে বা শব্দহীনভাবে ঠোঁট নাড়িয়ে তালাক দিলে তা ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী তালাক হিসেবে গণ্য হবে না; এটি কেবল মনের জল্পনা বা ওয়াসওয়াসা।

আপনার জন্য বিশেষ পরামর্শ ও সারসংক্ষেপ

  • বিবাহ অক্ষুণ্ন আছে: উপরের কোনোটি দ্বারাই আপনার স্ত্রীর উপর এক তালাকও পতিত হয়নি। আপনারা সম্পূর্ণ হালালভাবে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে আছেন।
  • ওয়াসওয়াসাকে পাত্তা না দেওয়া: ওয়াসওয়াসার একমাত্র ঔষধ হলো একে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা। যখনই এমন চিন্তা আসবে, তখন 'আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইত্বানির রাজীম' পড়বেন এবং নিজের কাজে বা স্ত্রীর সাথে অন্য গল্পে মনোযোগ দেবেন।
  • তর্ক বা উত্তর না দেওয়া: শয়তান আপনাকে দিয়ে এগুলো বলাতে চায়। তাই মনের চিন্তাকে যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করার চেষ্টা করবেন না, কেবল অগ্রাহ্য করবেন।
  • সাবধানতা: ভবিষ্যতে স্ত্রীর সাথে হাসি-ঠাট্টা বা রাগের সময়ও তালাক বা বিচ্ছেদ সম্পর্কিত কোনো শব্দ ব্যবহার করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকবেন।

আল্লাহ তাআলা আপনাকে ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্তি দান করুন এবং আপনাদের দাম্পত্য জীবনে বরকত দান করুন। (আমীন)