ইসলামিক প্রশ্নোত্তর - কেনায়া শব্দে তালাক
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيم

ফতোয়া ও মাসআলা বিভাগ

প্রশ্নকারী: Ibrahim

প্রশ্ন: মুহতারাম মুফতি সাহেব, জনৈক ব্যক্তি স্ত্রীর সাথে ঝগড়ার এক পর্যায়ে মেসেজে একটি কেনায়া (অস্পষ্ট) বাক্য লিখেছেন: "অন্য কোনো ছেলে দেখো।" ঐ সময় তার মনে বারবার এই নিয়ত/চিন্তা আসছিল যে, "এই বাক্য বলার কারণে বিচ্ছেদ হবে।"
এ বিষয়ে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত:
১. নিয়তে দুই বা তিন এমন কোনো সংখ্যার কথা ছিল না, শুধু সাধারণ বিচ্ছেদের চিন্তা ছিল।
২. নিয়তটি মনে বারবার আসছিল (কতবার এসেছে তা হিসাবে নেই)।
৩. ব্যক্তিটি মেসেজে উক্ত কেনায়া বাক্যটি মাত্র একবারই লিখেছেন।

হুজুরের নিকট প্রশ্ন:
১. নিয়তে সংখ্যার উল্লেখ না থাকলে এবং মনে বারবার বিচ্ছেদের চিন্তা আসলে, কেনায়া বাক্যটি একবার লেখার কারণে কি একের অধিক বিচ্ছেদ হওয়ার কোনো সুযোগ আছে? এখানে কতটি বিচ্ছেদ হয়েছে?
২. মনে বারবার একই নিয়ত আসার কারণে কি বিচ্ছেদের সংখ্যা বাড়ে?
৩. সংখ্যা ছাড়া বিচ্ছেদের নিয়ত মনে বারবার ঘোরার পর কেনায়া বাক্যটি মাত্র একবার লিখলে শরীয়ত মোতাবেক কয়টি বিচ্ছেদ গণ্য হবে?
দয়া করে সঠিক সমাধান দিয়ে পেরেশানীমুক্ত করবেন।

ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

সম্মানিত ভাই, আপনার প্রশ্নটি ফিকহে ইসলামীর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সূক্ষ্ম মাসআলা। আলহামদুলিল্লাহ, আপনার বর্ণিত পরিস্থিতিটি আমরা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছি। কুরআন, হাদিস, ফিকহী মূলনীতি এবং হানাফী মাযহাবের আইম্মায়ে মুজতাহিদীনদের স্পষ্ট এবারতের আলোকে আপনার পেরেশানীমুক্ত হওয়ার জন্য নিচে এর বিস্তারিত শরয়ী সমাধান প্রদান করা হলো:

১. মেসেজে লেখার হুকুম এবং কেনায়া শব্দ

ইসলামী শরীয়তে মুখে উচ্চারণ করা এবং লিখে পাঠানো—উভয়টির হুকুম সমান। ফিকহী মূলনীতি (আল-কাওয়ায়িদুল ফিকহিয়্যাহ) অনুযায়ী:

الْكِتَابَةُ كَالْخِطَابِ

"লেখাও সরাসরি সম্বোধন করে কথা বলার মতো (কার্যকর)।"

— (ফতোয়ায়ে শামী: ৩/২৪৬)

আপনি মেসেজে লিখেছেন, "অন্য কোনো ছেলে দেখো"। এটি সুস্পষ্ট তালাকের শব্দ নয়, বরং এটি একটি অস্পষ্ট বা 'কেনায়া' শব্দ। হানাফী মাযহাবের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলো, কেনায়া শব্দের মাধ্যমে তালাক পতিত হওয়ার জন্য 'তালাক বা বিচ্ছেদের নিয়ত' থাকা শর্ত। যেহেতু আপনার বিচ্ছেদের নিয়ত ছিল, তাই তালাক পতিত হয়েছে।

২. মনে বারবার চিন্তার কারণে কি তালাকের সংখ্যা বাড়ে?

না, মনের চিন্তার কারণে তালাকের সংখ্যা বাড়ে না। শরীয়তের বিধান হলো, কাজ বা উচ্চারণের উপর ভিত্তি করে হুকুম বর্তায়, শুধু মনের কল্পনার উপর নয়।

إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ عَنْ أُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا مَا لَمْ تَعْمَلْ أَوْ تَتَكَلَّمْ

রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) এরশাদ করেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতের মনের কল্পনা ও ওয়াসওয়াসাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না সে তা কাজে পরিণত করে অথবা মুখে উচ্চারণ করে।"

— (সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৫২৬৯)

আপনি বাক্যটি মাত্র একবার লিখেছেন। আপনার মনে হাজার বার তালাক বা বিচ্ছেদের চিন্তা আসলেও, যেহেতু কাজ (লেখা) একবারই সংঘটিত হয়েছে, তাই তালাক একটিই পতিত হবে। মনের পুনরাবৃত্তি ফিজিক্যাল কাজকে বহুগুণ করে না।

৩. কয়টি তালাক পতিত হয়েছে এবং এর ধরন কী?

হানাফী মাযহাবের ফতোয়া:

কেনায়া (অস্পষ্ট) শব্দের মাধ্যমে যদি তালাকের নিয়ত করা হয়, আর নিয়তে যদি নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা (যেমন: ৩) না থাকে, তবে তার মাধ্যমে ১টি তালাক্ব বায়েন (الطلاق البائن) পতিত হয়।

وَإِذَا نَوَى الطَّلَاقَ يَقَعُ طَلْقَةً بَائِنَةً وَإِنْ نَوَى ثَلَاثًا فَثَلَاثٌ

আল্লামা ইবনে আবিদীন (রহ.) ফতোয়ায়ে শামীতে উল্লেখ করেন: "কেনায়া শব্দে যদি তালাকের নিয়ত করে, তবে একটি তালাক্ব বায়েন পতিত হবে। আর যদি তিন তালাকের নিয়ত করে, তবে তিন তালাক পতিত হবে।"

— (রদ্দুল মুহতার বা ফতোয়ায়ে শামী: ৩/২৯৭, ফতোয়ায়ে আলমগীরী: ১/৩৭৪)

যেহেতু আপনার নিয়তে সংখ্যার উল্লেখ ছিল না, কেবল সাধারণ বিচ্ছেদের নিয়ত ছিল, তাই এখানে কেবলমাত্র ১টি তালাক্ব বায়েন পতিত হয়েছে। একের অধিক তালাক হওয়ার কোনোই সুযোগ নেই।

সারসংক্ষেপ ও আপনার জন্য সমাধান

  • প্রশ্ন ১ এর উত্তর: না, মনের চিন্তার কারণে একের অধিক বিচ্ছেদ হওয়ার কোনোই সুযোগ নেই। এখানে মাত্র ১টি তালাক সংঘটিত হয়েছে।
  • প্রশ্ন ২ এর উত্তর: না, মনে বারবার নিয়ত বা চিন্তা আসলেই বিচ্ছেদের সংখ্যা বাড়ে না। বাক্য যেহেতু একবার লেখা হয়েছে, প্রয়োগও একবারই হবে।
  • প্রশ্ন ৩ এর উত্তর: শরীয়ত মোতাবেক এটি "১ তালাক্ব বায়েন" (এক তালাক বায়েন) হিসেবে গণ্য হবে।
  • পেরেশানীমুক্ত সমাধান: তালাক্ব বায়েন এর হুকুম হলো, এর কারণে বৈবাহিক সম্পর্ক সাথে সাথেই ছিন্ন হয়ে যায় (ইদ্দত শুরু হয়)। তবে খুশির খবর হলো, যেহেতু এটি মাত্র একটি তালাক, তাই স্বামী-স্ত্রী চাইলে নতুন মোহরানা নির্ধারণ করে সাক্ষীদের উপস্থিতিতে পুনরায় নতুনভাবে বিবাহ (নিকাহ) বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবেন। এর জন্য কোনো হিল্লা বা অন্য কোথাও বিবাহের প্রয়োজন নেই।

আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।