ইসলামিক প্রশ্নোত্তর - তালাক ছাড়া দ্বিতীয় বিবাহ ও মুক্তির উপায়
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيم

ফতোয়া ও মাসআলা বিভাগ

প্রশ্নকারী: অলিয়া পারভিন

প্রশ্ন: ইসলামিক মতে ১৪ বছর বয়সে আমার একজনের সাথে বিয়ে হয় ২০১৫ সালে। তখন আমি নাবালিকা ছিলাম। ছয়মাস থাকার পর সে প্রবাসী হয়ে যায়। এরপর ২০১৮ সালে আমি সাবালিকা হওয়ার পর তাকে আর মেনে নেইনি এবং সেপারেট হয়ে যাই। এখন সে আমাকে তালাক দেয়নি এবং দিবেও না। আইনিভাবে সেই বিয়েটা হয়নি, শুধু ইসলামীভাবে হয়েছিল। আমি অন্য একজনকে বিয়ে করি ২০২৪ সালে, তার সাথেই বর্তমানে আছি। প্রথম স্বামী আমাকে তালাক দেয়নি। এই বিয়ে থেকে আমি কীভাবে মুক্তি পাবো? শুধু ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে জানতে চাই।

ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

বোন অলিয়া পারভিন, আপনার জীবনের এই সংকটময় পরিস্থিতির জন্য আমরা সহানুভূতিশীল। তবে যেহেতু আপনি সম্পূর্ণ "ইসলামিক দৃষ্টিকোণ" থেকে বিষয়টি জানতে চেয়েছেন, তাই ইসলামী শরীয়তের অকাট্য বিধানগুলো আপনার সামনে তুলে ধরা অত্যন্ত জরুরি। আপনার বর্ণনাকৃত ঘটনায় শরীয়তের দৃষ্টিতে একটি অত্যন্ত গুরুতর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা এবং হানাফী ফিকহের আলোকে এর বিস্তারিত হুকুম ও মুক্তির উপায় নিচে তুলে ধরা হলো:

১. প্রথম বিবাহের অবস্থা এবং 'খিয়ারুল বুলুগ' (সাবালক হওয়ার পর অধিকার)

নাবালিকা অবস্থায় যদি পিতা বা দাদা ব্যতীত অন্য কোনো অভিভাবক (যেমন- ভাই, চাচা) মেয়েকে বিয়ে দেন, তবে সাবালিকা হওয়ার পর মেয়ের সেই বিয়ে ভেঙে দেওয়ার অধিকার থাকে, যাকে ইসলামী ফিকহে 'খিয়ারুল বুলুগ' (خيار البلوغ) বা বয়ঃপ্রাপ্তির ইখতিয়ার বলা হয়।

তবে, আপনি সাবালিকা হওয়ার পর স্বামী থেকে দূরে সরে এলেই (Separation) বৈবাহিক সম্পর্ক ইসলামী শরীয়তে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছিন্ন হয়ে যায় না। হানাফী মাযহাবের চূড়ান্ত ফতোয়া হলো, এই অধিকার প্রয়োগ করে বিয়ে ভাঙতে হলে অবশ্যই শরয়ী আদালতের বিচারক বা কাজী (القاضي) কর্তৃক বিচ্ছেদের ফয়সালা (ফাসখ) হতে হবে।

فَإِنْ اخْتَارَتْ نَفْسَهَا لَمْ يَقَعْ الْفُرْقَةُ حَتَّى يَفْصِلَ الْقَاضِي بَيْنَهُمَا

বিখ্যাত হানাফী ফিকহ গ্রন্থ 'আল-হেদায়া'-তে বলা হয়েছে: "যদি মেয়েটি সাবালিকা হওয়ার পর বিয়ে অস্বীকার করে নিজেকে বেছে নেয়, তবুও কাজী (বিচারক) তাদের মধ্যে বিচ্ছেদের রায় না দেওয়া পর্যন্ত বিয়েটি ভাঙবে না।"

— (আল-হেদায়া: ২/৩১৫, ফতোয়ায়ে শামী: ৩/১৭৩)

যেহেতু আপনার ক্ষেত্রে কোনো আদালত, কাজী বা মুফতি বোর্ড দ্বারা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম বিয়েটি 'ফাসখ' (বাতিল) করা হয়নি এবং স্বামীও মুখে বা লিখিত কোনো তালাক দেয়নি, তাই ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে আপনার প্রথম বিয়েটি এখনো পুরোপুরি বহাল আছে।

২. ২০২৪ সালের দ্বিতীয় বিবাহের হুকুম

গুরুত্বপূর্ণ শরয়ী বিধান

যেহেতু আপনার প্রথম বিবাহটি শরীয়তসম্মতভাবে বিচ্ছেদ হয়নি, তাই শরীয়তের দৃষ্টিতে আপনি এখনো প্রথম স্বামীর স্ত্রী (বিবাহিতা নারী)। পবিত্র কুরআনের অকাট্য বিধান অনুযায়ী, অন্যের স্ত্রী থাকা অবস্থায় কোনো নারীর জন্য দ্বিতীয় বিবাহ করা সম্পূর্ণ হারাম এবং বাতিল (Void)।

وَالْمُحْصَنَاتُ مِنَ النِّسَاءِ إِلَّا مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ۖ كِتَابَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ

"এবং নারীদের মধ্যে যারা অন্যের বিবাহিতা (তারাও তোমাদের জন্য হারাম), এ বিধান আল্লাহ তোমাদের ওপর অবধারিত করেছেন।"

— (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ২৪)

সুতরাং, ২০২৪ সালে আপনি যে দ্বিতীয় বিবাহ করেছেন, ইসলামী আইনে সেটি 'ফাসিদ' বা বাতিল হিসেবে গণ্য হবে। আইনিভাবে আপনি কুমারী থাকলেও শরীয়তে পূর্বের বিয়ে এবং শারীরিক সম্পর্ক সাব্যস্ত থাকায় এই দ্বিতীয় বিবাহ শুদ্ধ হয়নি। দ্বিতীয় স্বামীর সাথে আপনার বর্তমান বসবাস শরীয়তসম্মত নয়।

৩. এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির শরয়ী উপায়

ইসলাম একটি বাস্তবসম্মত জীবনব্যবস্থা। স্বামী জুলুম করলে বা তালাক না দিলে ইসলাম নারীকে আটকে রাখে না, তবে মুক্তির পদ্ধতি অবশ্যই শরীয়াহ মোতাবেক হতে হবে। আপনার মুক্তির জন্য নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক:

  • দ্বিতীয় স্বামী থেকে পৃথক হওয়া: যেহেতু দ্বিতীয় বিয়েটি ইসলামী দৃষ্টিতে শুদ্ধ হয়নি, তাই অবিলম্বে দ্বিতীয় ব্যক্তির থেকে আপনাকে পৃথক হয়ে যেতে হবে এবং আল্লাহর কাছে তওবা-ইস্তিগফার করতে হবে।
  • তালাক বা খুলা গ্রহণ: প্রথম স্বামীর সাথে যোগাযোগ করে (পারিবারিক মধ্যস্থতায়) তাকে বুঝিয়ে তালাক দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। অথবা কিছু অর্থের বিনিময়ে (যেমন- মোহরানা মাফ করে দিয়ে) 'খুলা' (الخلع) করতে হবে।
  • ফসখে নিকাহ (বিবাহ বাতিলকরণ): যদি প্রথম স্বামী কোনোভাবেই তালাক না দেয় এবং ডিস্টার্ব করে, তবে আপনার এলাকার বা দেশের কোনো নির্ভরযোগ্য 'দারুল ইফতা' (ফতোয়া বিভাগ), মুফতি বোর্ড বা ইসলামিক পারিবারিক আদালতে (Sharia Council) আপনি আবেদন করবেন। স্বামী দীর্ঘসময় খোঁজখবর না নেওয়া, খরচ না দেওয়া এবং আপনাকে ঝুলিয়ে রাখার কারণে উলামায়ে কেরামের বোর্ড আপনার প্রথম বিয়েটি 'ফাসখ' (বাতিল) করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।
  • ইদ্দত ও পুনরায় বিবাহ: প্রথম স্বামীর কাছ থেকে তালাক পাওয়ার পর, বা মুফতি বোর্ড কর্তৃক বিয়ে বাতিল (ফাসখ) হওয়ার পর আপনাকে তিন ঋতুস্রাব (হায়েজ) পরিমাণ সময় 'ইদ্দত' পালন করতে হবে। ইদ্দত শেষ হওয়ার পর আপনি সম্পূর্ণ মুক্ত। এরপর আপনি চাইলে বর্তমান দ্বিতীয় ব্যক্তিকে ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক নতুন মোহরানা ও সাক্ষীর মাধ্যমে পুনরায় বৈধভাবে বিবাহ করতে পারবেন।

সারসংক্ষেপ

প্রথম বিয়েটি যেহেতু শরয়ী নিয়মে (তালাক বা ফসখ দ্বারা) বাতিল হয়নি, তাই সেটি এখনো বহাল। ফলশ্রুতিতে দ্বিতীয় বিয়েটি শরীয়তের দৃষ্টিতে বাতিল। আপনাকে অবিলম্বে দ্বিতীয় স্বামীর থেকে আলাদা হয়ে প্রথম বিয়েটি শরয়ী আদালত বা মুফতি বোর্ডের মাধ্যমে 'ফাসখ' (বাতিল) করতে হবে। এরপর ইদ্দত পালন শেষে বর্তমান ব্যক্তিকে নতুন করে বিবাহ করতে হবে। এতেই আপনার দুনিয়া ও আখিরাতের সম্মান ও মুক্তি নিহিত।

আল্লাহ তাআলা আপনাকে সঠিক পথ বোঝার এবং দ্বীনের হুকুম মেনে চলার তৌফিক দান করুন। (আমীন)