আমাদের মাঝে মৌখিক তালাক ও ইদ্দত নিয়ে একটি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একজন মেয়ে ও এক ছেলের তিন বছর আগে বিয়ে হয়েছে। দুই বছর আগে তারা একে অপরকে মৌখিকভাবে তালাক দিয়েছে। এরপর থেকে তাদের মধ্যে আর কোনো শারীরিক সম্পর্ক হয়নি। তবে দুই মাস আগে কোর্টের মাধ্যমে তাদের আনুষ্ঠানিক বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে। ২০ দিন আগে মেয়ের সাথে অন্য এক ছেলের বিবাহ হয়েছে। এখন ইসলামিক নিয়ম অনুযায়ী মেয়েটিকে কি নতুন করে ইদ্দত পালন করতে হবে?
আপনার মৌখিক তালাক ও ইদ্দত সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটির উত্তর নিচে প্রদান করা হলো। ইসলামী শরীয়াহ এবং হানাফী মাযহাবের নির্ভরযোগ্য ফতোয়া অনুযায়ী, স্বামীর মৌখিক উচ্চারণের মাধ্যমেই তালাক সাথে সাথে কার্যকর হয়ে যায়। তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য কোর্টের কাগজ বা আইনি ডকুমেন্টের ওপর শরীয়াহ নির্ভরশীল নয়। কোর্টের পেপার হলো মূলত একটি প্রশাসনিক বা রাষ্ট্রীয় প্রমাণপত্র।
ইসলামী শরীয়তে মৌখিক তালাক ও ইদ্দত উভয়েরই সুনির্দিষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ বিধান রয়েছে। ইদ্দত পালনের মূল উদ্দেশ্য হলো গর্ভ খালি আছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়া এবং পূর্ববর্তী বৈবাহিক সম্পর্কের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। যেহেতু এখানে পূর্বেই দুই বছর অতিবাহিত হয়ে গেছে, তাই ইদ্দতের মূল উদ্দেশ্য ও সময়কাল পরিপূর্ণরূপে হাসিল হয়ে গেছে। নতুন করে এটি নিয়ে সংশয়ে ভোগার কোনো কারণ নেই।
পবিত্র কোরআনে ইদ্দতের সুস্পষ্ট বিধান উল্লেখ করে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন:
এছাড়াও নির্ভরযোগ্য ফিকহ গ্রন্থ 'ফতোয়ায়ে শামী' (রদ্দুল মুহতার: ৩/৫১৭) এবং 'আল-মাবসূত'-এর স্পষ্ট মাসয়ালা অনুযায়ী, তালাক প্রদানের পর থেকেই স্ত্রীর ইদ্দত গণনা শুরু হয়ে যায়, স্ত্রীর তা জানা থাকুক বা না থাকুক।
ইসলামে তালাক বা স্বামী মারা যাওয়ার পর মহিলাদের জন্য ইদ্দত পালন করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব বিধান। পবিত্র কোরআনে এর স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। মৌখিক তালাক ও ইদ্দত-এর মাসয়ালায় ইদ্দতের মূল হিকমত বা উদ্দেশ্য হলো তিনটি: প্রথমত, গর্ভাশয় খালি আছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়া, যাতে ভবিষ্যতে সন্তানের বংশপরিচয় নিয়ে কোনো জটিলতা সৃষ্টি না হয়। দ্বিতীয়ত, স্বামী-স্ত্রীর দীর্ঘদিনের পবিত্র সম্পর্কের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। তৃতীয়ত, যদি তালাকটি রাজয়ী (ফেরতযোগ্য) হয়, তবে রাগের মাথায় নেওয়া সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে এসে পুনরায় সংসার জোড়া লাগানোর জন্য স্বামী-স্ত্রীকে একটি সুযোগ দেওয়া। তবে আপনার উল্লেখিত মাসয়ালায় যেহেতু পূর্বেই ইদ্দতের সময়কাল (তিন মাস বা তিন হায়েয) পার হয়ে গেছে, তাই নতুন করে ইদ্দত পালনের প্রশ্নটি অবান্তর। ইসলামী শরীয়ত প্রতিটি বিষয়কে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও যৌক্তিকভাবে সমাধান করেছে।
শরীয়তের দৃষ্টিতে তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য কোনো সাক্ষী রাখা বা লিখিত ডকুমেন্ট থাকা শর্ত নয়। স্বামী যদি সুস্থ মস্তিষ্কে সজ্ঞানে স্ত্রীকে মৌখিকভাবে তালাক প্রদান করে, তবে তা তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়ে যায়। তবে বর্তমান যুগে মিথ্যা অস্বীকার বা আইনি জটিলতা এড়ানোর জন্য তালাকের বিষয়টি লিখিতভাবে সম্পন্ন করা উত্তম। আইনি বা কোর্টের কাগজপত্রের ভূমিকা হলো কেবল শরীয়তের ফয়সালাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রমাণ করা। কোর্টের কাগজ তৈরি হতে দেরি হলেও শরয়ী বিধান নিজ গতিতেই কার্যকর হয়ে যায়। তাই কোর্টের রায়ের তারিখ থেকে ইদ্দত হিসাব করা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা; ইদ্দত গণনা শুরু হবে ঠিক যে মুহূর্তে স্বামী মুখে তালাক উচ্চারণ করেছে সেই সময় থেকে।
সুতরাং, আপনার বর্ণিত ক্ষেত্রে মেয়েটির বর্তমান বিবাহ সম্পূর্ণ হালাল এবং তাকে নতুন করে কোনো ইদ্দত পালন করতে হবে না। আল্লাহই সর্বজ্ঞানী।
WhatsApp us