আমি গত ৩ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে বিয়ে করি। স্ত্রী গত ৭ই মে তারিখে আমার বাড়ি ত্যাগ করে। আমাকে সাময়িক সময়ের কথা বলে কিন্তু আর ফিরে নি। তারপর সে আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন এলিগেশন আনা শুরু করে। ১. যেমন তার শিক্ষাগত যোগ্যতা আমার থেকে বেশি ২. আমি বেকার (যখন বিয়ে করি তখন ২ জনই স্টুডেন্ট ছিলাম এর মধ্যে তার পড়াশুনা শেষ হলেও আমি পারিনি) ৩. আমার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলতে থাকে যা মিথ্যা। সে বলতে থাকে "আমার সাথে তার যায় না, শি ডিজার্ভ বেটার এমন কিছু কথা।" আমি বেকার বা সব কিছু জানেই সে বিয়ে করছিল এবং আমি গোপনে বা এফিডেভিট করে বিয়ে করি নি। পছন্দের বিয়ে হলেও পারিবারিকভাবে এরেন্জমেন্ট করে অনুষ্ঠান করেই বিয়ে করেছিলাম।
গত ৭ জুন সে আমাকে ডিভোর্স নোটিশ পাঠায় কাজী অফিসের মাধ্যমে কাবিননামার ১৮ নং কলামের ক্ষমতাবলে। যেখানে শর্ত লেখা ছিল পুরুষত্বহীনতা, ভারনপোষন না দেওয়া, মারধর করা। যেগুলো কোনটাই ঘটে নি। আমি বেকার হলেও আমার পরিবার আর্থিক ভাবে সচ্ছল এবং আমি টিউশনি করাই মান্থলি ৪০+ ইনকাম থাকে। সুতরাং ভারনপোষন দেয়া হয় নি এটা ভুল। শারীরিকভাবে সুস্থ আমি। তাকে আমার পরিবার মেয়ের মতই ভালবাসত। কারন আমি বংশে বড় ছেলে এবং আমার বাবা-মার মেয়ে নাই।
তালাকটি ইসলামী শরীয়াহ মোতাবেক হবে কিনা?
সম্মানিত প্রশ্নকারী, আপনার জীবনের এমন একটি কঠিন ও মানসিক চাপের মুহূর্তে গভীর সহমর্মিতা জানাচ্ছি। হানাফী মাজহাব, কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আপনার উল্লিখিত পরিস্থিতির একটি পূর্ণাঙ্গ শরয়ী ও আইনি বিশ্লেষণ নিচে প্রদান করা হলো। আশা করি, এটি আপনার আইনি পদক্ষেপ গ্রহণে এবং শরয়ী অবস্থান পরিষ্কার করতে সহায়ক হবে।
কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে স্ত্রীকে তালাক প্রদানের যে ক্ষমতা দেওয়া হয়, ইসলামী শরীয়াহর পরিভাষায় তাকে 'তালাকে তাফয়ীজ' (تفويض الطلاق) বলা হয়। আপনার ক্ষেত্রে কাবিননামায় এটি সম্পূর্ণ শর্তযুক্ত (Conditional), যাকে ফিকহের ভাষায় 'তালিকুত তালাক বিশ-শর্ত' (تعليق الطلاق بالشرط) বলা হয়। কাবিননামার শর্তগুলো হলো: ১. পুরুষত্বহীনতা, ২. ভরণপোষণ না দেওয়া এবং ৩. শারীরিক নির্যাতন করা।
যেহেতু আপনি আর্থিকভাবে সচ্ছল, স্ত্রীর ভরণপোষণ দিয়েছেন, শারীরিকভাবে সুস্থ এবং কোনো ধরনের শারীরিক নির্যাতন করেননি, তাই হানাফী মাজহাবের সুস্পষ্ট বিধান অনুযায়ী— আপনার স্ত্রীর দেওয়া এই তালাক ইসলামী শরীয়াহ মোতাবেক কার্যকর হয়নি এবং আপনাদের বিবাহ এখনো সম্পূর্ণ বহাল আছে।
হানাফী মাজহাবের সুস্পষ্ট ফতোয়া হলো— স্ত্রী যদি শর্তসাপেক্ষে তালাকের ক্ষমতা লাভ করেন, তবে বাস্তবে সেই শর্তটি সংঘটিত না হওয়া পর্যন্ত স্ত্রীর নিজের ওপর তালাক পতিত করার কোনো অধিকার থাকে না। উপমহাদেশের হানাফী ফিকহের সর্ববৃহৎ ফতোয়াগ্রন্থ 'ফতোয়ায়ে আলমগীরী' (আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যাহ)-তে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে:
স্ত্রী দাবি করছেন শর্ত ভঙ্গ হয়েছে, আর আপনি তা অস্বীকার করছেন। ইসলামী আইনে এমতাবস্থায় স্ত্রীর মুখের কথায় তালাক হয়ে যাবে না। রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) সুস্পষ্ট বিধান দিয়েছেন:
ফতোয়ার প্রয়োগ: শরীয়তের দৃষ্টিতে আপনার স্ত্রী এখানে 'দাবিকারক'। তাকে উপযুক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ দিয়ে প্রমাণ করতে হবে যে আপনি তাকে ভরণপোষণ দেননি বা নির্যাতন করেছেন। প্রমাণ করতে ব্যর্থ হলে তার এই ডিভোর্স নোটিশ শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ বাতিল (باطل)।
কাবিননামা একটি পবিত্র চুক্তি। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে চুক্তি ও শর্ত পালনের ব্যাপারে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন:
পার্থিব অহংকার (যেমন- শিক্ষাগত যোগ্যতা বেশি) বা "অন্য কাউকে ডিজার্ভ করা"-র মতো অযৌক্তিক কারণে মিথ্যা অভিযোগ সাজিয়ে তালাক চাওয়া শরীয়তে হারাম। রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) এ বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন:
শরীয়াহ দৃষ্টিকোণ থেকে এই তালাক অকার্যকর হলেও, বাংলাদেশের 'মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১' অনুযায়ী কাজী অফিসের মাধ্যমে পাঠানো নোটিশের পর ৯০ দিন পার হয়ে গেলে তা আইনিভাবে কার্যকর হয়ে যাওয়ার একটি ঝুঁকি থাকে। তাই আপনার সামাজিক ও আইনি সুরক্ষার জন্য দ্রুত নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি:
WhatsApp us