প্রশ্নকারী: তিথি
আমাদের বিয়েতে ইজাব-কবুল বলার আগে আমরা স্বামী-স্ত্রী খালি কাবিননামায় সাইন করি। সেখানে ১৮ নং কলামটি সম্পূর্ণ ফাঁকা ছিল। অর্থাৎ বিয়ের সময় আমি তাফয়ীজে তালাকের কোনো অধিকার পাইনি। কিন্তু একদিন অনলাইনে জানতে পারি যে, এই অধিকারটি স্বামীকে ফিরিয়ে দিলে আর স্বামী তা গ্রহণ করলে এটি বাতিল হয়ে যায়।
আমি তখন না জেনেই আমার স্বামীকে কাবিননামার ১৮ নং কলামের ছবি পাঠিয়ে মেসেজ দিই— "আমি এই অধিকারটি চিরতরে বর্জন করলাম এবং তোমাকে ফিরিয়ে দিলাম।" আমি ভিত্তিহীন একটি জিনিস ফিরিয়ে দিচ্ছিলাম। এরপর আমি স্বামীকে বলি, "তুমি বলো যে আমি অধিকারটি ফিরিয়ে নিলাম।" স্বামী ভেবেছে আমি হয়তো তাকে দেওয়া কোনো অধিকার ফেরত চাচ্ছি, তাই না বুঝেই সে লেখে, "আমি অধিকারটি ফিরিয়ে দিলাম/নিলাম।" এর উত্তরে আমি বলি "Yes"।
আমি ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত হওয়ায় পরবর্তীতে স্বামীকে ২-৩ বার জিজ্ঞেস করি, "তুমি কি শর্তসহ ফিরিয়ে দিয়েছিলে?" প্রথম দিন সে বলে, "হ্যাঁ, শর্তসহ দিয়েছিলাম।" কিন্তু অন্য একদিন সে বিরক্ত হয়ে বলে দেয়— "তোমার কি সমস্যা? আমি এইগুলা বুঝি না, আমি এগুলা কি জানি না।"
আমার মূল জানার বিষয়: যেহেতু আমার কাছে কোনো অধিকারই ছিল না, তাই আমার ভিত্তিহীন কথার প্রেক্ষিতে স্বামী যখন বলল "ফিরিয়ে দিলাম" এবং আমি "Yes" বললাম, এর মাধ্যমে কি এক সেকেন্ডের জন্যও আমার কাছে কোনো অধিকার এসেছিল? আর "শর্তসহ" কথার কারণে কি কোনো অধিকার বর্তায়? আল্লাহ করুন যেন উত্তরে আসে আমি কোনো অধিকার পাইনি।
ইসলামী আইন অনুযায়ী, নিকাহনামার ১৮ নং কলাম ফাঁকা থাকার অর্থ হলো—বিয়ের সময় আপনার স্বামী আপনাকে তালাক গ্রহণের কোনো ক্ষমতা দেননি। অর্থাৎ, আপনার কাছে এই অধিকারটির অস্তিত্বই ছিল না (এটি ছিল Zero)।
যেহেতু আপনি একটি ভিত্তিহীন ও অস্তিত্বহীন জিনিস স্বামীকে "ফিরিয়ে" দিয়েছেন, তাই স্বামীর কাছে কিছুই যায়নি। আর স্বামী যখন না বুঝে বলেছেন "অধিকারটি ফিরিয়ে দিলাম", তখন তিনিও আপনাকে সেই 'শূন্য' বা 'অস্তিত্বহীন' জিনিসটিই ফিরিয়ে দিয়েছেন। শূন্যের সাথে শূন্য যোগ করলে তা শূন্যই থাকে। এটিকে শরীয়তের ভাষায় 'লগ্ব' (Laghw/Void বা সম্পূর্ণ অকার্যকর কথা) বলা হয়।
স্বামী যখন ভুল করে বলেছিলেন "আমি অধিকারটি ফিরিয়ে দিলাম", তখন আপনি উত্তরে "Yes" বলেছিলেন। আপনার ভয় হলো, এই "Yes" বলার কারণে অধিকারটি আপনি গ্রহণ করে ফেলেছেন কি না।
শরীয়তের বিধান হলো— স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ করার জন্য স্বামীর পক্ষ থেকে নতুন করে ক্ষমতা দেওয়ার স্পষ্ট শব্দ ও পূর্ণ ইচ্ছা (ইনশা) থাকতে হবে। আপনার স্বামী আপনাকে নতুন করে কোনো অধিকার দেননি, বরং আপনি যা বলেছিলেন, তিনি বোকার মতো তারই প্রতিধ্বনি করেছিলেন মাত্র। যেহেতু মূল কথাটিই অস্তিত্বহীন (লগ্ব), তাই একটি ভিত্তিহীন কথার উত্তরে আপনার "Yes" বলাটাও শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অকার্যকর।
আপনার সবচেয়ে বড় ভয়ের জায়গা হলো স্বামী পরের দিন বলেছেন "হ্যাঁ, শর্তসহ দিয়েছিলাম"। খুব ভালোভাবে লক্ষ্য করুন—
অর্থাৎ, মূল জিনিসটি যদি বাতিল হয়, তবে তার সাথে যুক্ত শর্তও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়। যেহেতু তিনি আপনাকে কোনো তাফয়ীজ বা অধিকার দেনইনি, তাই সেখানে "শর্ত" যুক্ত হওয়ার কোনো সুযোগই নেই। তাছাড়া, আপনার স্বামী নিজেই পরবর্তীতে স্পষ্ট স্বীকার করেছেন— "আমি এইগুলা বুঝি না, আমি এগুলা কি জানি না।" যে স্বামী নিজেই জানেন না যে তাফয়ীজ কী, তার একটি না-বুঝে বলা কথার ওপর ভিত্তি করে ইসলাম কখনো এত বড় একটি আইনি অধিকার সাব্যস্ত করে না।
হোয়াটসঅ্যাপের এই পুরো কথোপকথনটি হয়েছে আপনার ভুল ধারণা এবং আপনার স্বামীর অজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে। আল-কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, "আল্লাহ কোনো সত্তাকে তার সাধ্যের বাইরে কষ্ট দেন না... ভুলে গেলে বা ভুল করলে তিনি পাকড়াও করেন না" (সূরা বাকারা: ২৮৬)। আপনার এই ভয়টি নিছকই শয়তানের তৈরি করা 'ওয়াসওয়াসা' (কুমন্ত্রণা)। শয়তান চায় ভিত্তিহীন সন্দেহ ঢুকিয়ে আপনাদের পবিত্র দাম্পত্য জীবনকে বিষাদময় করে তুলতে।
দলিল সূত্র:
১. ফতোওয়ায়ে শামী (রদ্দুল মুহতার)
২. আল-হিদায়া
৩. আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের
৪. কাওয়ায়িদুল ফিকহ
والله تعالى أعلم بالصواب
(এবং আল্লাহ তায়ালাই সর্বাধিক অবগত)
ফতোয়া প্রদানে: মুফতি প্যানেল
মাযহাব: হানাফী (আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আহ)
WhatsApp us