জিজ্ঞাসা: আমার বিয়ে হয়েছে ৪ বছর। এই ৪ বছরে আমাদের মধ্যে অনেক ঝগড়া হয়েছে। আমার স্বামী আমাকে অসংখ্য বার বলেছে, "আমি তোকে ছেড়ে দিবো, তোর সাথে সংসার করতে চাই না।" কিন্তু আমার স্বামী আমাকে রাগের মাথায় বলছে যে, "আমি তোকে ছেড়ে দিলাম"—একসাথে কয়েকবার বলছে। তখন আমি কিছু সময় পর তাকে জিজ্ঞেস করছিলাম যে, আপনি এ কথাটা কী উদ্দেশ্যে বা কী নিয়তে বলছেন? সে বলছিল, রাগের মাথায় আমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য বলছে, তালাক দেওয়ার উদ্দেশ্যে না। আবার কিছুদিন পর আবার বলছে, "যা তোকে ছেড়ে দিলাম।" তখন আমি সাথে সাথে আবার জিজ্ঞেস করছি যে, আপনি কী উদ্দেশ্যে বা কী নিয়তে বলছেন? সে আগের কথাটাই বলছে। তবে আমি এতদিনে যেটা বুঝেছি, আমার স্বামী রাগের মাথায় কী বলে তা নিজেও জানে না; যখন সে স্বাভাবিক হয় তখন সে অনেক অনুতপ্ত হয়। এখন শরীয়তের আলোকে আমাদের বিবাহের হুকুম কী?
ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
সম্মানিতা বোন সুমাইয়া আক্তার, আপনার দাম্পত্য জীবনের এই জটিল পরিস্থিতি এবং শরীয়তের সীমারেখা রক্ষার প্রতি আপনার সচেতনতা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তালাকের মাসআলায় প্রতিটি শব্দের ভাষাগত গঠন (ভবিষ্যৎকাল বনাম অতীতকাল এবং সুস্পষ্ট শব্দ বনাম ইঙ্গিতবাহী শব্দ) এবং স্বামীর মনের নিয়তের ওপর শরীয়তের বিধান নির্ভর করে। পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীগণের ইজমা এবং হানাফী মাযহাবের আইম্মায়ে মুজতাহিদীনের অকাট্য ফিকহী মূলনীতির আলোকে আপনার স্বামীর উচ্চারিত প্রতিটি বাক্যের দালিলিক বিশ্লেষণ ও চূড়ান্ত ফয়সালা নিচে পর্যায়ক্রমে তুলে ধরা হলো:
আপনার স্বামী ঝগড়ার সময় অসংখ্যবার যে বলেছেন— "আমি তোকে ছেড়ে দিবো" এবং "তোর সাথে সংসার করতে চাই না"—ইসলামী শরীয়ত ও ফিকহে হানাফীর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত (ইজমা) অনুযায়ী, এই দুটি কথা হাজারবার বললেও এর দ্বারা কোনো তালাক পতিত হয় না।
ফিকহী কারণ:
অনুবাদ: "তালাকের ভবিষ্যৎ ওয়াদা বা হুমকির দ্বারা তালাক পতিত হয় না... আর স্বামী যদি বলে: 'আমি তোমাকে চাই না' বা 'ভালোবাসি না' বা 'তোমার প্রতি আমার আগ্রহ নেই'—তবে এর দ্বারা কোনো তালাক পতিত হবে না, যদিও সে তালাকের নিয়ত করে থাকে; কেননা এটি নিছক অনাগ্রহের বিবরণ মাত্র।"
— (ফতোয়ায়ে আলমগীরী বা হিন্দিয়া: ১/৩৭৫ ও ১/৩৮৪; রদ্দুল মুহতার বা ফতোয়ায়ে শামী: ৩/২৯৯; আল-বাহরুর রায়েক: ৩/২৭৩)ইসলামী ফিকহে তালাকের শব্দ দুই প্রকার: ১. সরীহ (الصريح - সুস্পষ্ট শব্দ): যেমন—‘তালাক’ বা ‘ডিভোর্স’ শব্দ, যা শুধু বিবাহ বিচ্ছেদের জন্যই ব্যবহৃত হয় এবং নিয়ত ছাড়াও কার্যকর হয়ে যায়। ২. কিনায়া (الكناية - ইঙ্গিতবাহী বা রূপক শব্দ): এমন শব্দ যা বিবাহ বিচ্ছেদের জন্যও ব্যবহৃত হতে পারে, আবার অন্য কোনো সাধারণ অর্থেও (যেমন: ঝগড়া থামানো, সাময়িক কথা বন্ধ করা, বাবার বাড়ি রেখে আসা, রাগের মাথায় কষ্ট দেওয়া বা রেহাই দেওয়া) ব্যবহৃত হতে পারে।
বাংলা ভাষায় "আমি তোকে ছেড়ে দিলাম" বা "যা তোকে ছেড়ে দিলাম" বাক্যটি ‘কিনায়া’ (الكناية) শব্দের অন্তর্ভুক্ত। আর কুরআন, হাদিস ও হানাফী মাযহাবের অকাট্য বিধান হলো—কিনায়া শব্দের ক্ষেত্রে স্বামী যদি আল্লাহকে সাক্ষী রেখে সত্যিকার অর্থেই তালাকের নিয়ত না করে থাকে (বরং শুধু স্ত্রীকে ভয় দেখানো, কষ্ট দেওয়া বা সাময়িক কথা বলা বন্ধ করার উদ্দেশ্যে বলে থাকে), তবে আল্লাহর কাছে (ديانةً) এর দ্বারা কোনো তালাক পতিত হয় না।
কুরআন, হাদিস ও সাহাবায়ে কেরামের দলীল:
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা তালাকের ক্ষেত্রে মনের সুদৃঢ় সংকল্প বা নিয়তের কথা উল্লেখ করে ইরশাদ করেন:
"আর যদি তারা তালাক প্রদানের সুদৃঢ় সংকল্প (নিয়ত) করে, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ (তিনি অন্তরের নিয়ত সম্পর্কে অবগত)।"
— (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২২৭)রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) ইরশাদ করেছেন:
"সকল কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল, এবং প্রতিটি মানুষ তাই পাবে যা সে নিয়ত করেছে।"
— (সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ১; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৯০৭)সহীহ বুখারীতে ইমাম বুখারী (রহ.) ‘বাবু ইযা রাদ্দাহা ইলা আহলিহা’ অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন যে, সাহাবী হযরত কা'ব ইবনে মালেক (রা.)-কে যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) তাবুক যুদ্ধের ঘটনায় বলেছিলেন: «أَلْحِقْ امْرَأَتَكَ بِأَهْلِهَا» (তোমার স্ত্রীকে তার পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দাও/ছেড়ে দাও)—তখন নিয়ত না থাকার কারণে সেটিকে তালাক গণ্য করা হয়নি। সাহাবায়ে কেরাম (রা.) ও তাবেয়ীগণ সর্বসম্মতিক্রমে ফতোয়া দিয়েছেন যে, যেসব শব্দে তালাক ও অন্য অর্থ উভয়টির সম্ভাবনা থাকে, সেখানে স্বামীর নিয়তই চূড়ান্ত মাপকাঠি।
হানাফী ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাব ‘আল-হেদায়া’, ‘ফতোয়ায়ে আলমগীরী’ এবং ‘ফতোয়ায়ে শামী’ (রদ্দুল মুহতার)-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, ঝগড়া বা রাগের অবস্থায় (حالة الغضب) স্বামী যদি "যা চলে যা" বা "তোকে ছেড়ে দিলাম" জাতীয় কিনায়া শব্দ ব্যবহার করে এবং দাবি করে যে তার উদ্দেশ্য তালাক ছিল না, তবে আল্লাহর কাছে এবং বাস্তব হুকুমে (ديانةً) কোনো তালাক পতিত হবে না:
অনুবাদ: "কিনায়া (ইঙ্গিতবাহী) শব্দসমূহ দ্বারা নিয়ত অথবা অবস্থার ইঙ্গিত ছাড়া তালাক পতিত হয় না... অবস্থার ইঙ্গিত ধর্তব্য হওয়াটা কেবল কাজীর আদালতের বাহ্যিক বিচারের ক্ষেত্রে (قضاءً); কিন্তু বান্দা ও আল্লাহ তাআলার মধ্যকার প্রকৃত বিধানে (ديانةً) সকল অবস্থাতেই (স্বাভাবিক অবস্থা হোক বা তীব্র রাগের অবস্থা হোক) তালাকের সুনির্দিষ্ট নিয়ত ছাড়া কখনোই তালাক পতিত হয় না।"
— (ফতোয়ায়ে আলমগীরী বা হিন্দিয়া: ১/৩৭৪; আল-হেদায়া: ২/৩৭৩)আল্লামা ইবনে আবিদীন শামী হানাফী (রহ.) তাঁর ‘রদ্দুল মুহতার’ গ্রন্থে আরও সুস্পষ্টভাবে লিখেছেন:
অনুবাদ: "আর দিয়ানাতান (প্রকৃত শরয়ী বিধানে ও আল্লাহর কাছে) তিনটি অবস্থার কোনোটিতেই (আনন্দ, রাগ কিংবা তালাকের আলোচনা) তালাকের নিয়ত ছাড়া কিনায়া শব্দ দ্বারা আদৌ কোনো তালাক পতিত হয় না।"
— (রদ্দুল মুহতার বা ফতোয়ায়ে শামী: ৩/২৯৮-৩০১, বাবুল কিনায়াত)সুতরাং, আপনার স্বামী যেহেতু কথাটি বলার পরপরই এবং পরের বার সাথে সাথেই স্পষ্ট করেছেন যে—তিনি তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদের নিয়তে কথাটি বলেননি, বরং রাগের মাথায় আপনাকে মানসিকভাবে কষ্ট দেওয়ার জন্য বলেছেন; তাই তার এই বক্তব্য সত্য হয়ে থাকলে আপনাদের ওপর কোনো তালাক পতিত হয়নি এবং আপনাদের বিবাহ বন্ধন সম্পূর্ণ অটুট রয়েছে।
আপনি উল্লেখ করেছেন যে, "আমার স্বামী রাগের মাথায় কী বলে তা নিজেও জানে না।" ফিকহে হানাফীর মূলনীতি অনুযায়ী, কোনো মানুষের রাগ যদি এমন চরম পর্যায়ে পৌঁছায় যে তার মস্তিষ্ক সাময়িকভাবে বিকৃত (المدهوش) হয়ে যায় এবং সে কী বলছে তা নিজেই বুঝতে পারে না—তবে তার মুখ নিঃসৃত কোনো কথাতেই তালাক হয় না (রদ্দুল মুহতার: ৩/২৪৪)। তবে আপনার স্বামীর ক্ষেত্রে যেহেতু তিনি পরে মনে করতে পেরেছেন যে তিনি আপনাকে কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্যে কথাটি বলেছিলেন, তাই তার বোধশক্তি সম্পূর্ণ লোপ পায়নি; বরং দ্বিতীয় ধাপের ফিকহী মূলনীতি (অর্থাৎ কিনায়া শব্দে তালাকের নিয়ত না থাকা)-এর কারণেই আপনাদের সংসার রক্ষা পেয়েছে।
এখানে দুটি বিষয় আপনার এবং আপনার স্বামীর অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে স্মরণ রাখা অপরিহার্য:
আল্লাহ তাআলা আপনাদের দাম্পত্য জীবন থেকে সকল কলহ ও শয়তানের প্ররোচনা দূর করে দিন এবং পারস্পরিক ভালোবাসা ও বরকত দান করুন। (আমীন) আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।
WhatsApp us