ইসলামিক প্রশ্নোত্তর - রেমিট্যান্সের ওপর সরকারি প্রণোদনা গ্রহণের শরয়ী বিধান
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيم

ফতোয়া ও মাসআলা বিভাগ

প্রশ্নকারী: Md Tajim

প্রশ্ন: সৌদি আরব থেকে বৈধ উপায়ে পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর বাংলাদেশ সরকার ও ব্যাংক কর্তৃক প্রদত্ত অতিরিক্ত প্রণোদনা (Cash Incentive) গ্রহণ করা, তা সুদ হিসেবে গণ্য হবে কি না, ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা এবং কৃষি ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসাবে জমা হলে মূল টাকার সাথে এর পার্থক্যের বিধান কী—এ বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহ ও হানাফী ফিকহের আলোকে বিস্তারিত ফতোয়া জানতে চাই।

ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

সম্মানিত ভাই মো. তাজিম, আপনার প্রেরিত প্রশ্নটি বর্তমান সময়ের অর্থনীতি ও হালাল-হারামের বাছবিচারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনার পরিবারের সদস্য যেহেতু সম্পূর্ণ হালাল উপায়ে সৌদি আরব থেকে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন, তাই এ বিষয়ে শরীয়তের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত পরিষ্কার।

কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা, সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীগণের আসার এবং হানাফী মাযহাবের আইম্মায়ে মুজতাহিদীনের অকাট্য ফিকহী মূলনীতির আলোকে আপনার ৫টি প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট, দালিলিক ও সন্তোষজনক জবাব নিচে পর্যায়ক্রমে পেশ করা হলো:

১ ও ২. রেমিট্যান্স প্রণোদনা গ্রহণ করার বিধান এবং তা ‘সুদ’ কি না?

শরয়ী ফয়সালা: এই প্রণোদনা সুদের অন্তর্ভুক্ত নয়; এটি সরকারের পক্ষ থেকে প্রদত্ত একটি বৈধ ‘আর্থিক অনুদান বা পুরস্কার’

বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং হুন্ডির মতো অবৈধ ও ক্ষতিকর পথ বন্ধ করে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোকে উৎসাহিত করার জন্য সরকার বা রাষ্ট্র তার নিজস্ব রাষ্ট্রীয় তহবিল (বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ বরাদ্দ) থেকে প্রবাসীদের যে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করে, তাকে ইসলামী ফিকহের পরিভাষায় ‘ইআনাহ’ বা ‘হিদিয়াহ/জায়িজা’ (পুরস্কার বা অনুদান) বলা হয়।

এটি কোনোভাবেই ‘সুদ’ (রিবা) নয়। কারণ, সুদ হলো পূর্বশর্তযুক্ত বা ঋণের বিপরীতে অতিরিক্ত লভ্যাংশ, যা ঋণদাতা গ্রহীতার কাছ থেকে আদায় করে। পক্ষান্তরে, এখানে আপনার পরিবারের সদস্য ব্যাংককে কোনো ঋণ দেননি, বরং ব্যাংকের মাধ্যমে নিজের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশে পাঠিয়েছেন। সরকার রাষ্ট্রীয় স্বার্থে ও অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে নিজেই প্রবাসীদের এই প্রণোদনাটি প্রদান করছে। তাই এটি শতভাগ হালাল ও বৈধ।

কুরআন ও ফিকহী দলীল:
ইসলামী অর্থনীতিতে রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার কর্তৃক জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য বা বৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহ প্রদানের উদ্দেশ্যে নাগরিকদের অনুদান বা প্রণোদনা দেওয়ার বহু ঐতিহাসিক নজির রয়েছে। ইসলামী ফিকহের মূলনীতি হলো:

الْأَصْلُ فِي الْأَشْيَاءِ الْإِبَاحَةُ حَتَّى يَدُلَّ الدَّلِيلُ عَلَى التَّحْرِيمِ

মূলনীতি: "যাবতীয় লেনদেন ও বিষয়ের মূল ভিত্তি হলো বৈধতা, যতক্ষণ না কোনো হারাম হওয়ার দলীল পাওয়া যায়।"

— (আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, ইবনে নুজাইম হানাফী: পৃ. ৬০; মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যাহ)

যেহেতু এই প্রণোদনার মধ্যে সুদ, জুয়া বা ধোঁকার মতো কোনো নিষিদ্ধ উপাদান নেই এবং এটি রাষ্ট্র কর্তৃক প্রবাসীদের বৈধ উপার্জনকে উৎসাহিত করার একটি প্রশংসনীয় রাষ্ট্রীয় পলিসি, তাই এটি গ্রহণ করায় বিন্দুমাত্র কোনো পাপ নেই।

৩. এই অতিরিক্ত টাকা নিজের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করার বিধান

যেহেতু এই প্রণোদনার অর্থ সুদ বা হারাম পন্থায় অর্জিত নয়, তাই তা আপনার পরিবারের সদস্য কিংবা প্রেরক প্রবাসীর অনুমতি সাপেক্ষে যেকোনো বৈধ ব্যক্তিগত প্রয়োজনে (যেমন: খাওয়া-দাওয়া, পরিচ্ছদ, চিকিৎসা, পড়াশোনা বা সাংসারিক খরচ) ব্যবহার করা সম্পূর্ণ জায়েজ ও হালাল। এতে কোনো ধরনের তাকওয়ার সন্দেহেরও অবকাশ নেই।

৪. বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসাবে জমা হলে মূল টাকা ও প্রণোদনার টাকার মধ্যে পার্থক্য আছে কি?

মূল টাকা ও প্রণোদনার টাকার যৌথ হুকুম

টাকাটি বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ‘সঞ্চয়ী হিসাব’ (Savings Account)-এ জমা হওয়ার কারণে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি:

  • মূল রেমিট্যান্সের টাকা: এটি সম্পূর্ণ হালাল, কারণ এটি প্রবাসীর সরাসরি শ্রম ও উপার্জনের ফল।
  • প্রণোদনার টাকা: এটি সরকারের পক্ষ থেকে ক্যাশ ইনসেন্টিভ বা অনুদান হিসেবে অ্যাকাউন্টে যোগ হয়।

পার্থক্য বা বিধানগত অবস্থা: সরকারের দেওয়া এই প্রণোদনার টাকা সরাসরি সরকারি কোষাগার বা ব্যাংক কর্তৃক ইনসেন্টিভ হিসেবে আসার কারণে তা হালাল। তবে কৃষি ব্যাংক বা যেকোনো কনভেনশনাল (সুদী) ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসাবে টাকা জমা রাখলে ব্যাংক যে অতিরিক্ত ‘সুদ বা প্রফিট’ প্রদান করে থাকে (যা ব্যাংক নিজ তহবিল থেকে দেয় বা সুদী বিনিয়োগের লভ্যাংশ থেকে দেয়), তার হুকুম প্রণোদনার মতো নয়।

ব্যাংক প্রদত্ত বার্ষিক বা মাসিক সেই সুদ বা প্রমিজড ইন্টারেস্টের টাকা নিজ মালিকানায় রাখা বা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা নাজায়েজ (তা গরিব-মিসকিনকে সওয়াবের নিয়ত ছাড়া সদকা করে দেওয়া ওয়াজিব)। কিন্তু সরকারের দেওয়া ‘রেমিট্যান্স প্রণোদনা’ (Remittance Incentive) এবং ব্যাংকের সাধারণ ‘সুদ’ (Interest) এক নয়। প্রণোদনা সম্পূর্ণ হালাল, আর ব্যাংকের সুদী অংশ হারাম। তাই আপনার অ্যাকাউন্টে প্রণোদনার যে টাকা সরকার বা ব্যাংক ইনসেন্টিভ হিসেবে দিয়েছে, তা আপনি নির্দ্বিধায় ভোগ করতে পারবেন।

৫. প্রণোদনা গ্রহণ করা নাজায়েজ হলে করণীয় কী? (একটি তাত্ত্বিক আলোচনা)

যেহেতু পূর্বের আলোচনা ও ফিকহী মূলনীতির আলোকে প্রমাণিত হলো যে, বৈধ রেমিট্যান্সের ওপর সরকারের এই প্রণোদনা গ্রহণ করা সম্পূর্ণ জায়েজ ও হালাল, তাই এটি বর্জন করার বা সদকা করে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। এটি গ্রহণ করায় আপনাদের কোনো গুনাহ হবে না আলহামদুলিল্লাহ।

সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত ফতোয়া

  1. সৌদি আরব থেকে বৈধ উপায়ে প্রেরিত রেমিট্যান্সের ওপর বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত অতিরিক্ত প্রণোদনা (Incentive) গ্রহণ করা সম্পূর্ণ শরীয়তসম্মত ও জায়েজ।
  2. এই প্রণোদনা কোনোভাবেই ‘সুদ’ নয়; এটি রাষ্ট্র কর্তৃক প্রবাসীদের প্রতি বৈধ আর্থিক অনুদান ও প্রণোদনা।
  3. এই অতিরিক্ত অর্থ আপনারা নিজেদের ব্যক্তিগত ও সাংসারিক প্রয়োজনে অবাধে ব্যবহার করতে পারবেন।
  4. কৃষি ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসাবে এই প্রণোদনার টাকা আসায় কোনো সমস্যা নেই, তবে ব্যাংকের নিজস্ব প্রদত্ত সুদী অংশ থেকে এই প্রণোদনাকে আলাদা রাখতে হবে (প্রণোদনা হালাল, কিন্তু ব্যাংকের সাধারণ সুদী লভ্যাংশ সদকা করা ওয়াজিব)।

প্রাতিষ্ঠানিক দায়মুক্তি (Disclaimer): প্রশ্নকারীর প্রদত্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কুরআন, সুন্নাহ ও হানাফী ফিকহের আলোকে এই শরয়ী সমাধান প্রদান করা হয়েছে। এটি একান্তই ধর্মীয় দিকনির্দেশনা ও পরকালীন আমলের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত; কোনো রাষ্ট্রীয় আদালত বা আইনি বিরোধের দলিল হিসেবে ব্যবহারযোগ্য নয়।

আল্লাহ তাআলা আপনার পরিবারকে হালাল ও পবিত্র রিযিক দান করুন এবং সব ধরনের সন্দেহ থেকে হেফাজত করুন। (আমীন) আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।