আমার কাছে স্বর্ণ রুপা কিছুই নাই এই অবস্থায় নগদ টাকায় যাকাতের মূল্য নির্ধারণ করতে মহাজনরা স্বর্ণকারদের কাছে যে দামে রুপা বিক্রয় করে সেই বিক্রয় মূল্য ধর্তব্য? নাকি স্বর্ণকাররা সাধারণ পাবলিকের কাছে যেই দরে রুপা বিক্রি করে সেই বিক্রয় মূল্য ধরা হবে। মনে করেন মহাজনরা স্বর্ণকারদের কাছে রুপা বিক্রয় করছে এখন বর্তমানে প্রতি ভরি 3500 থেকে 3800 এর মধ্যে আর স্বর্ণকাররা স্বর্ণকাররা বিক্রি করছে একই মানের রুপা 5300 একটু বেশি। কোন বিক্রয় মূল্য দিয়ে আমার নগদ টাকা নেসাব ধরা হবে।
1 Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
আপনার অত্যন্ত সুন্দর ও সময়োপযোগী প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। যেহেতু আপনার কাছে কোনো স্বর্ণ বা রুপা নেই, শুধুমাত্র নগদ টাকা আছে, তাই আপনার জন্য জাকাতের নেসাব নির্ধারণের ক্ষেত্রে খাদ ও মজুরিবিহীন খাঁটি রুপার প্রকৃত বাজার মূল্য (মহাজনি বা বারের দর) ধর্তব্য হবে।
এর কোরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের আলোকে এর বিস্তারিত কারণ ও দলিলাদি নিচে তুলে ধরা হলো:
১. খাঁটি রুপার মূল্য বনাম অলংকারের বিক্রয়মূল্য
শরিয়তে ৫২.৫ ভরি রুপার ওজনের ওপর ভিত্তি করে নেসাব ধরা হয়। স্বর্ণকাররা সাধারণ ক্রেতার কাছে যে দামে রুপা বিক্রি করেন, তার মধ্যে অলংকার তৈরির মজুরি, খাদ, দোকান ভাড়া এবং ভ্যাট যুক্ত থাকে। জাকাতের নেসাবে এই অতিরিক্ত খরচগুলো ধর্তব্য নয়; বরং খাঁটি রুপার (Bullion/Bar price) বাজারদরই মূল ভিত্তি। সুতরাং, মহাজনরা যে দামে বিক্রি করেন (যেমন: আপনার উল্লেখিত ৩৫০০-৩৮০০ টাকা), সেটিই মূলত খাঁটি রুপার আসল দাম।
২. শরিয়তের মূলনীতি—’আনফাউল লিল ফুক্বারা’
হানাফি মাজহাবের জাকাত সংক্রান্ত একটি সুপ্রসিদ্ধ ফিকহি মূলনীতি হলো— “أنفع للفقراء” (আনফাউল লিল ফুক্বারা), যার অর্থ হলো— যেটিতে গরিব ও অভাবীদের বেশি ফায়দা বা লাভ হয়। রুপার মূল্যের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম দামটি (খাঁটি রুপার মহাজনি দাম) ধরলে নেসাব খুব দ্রুত পূর্ণ হয়। এতে জাকাত ফরজ হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়, যা দিনশেষে গরিব মানুষের জন্যই কল্যাণকর। তাই আলেমগণ নগদ টাকার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতিটিই অনুসরণের পরামর্শ দেন।
কোরআন, হাদিস ও ফিকহ শাস্ত্রের দলিলসমূহ:
- আল-কোরআন: আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন,
“তাদের সম্পদ থেকে সাদকা (জাকাত) গ্রহণ করুন, যার দ্বারা আপনি তাদেরকে পবিত্র ও পরিশোধিত করবেন।” (সূরা আত-তাওবাহ: ১০৩)
- হাদিস শরিফ: হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
“…যখন তোমার কাছে ২০০ দিরহাম থাকবে এবং তার উপর এক বছর অতিবাহিত হবে, তখন তা থেকে ৫ দিরহাম (আড়াই শতাংশ) জাকাত দিতে হবে।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ১৫৭৩)
[উল্লেখ্য, ফিকহের পরিভাষায় এই ২০০ দিরহামের ওজনই হলো বর্তমানের ৫২.৫ ভরি বা ৬১২.৩৬ গ্রাম রুপা।] - ফিকহে হানাফি:
- ফতোয়ায়ে শামি (রদ্দুল মুহতার): আল্লামা ইবনে আবিদিন শামি (রহ.) উল্লেখ করেছেন, সম্পদের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে ফুক্বারা বা গরিবদের জন্য যেটি বেশি লাভজনক (أنفع للفقراء), সেটি গ্রহণ করা মুস্তাহাব বা উত্তম। (ফতোয়ায়ে শামি: খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৮৬)
- আল-হিদায়া: জাকাতের ক্ষেত্রে সম্পদের মূল্যের মাপকাঠি হলো সংশ্লিষ্ট শহরের বর্তমান বাজারদর। আর নগদ টাকার নেসাব নির্ধারণের ক্ষেত্রে রুপার সেই বাজারদরটিই ধরা হবে, যা খাঁটি রুপার প্রকৃত মূল্য (Market Value of Pure Silver)। অলংকারের মজুরি বা খাদ এখানে ধর্তব্য নয়। (আল-হিদায়া: খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১৯০)
সিদ্ধান্ত
সুতরাং, পরিচিত কোনো স্বর্ণকারের কাছ থেকে খাঁটি রুপার বারের বর্তমান বাজারমূল্য জেনে, সেই অনুযায়ী আপনার নগদ অর্থের হিসাব করা শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে অধিক সতর্কতামূলক ও সঠিক। আপনার কাছে থাকা নগদ অর্থ যদি ৫২.৫ ভরি রুপার এই মূল্যের সমপরিমাণ বা তার বেশি হয় এবং তা এক চন্দ্রবছর (Lunar Year) অতিবাহিত হয়, তবে আপনার মোট নগদ টাকার আড়াই শতাংশ (২.৫%) জাকাত হিসেবে আদায় করা ফরজ হবে।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে জাকাত আদায় করার তৌফিক দান করুন। আমিন।