জিলহাজের প্রথম দশ দিনে কি কি আমল করা যায় এবং আমল করলে কি কি উপকার হয় দয়া করে জানিয়ে বাধিত করবেন !
1 Answer
জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের আমল ও ফজিলত (কুরআন, সুন্নাহ ও সালাফদের আলোকে)
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
ইসলামী শরীয়তে জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিন বছরের সবচেয়ে বরকতময় ও মর্যাদাপূর্ণ সময়। এই দিনগুলোর ইবাদত আল্লাহর কাছে এত বেশি প্রিয় যে, এর তুলনা অন্য কোনো সময়ের সাথে হয় না। নিচে কুরআন, সুন্নাহ এবং সালাফদের আলোকে এই দিনগুলোর মর্যাদা ও আমল বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. কুরআনের আলোকে জিলহজের প্রথম ১০ দিনের ফজিলত
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এই দিনগুলোর শপথ করেছেন, যা এর চূড়ান্ত মর্যাদার প্রমাণ বহন করে:
“শপথ ফজরের, এবং দশ রাতের।” (সূরা আল-ফাজর: ১-২)
বিখ্যাত মুফাসসির ইবনে আব্বাস (রা.) এবং ইবনে কাসীর (রহ.) বলেন, এখানে ‘দশ রাত’ বলতে জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনকে বোঝানো হয়েছে।
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন:
“…যাতে তারা নির্দিষ্ট দিনসমূহে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে।” (সূরা আল-হাজ্ব: ২৮)
ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মতে, এই ‘নির্দিষ্ট দিনসমূহ’ হলো জিলহজের প্রথম ১০ দিন।
২. হাদিসের আলোকে মর্যাদা
রাসূলুল্লাহ (সা.) এই দিনগুলোর আমলকে শ্রেষ্ঠ আমল হিসেবে ঘোষণা করেছেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন:
“জিলহজের প্রথম দশ দিনের আমলের চেয়ে অন্য কোনো দিনের নেক আমল আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় নয়।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও কি নয়?” তিনি বললেন, “না, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও নয়। তবে হ্যাঁ, সেই ব্যক্তির কথা ভিন্ন, যে নিজের প্রাণ ও সম্পদ নিয়ে জিহাদে বের হলো এবং এর কোনো কিছুই আর নিয়ে ফিরে আসলো না (অর্থাৎ শহীদ হয়ে গেলো)।” (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৯৬৯)
৩. সালাফে সালেহীন ও ইমামগণের ফতোয়া ও আমল
- সাহাবাদের আমল: ইমাম বুখারী (রহ.) উল্লেখ করেন, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) এবং আবু হুরায়রা (রা.) এই দশ দিনে তাকবীর পড়তে পড়তে বাজারে যেতেন, আর তাদের তাকবীর শুনে বাজারের অন্য মানুষেরাও তাকবীর পাঠ শুরু করতেন।
- তাবেঈদের আমল: বিখ্যাত তাবেঈ হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রহ.) এই দশ দিনে এত বেশি পরিমাণ ইবাদত করতেন যে, ক্লান্তিতে তিনি প্রায় ঢলে পড়তেন। (সুনানে দারিমী)
- ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ ও ইবনে কাইয়্যিম (রহ.)-এর ফতোয়া: তাদেরকে প্রশ্ন করা হয়েছিল—রমজানের শেষ দশ দিন শ্রেষ্ঠ নাকি জিলহজের প্রথম দশ দিন? তারা চমৎকার সমাধান দিয়ে বলেন, “দিনের বেলায় জিলহজের প্রথম দশ দিন বছরের শ্রেষ্ঠ দিন, আর রাতের বেলায় রমজানের শেষ দশ রাত বছরের শ্রেষ্ঠ রাত।”
৪. এই ১০ দিনের সুনির্দিষ্ট আমলসমূহ
এই মহামূল্যবান দিনগুলোতে সালাফদের দেখানো পথে আমাদের নিম্নোক্ত আমলগুলো করা উচিত:
- হজ ও ওমরাহ পালন: সামর্থ্যবানদের জন্য এটি এই দিনগুলোর সর্বশ্রেষ্ঠ আমল।
- নফল রোজা রাখা (বিশেষ করে আরাফার দিন): জিলহজের ১ থেকে ৯ তারিখ পর্যন্ত নফল রোজা রাখা অনেক সওয়াবের। বিশেষ করে ৯ তারিখ (আরাফার দিন) রোজা রাখা অত্যন্ত তাগিদপূর্ণ সুন্নাত। রাসূল (সা.) বলেছেন, “আরাফার দিনের রোজার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী যে, তিনি এর মাধ্যমে বিগত এক বছর ও আগামী এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১১৬২)
- তাকবীর, তাহমীদ ও তাহলীল বেশি বেশি পাঠ করা: এই দিনগুলোতে বেশি বেশি ‘আল্লাহু আকবার’ (তাকবীর), ‘আলহামদুলিল্লাহ’ (তাহমীদ) এবং ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (তাহলীল) পাঠ করা সুন্নাত। বিশেষ করে ৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর তাকবীরে তাশরীফ পড়া ওয়াজিব।
- চুল ও নখ না কাটা: যে ব্যক্তি কুরবানী করার নিয়ত করেছেন, তার জন্য জিলহজের চাঁদ ওঠার পর থেকে কুরবানী করা পর্যন্ত শরীরের কোনো চুল, পশম বা নখ না কাটা সুন্নাত (কোনো কোনো ইমামের মতে ওয়াজিব)।
- কুরবানী করা: ১০ জিলহজ সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হালাল পশু কুরবানী করা।
- বেশি বেশি নেক আমল ও তওবা করা: দান-সদকাহ, কুরআন তিলাওয়াত, নফল নামাজ এবং গুনাহ থেকে ফিরে খাঁটি তওবা করা।
জিলহজের এই প্রথম দশটি দিন মুমিন জীবনের এক বিশাল সুযোগ। বছরের অন্য কোনো সময় একসাথে নামাজ, রোজা, সদকাহ এবং হজের মতো বড় বড় ইবাদতের সমাগম ঘটে না। তাই হেলায় সময় নষ্ট না করে এই দিনগুলোতে সর্বাত্মকভাবে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করা প্রতিটি মুসলিমের একান্ত কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা আমাদের তৌফিক দান করুন, আমীন।