কুরবানী কি ? এই বিষয়ে বিস্তারিত বলুন
1 Answer
কুরবানী কী ও কেন? (কুরআন, সুন্নাহ ও সালাফদের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা)
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
কুরবানী ইসলামের অন্যতম একটি মহান শিআর (নিদর্শন) এবং অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ইবাদত। এটি শুধুমাত্র একটি পশু জবাইয়ের উৎসব নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে আছে আত্মত্যাগ, তাকওয়া ও স্রষ্টার প্রতি চরম আনুগত্যের সুদীর্ঘ ইতিহাস।
১. কুরবানী কী?
- আভিধানিক অর্থ: ‘কুরবানী’ শব্দটি আরবি ‘কুরব’ (قرب) ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো নৈকট্য অর্জন করা বা কাছাকাছি যাওয়া। ফিকহের পরিভাষায় একে ‘উযহিয়্যাহ’ (الأضحية) বা ‘যাবাহ’ বলা হয়।
- শরয়ী অর্থ: জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখের যেকোনো দিন আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট নিয়মে শরীয়ত নির্ধারিত হালাল পশু (উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা) জবাই করাকে কুরবানী বলা হয়।
২. কুরবানী কেন? (কুরআন ও সুন্নাহর দলিল)
কুরবানীর মূল উদ্দেশ্য শুধু গোশত খাওয়া বা রক্ত প্রবাহিত করা নয়, বরং আল্লাহর প্রতি তাকওয়া (ভয় ও ভালোবাসা) প্রদর্শন করা এবং হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর চরম আত্মত্যাগের সুন্নাতকে জাগ্রত রাখা।
পবিত্র কুরআনের আলোকে:
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে সরাসরি নির্দেশ দিয়ে ইরশাদ করেন:
“অতএব আপনি আপনার রবের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করুন এবং কুরবানী করুন।” (সূরা আল-কাওসার: ২)
কুরবানীর মূল দর্শন বা ফিলোসফি সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন:
“আল্লাহর কাছে কখনোই সেগুলোর গোশত বা রক্ত পৌঁছে না, বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া (পরহেজগারি বা আল্লাহভীতি)।” (সূরা আল-হাজ্ব: ৩৭)
হাদীস শরীফের আলোকে:
যায়দ ইবনু আরকাম (রা.) থেকে বর্ণিত, সাহাবায়ে কেরাম রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! এই কুরবানী কী?” তিনি বললেন:
“এটি তোমাদের পিতা ইবরাহীম (আ.)-এর সুন্নাত।” তারা আবার জিজ্ঞেস করলেন, “এতে আমাদের জন্য কী সওয়াব রয়েছে?” তিনি বললেন, “পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি রয়েছে।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস: ৩১২৭)
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন:
“কুরবানীর দিন রক্ত প্রবাহিত করার (কুরবানী করার) চেয়ে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় মানুষের আর কোনো আমল নেই।” (সুনানে তিরমিযী, হাদীস: ১৪৯৩)
৩. সাহাবা, তাবেঈ ও ইমামগণের মতামত (ফিকহী বিধান)
কুরবানীর বিধান নিয়ে সালাফে সালেহীন ও চার মাযহাবের ইমামগণের অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ফতোয়া রয়েছে:
- সাহাবা ও সালাফদের আমল: সাহাবায়ে কেরাম কুরবানীকে কখনোই অবহেলা করতেন না। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন, “রাসূলুল্লাহ (সা.) মদীনায় দশ বছর অবস্থান করেছেন এবং প্রতি বছরই কুরবানী করেছেন।” (সুনানে তিরমিযী, হাদীস: ১৫০৭)
- ইমাম আবূ হানীফা (রহ.)-এর ফতোয়া: হানাফী মাযহাবের ফতোয়া অনুযায়ী, সামর্থ্যবান ব্যক্তির ওপর কুরবানী করা ওয়াজিব (আবশ্যক)। কুরবানীর দিনগুলোতে যার কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ (অর্থাৎ মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা বায়ান্ন তোলা রূপা বা এর সমমূল্যের নগদ অর্থ/সম্পদ) থাকবে, তার ওপর কুরবানী ওয়াজিব।
- ইমাম শাফেয়ী, মালেক ও আহমাদ (রহ.)-এর ফতোয়া: জুমহুর (সংখ্যাগরিষ্ঠ) উলামায়ে কেরাম ও বাকি তিন ইমামের মতে, সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য কুরবানী হলো সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ (অত্যন্ত তাগিদপূর্ণ সুন্নাত)। তবে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানী বর্জন করাকে তারা মাকরুহ বা অপছন্দনীয় বলেছেন।
৪. কুরবানীর অন্তর্নিহিত শিক্ষা ও সামাজিক তাৎপর্য
- পরম আনুগত্য: নিজের সবচেয়ে প্রিয় বস্তু এবং নিজের ইচ্ছাকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিলিয়ে দেওয়ার মানসিকতা তৈরি করা।
- অহংকার পতন: পশুর গলায় ছুরি চালানোর সাথে সাথে নিজের ভেতরের পশুত্ব, লোভ, অহংকার ও কৃপণতার গলায় ছুরি চালানো।
- সামাজিক সম্প্রীতি: কুরবানীর গোশত তিন ভাগে ভাগ করে এক ভাগ গরিব-দুঃখীদের এবং এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনকে দেওয়ার মাধ্যমে সমাজে সাম্য ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ইসলামের এক অপূর্ব সৌন্দর্য।
কুরবানী নিছক কোনো প্রথা নয়, এটি ইবরাহীম (আ.)-এর আত্মত্যাগের স্মৃতিচারণ এবং উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম সেরা মাধ্যম। সামর্থ্যবান প্রতিটি মুসলিমের উচিত অত্যন্ত ইখলাস ও তাকওয়ার সাথে এই মহান ইবাদতটি পালন করা। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।