প্রশ্ন: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ। আমি একজন স্ত্রী। কিছুক্ষণ আগে স্বামীর সাথে রাগারাগি হয়। রাগের মাথায় আমি স্বামীকে মেসেজে একসাথে ৩ বার "তালাক" শব্দটি লিখে পাঠাই। তবে মেসেজ লেখার সময় আমি কী লিখছি, তা আমি বুঝতে পারছিলাম না। আমার বয়স ১৭, আমি না বুঝেই বলে ফেলেছি। বর্তমানে আমি অনুতপ্ত। আমি স্বামীর সাথে সংসার করতে চাই এবং বিচ্ছেদ চাই না। আমার প্রশ্ন হলো, এই অবস্থায় আমার কয় তালাক পতিত হয়েছে? এক তালাক-এ-বায়েন হয়েছে, নাকি তিন তালাক হয়ে গেছে? আমাদের সংসার টিকিয়ে রাখার কোনো শরয়ী সুযোগ আছে কি? দয়া করে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে সঠিক নির্দেশনা দিলে চিরকৃতজ্ঞ থাকব।
ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
সম্মানিতা বোন, আপনার প্রশ্নের বিবরণ পড়ে আপনার মানসিক অস্থিরতা ও অনুশোচনা আমরা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারছি। অল্প বয়সের আবেগ ও রাগের বশবর্তী হয়ে আপনি যে কাজটি করে ফেলেছেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়া স্বাভাবিক। তবে শুরুতেই আপনাকে অত্যন্ত আনন্দের সাথে আশ্বস্ত করছি এবং সুসংবাদ দিচ্ছি যে— পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবায়ে কেরামের ইজমা এবং হানাফী মাযহাবের অকাট্য ফতোয়া অনুযায়ী আপনার পাঠানো ওই মেসেজের কারণে একটি তালাকও পতিত হয়নি (এক তালাক-এ-বায়েনও হয়নি, তিন তালাকও হয়নি)। আপনাদের বিবাহ ও সংসার পূর্বের মতোই ১০০% বহাল ও অটুট রয়েছে।
কেন আপনার লেখার দ্বারা কোনো তালাক পতিত হয়নি এবং এ বিষয়ে শরীয়তের বিস্তারিত দলীল ও সূক্ষ্ম ফিকহী বিশ্লেষণ নিচে পর্যায়ক্রমে তুলে ধরা হলো:
ইসলামী শরীয়তে বিবাহের বন্ধন (عقدة النكاح) এবং তালাক প্রদানের ক্ষমতা আল্লাহ তাআলা এককভাবে পুরুষকে (স্বামীকে) দান করেছেন, নারীকে (স্ত্রীকে) নয়। কারণ স্বামীই দেনমোহর পরিশোধ করেন এবং স্ত্রীর ভরণপোষণের আর্থিক ও সামাজিক দায়ভার বহন করেন। তাই কোনো স্ত্রী যদি রাগের মাথায় কিংবা সুস্থ মস্তিষ্কে তার স্বামীকে মুখে বা মেসেজে ৩ বার কেন, ১০০০ বারও "তালাক" লিখে পাঠান বা বলেন "আমি তোমাকে তালাক দিলাম"—তবুও শরীয়তের দৃষ্টিতে তা সম্পূর্ণ অনর্থক কথা (لغو) হিসেবে গণ্য হয় এবং এর দ্বারা শূন্য (০) তালাক অর্থাৎ কোনো তালাকই পতিত হয় না।
পবিত্র কুরআন, হাদিস ও সাহাবায়ে কেরামের দলীল:
১. পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্বামীকেই বিবাহ বন্ধনের মালিক হিসেবে উল্লেখ করে ইরশাদ করেছেন:
অর্থ: "কিন্তু যদি নারীরা (মোহরানা) মাফ করে দেয় কিংবা ওই ব্যক্তি (স্বামী) মাফ করে দেয়, যার হাতে বিবাহের বন্ধন রয়েছে।"
— (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৩৭)রঈসুল মুফাসসিরীন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (রা.), তাবেয়ী হযরত সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব (রহ.), ইমাম শুরাইহ (রহ.) এবং ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে এই আয়াতে «الَّذِي بِيَدِهِ عُقْدَةُ النِّكَاحِ» (যার হাতে বিবাহের গিরো বা তালাকের চাবি রয়েছে) দ্বারা ‘স্বামী’ উদ্দেশ্য (তাফসীরে ইবনে কাসীর: ১/৬৪৭; আহকামুল কুরআন লিল-জাসসাস: ১/৪৪৩)।
২. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) তালাকের অধিকারীর পরিচয় সুস্পষ্ট করে ইরশাদ করেছেন:
অর্থ: "নিশ্চয়ই তালাক দেওয়ার অধিকার একমাত্র তারই, যে স্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছে (অর্থাৎ স্বামীর)।"
— (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং: ২০৮১; সুনানে দারাকুতনী: ৪/২৪; আস-সুনানুল কুবরা লিল-বায়হাকী: ৭/৩৬০)ফিকহে হানাফীর ইমামগণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, তালাকের ক্ষেত্রে স্বামী হলেন ‘ফায়েল’ বা কর্তা (أهل الطلاق), আর স্ত্রী হলেন তালাকের ‘মহল’ বা ক্ষেত্র (محل الطلاق)। তাই স্ত্রী নিজে কখনোই স্বামীর ওপর তালাক প্রয়োগ করতে পারেন না:
১. মালেকুল উলামা ইমাম কাসানী হানাফী (রহ.) তাঁর বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ ‘বাদায়েউস সানায়ে’-তে লিখেছেন:
অনুবাদ: "তালাক প্রদানের উপযুক্ত অধিকারী হলেন সুস্থমস্তিষ্ক ও প্রাপ্তবয়স্ক স্বামী। সুতরাং সকল ইমামের ঐকমত্যে (ইজমা অনুযায়ী) স্বামীর ওপর স্ত্রীর দেওয়া তালাক কখনোই পতিত হয় না; কেননা স্ত্রী হলেন তালাক পতিত হওয়ার ক্ষেত্র, তালাকের মালিক নন।"
— (বাদায়েউস সানায়ে: ৩/৮৮-৯৯; আল-হেদায়া: ২/৩৫৮)২. ‘ফতোয়ায়ে আলমগীরী’ (হিন্দিয়া) এবং ‘রদ্দুল মুহতার’ (ফতোয়ায়ে শামী)-তে উল্লেখ রয়েছে:
অনুবাদ: "যদি কোনো স্ত্রী তার স্বামীকে বলে: 'তুমি তালাক' অথবা 'আমি তোমাকে তালাক দিলাম'—তবে এর দ্বারা কোনো তালাকই পতিত হবে না, এমনকি স্বামী যদি পূর্বে স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ (তাফবীয) করেও থাকেন; কেননা স্বামী তালাক গ্রহণের পাত্র বা ক্ষেত্র নন।"
— (রদ্দুল মুহতার বা ফতোয়ায়ে শামী: ৩/৩২৯; ফতোয়ায়ে আলমগীরী বা হিন্দিয়া: ১/৩৮৭; আল-বাহরুর রায়েক: ৩/৩৩৫)সম্মানিতা বোন, আপনি প্রশ্নে জিজ্ঞেস করেছেন— "এক তালাক-এ-বায়েন হয়েছে, নাকি তিন তালাক হয়ে গেছে?" আমাদের দেশে কাবিননামার ১৮ নং কলামে অনেক সময় স্ত্রীকে শর্তসাপেক্ষে ১টি ‘তালাকে বায়েন’ গ্রহণের ক্ষমতা অর্পণ (تفويض الطلاق) করা থাকে। অনেকের মনে এই ভয় কাজ করে যে, কাবিননামায় ক্ষমতা থাকলে স্ত্রী মেসেজে "তালাক" লিখলেই বুঝি এক তালাকে বায়েন হয়ে যায়! আপনার মনের সকল সন্দেহ চিরতরে দূর করার জন্য হানাফী ফিকহের নিচের ৩টি অকাট্য বিধান জেনে রাখুন, যার কারণে কাবিননামা থাকলেও আপনার মেসেজে কোনো তালাক হয়নি:
অনুবাদ: "স্বামী যখন স্ত্রীর হাতে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ করে, অতঃপর স্ত্রী শুধু বলে: 'তালাক'—এবং তা নিজের দিকে সম্বন্ধ না করে, তবে কোনো তালাক পতিত হবে না, যতক্ষণ না সে তা নিজের দিকে সম্বন্ধ করে বলে: 'আমি তালাকপ্রাপ্তা' বা 'আমি নিজেকে তালাক দিলাম'।" (ফতোয়ায়ে আলমগীরী: ১/৩৮৮; আল-মুহীতুল বুরহানী: ৩/৩৪৫)
সম্মানিতা বোন, যদিও স্ত্রীর হাতে তালাকের ক্ষমতা না থাকার কারণে আপনার সংসার সম্পূর্ণ নিরাপদ রয়েছে, তবুও দুটি বিষয়ে আপনাকে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে:
প্রাতিষ্ঠানিক দায়মুক্তি (Disclaimer): প্রশ্নকারীর প্রদত্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কুরআন, সুন্নাহ ও হানাফী ফিকহের আলোকে এই শরয়ী সমাধান প্রদান করা হয়েছে। এটি একান্তই ধর্মীয় দিকনির্দেশনা ও পরকালীন আমলের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত; কোনো রাষ্ট্রীয় আদালত বা আইনি বিরোধের দলিল হিসেবে ব্যবহারযোগ্য নয়।
আল্লাহ তাআলা আপনাদের দাম্পত্য জীবনে স্থায়ী প্রশান্তি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও অফুরন্ত বরকত দান করুন। (আমীন) আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।
WhatsApp us