বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

বিষয়ঃ যুদ্ধ

(নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ আয়াত-এর তরজমা ও তাফসীর)

আয়াতে কারীমাহ্

وَإِن نَّكَثُوا أَيْمَانَهُم مِّن بَعْدِ عَهْدِهِمْ وَطَعَنُوا فِي دِينِكُمْ فَقَاتِلُوا أَئِمَّةَ الْكُفْرِ ۙ إِنَّهُمْ لَا أَيْمَانَ لَهُمْ لَعَلَّهُمْ يَنتَهُونَ

[التوبة: 12]

সরল অনুবাদ

আর তারা যদি তাদের চুক্তির পর তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে ও তোমাদের দ্বীন সম্পর্কে খোঁটা দেয়, তাহলে অবিশ্বাসীদের নেতৃবর্গের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর। এরা এমন লোক যাদের কোনই চুক্তি (বা কসম) নেই। [১] সম্ভবতঃ তারা নিরস্ত হতে পারে।
সূরার নাম — আত তাওবাহ্ | আয়াত নম্বর — ১২

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

[১] أيمان শব্দটি يمين এর বহুবচন। যার অর্থ হল কসম। أئمة শব্দটি إمام শব্দের বহুবচন, অর্থঃ নেতা বা লিডার। উদ্দেশ্য হল, যদি এই সব লোকেরা অঙ্গীকার বা চুক্তি ভঙ্গ করে ফেলে আর দ্বীনের ব্যাপারে খোঁটা মারে, তাহলে প্রকাশ্যভাবে এরা কসম খেলেও এদের কসমের কোন মূল্য নেই। বরং কাফেরদের ঐ নেতৃবর্গের বিরুদ্ধে লড়াই কর। সম্ভবতঃ এর ফলে তারা কুফর থেকে ফিরে আসবে। এ থেকে হানাফী উলামাগণ দলীল গ্রহণ করে প্রমাণ করেন যে, যিম্মী (ইসলামী দেশে অবস্থানকারী অমুসলিম) যদি চুক্তি ভঙ্গ না করে দ্বীন ইসলামের ব্যাপারে খোঁটা দেয় বা কুমন্তব্য করে, তাহলে তাদেরকে হত্যা করা হবে না। কেননা, কুরআন তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার দু'টি শর্ত উল্লেখ করেছে। অতএব যতক্ষণ পর্যন্ত না সেই দু'টি শর্ত পাওয়া যাবে তাদেরকে হত্যা করা হবে না। কিন্তু ইমাম মালেক (রঃ), ইমাম শাফেয়ী (রঃ) এবং অন্যান্য উলামাগণ দ্বীনের ব্যাপারে খোঁটা দেওয়া বা নিন্দা গাওয়াকে চুক্তি ভঙ্গ করা বলে গণ্য করেছেন। এই জন্য তাঁদের নিকটে দু'টি শর্তই একত্রিত হয়। অতএব এই প্রকার যিম্মী ব্যক্তিকে হত্যা করা (মুসলিম সরকারের জন্য) বৈধ; যেমন বৈধ চুক্তি ভঙ্গকারীকেও হত্যা করা। (ফাতহুল ক্বাদীর)

আয়াতে কারীমাহ্

أَلَا تُقَاتِلُونَ قَوْمًا نَّكَثُوا أَيْمَانَهُمْ وَهَمُّوا بِإِخْرَاجِ الرَّسُولِ وَهُم بَدَءُوكُمْ أَوَّلَ مَرَّةٍ ۚ أَتَخْشَوْنَهُمْ ۚ فَاللَّهُ أَحَقُّ أَن تَخْشَوْهُ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ

[التوبة: 13]

সরল অনুবাদ

তোমরা কি সে সম্প্রদায়ের সাথে যুদ্ধ করবে না, [১] যারা নিজেদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে ও রসূলকে বহিষ্কার করার সংকল্প করেছে?[২] ওরাই প্রথম তোমাদের বিরুদ্ধে বিবাদ সৃষ্টি করেছে।[৩] তোমরা কি তাদেরকে ভয় কর? আল্লাহই এ বিষয়ে বেশী হকদার যে, তোমরা তাঁকে ভয় কর; যদি তোমরা মু’মিন (বিশ্বাসী) হয়ে থাক।
সূরার নাম — আত তাওবাহ্ | আয়াত নম্বর — ১৩

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

[১] মহান আল্লাহ এখানে মুসলিমদেরকে জিহাদের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন।

[২] এ থেকে দারুন নাদওয়ার সেই পরামর্শ উদ্দেশ্য, যাতে মক্কার সর্দাররা নবী (সাঃ)-কে দেশ হতে বহিষ্কার, কারাবদ্ধ অথবা হত্যা করার ব্যাপারে মন্ত্রণা করেছিল。

[৩] এ থেকে উদ্দেশ্য বদর যুদ্ধে মক্কার মুশরিকদের সেই আচরণ, যাতে তারা নিজেদের বাণিজ্যিক কাফেলার হিফাযতের জন্যই বের হয়েছিল। কিন্তু কাফেলা রক্ষা পেয়ে পার হয়ে গেছে দেখেও তারা বদর প্রান্তরে মুসলিমদের সাথে লড়াই করার প্রস্তুতি নিতে লাগল এবং তাঁদেরকে উত্ত্যক্ত করে যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটালো। যার কারণে পরিশেষে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েই গেল। কিম্বা এ থেকে কাবীলা বানী বাকরের সেই সাহায্য উদ্দেশ্য যা কুরাইশরা তাদের জন্য করেছিল। অথচ তারা রসূল (সাঃ)-এর অঙ্গীকারবদ্ধ মিত্র বানী খুযাআহ গোত্রের উপর হামলা করেছিল। বাস্তবপক্ষে কুরাইশদের এই সাহায্য চুক্তির পরিপন্থী ছিল।

আয়াতে কারীমাহ্

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قَاتِلُوا الَّذِينَ يَلُونَكُم مِّنَ الْكُفَّارِ وَلْيَجِدُوا فِيكُمْ غِلْظَةً ۚ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ مَعَ الْمُتَّقِينَ

[التوبة: 123]

সরল অনুবাদ

হে বিশ্বাসীগণ! ঐ অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর যারা তোমাদের আশে-পাশে অবস্থান করে[১] এবং তারা যেন তোমাদের মধ্যে কঠোরতা পায়।[২] আর জেনে রেখো যে, আল্লাহ পরহেযগার (সাবধানী)দের সাথে থাকেন।
সূরার নাম — আত তাওবাহ্ | আয়াত নম্বর — ১২৩

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

[১] এই আয়াতে কাফেরদের সাথে জিহাদ করার এক গুরুতত্ত্বপূর্ণ মৌলিক নিয়ম-নীতি বর্ণনা করা হয়েছে। তা এই যে, কাফেরদের মধ্যে যারা তোমাদের নিকটবর্তী, প্রথমে তাদের সাথে জিহাদ করবে। যেমন নবী (সাঃ) প্রথমে আরব উপদ্বীপে বসবাসকারী মুশরিকদের সাথে জিহাদ করেছেন, যখন তাদের সাথে জিহাদ শেষ করলেন এবং আল্লাহ তাআলা মক্কা, তায়েফ, ইয়ামান, ইয়ামামা, হাজার, খাইবার, হাযরে মাউত ইত্যাদির উপর মুসলিমদেরকে বিজয়ী করলেন এবং আরবের সমস্ত গোত্র দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করল, তখন তিনি আহলে কিতাবদের সাথে জিহাদের সূচনা করলেন এবং নবম হিজরী সনে রোমানদের সাথে জিহাদের জন্য তাবুক রওয়ানা হলেন যা আরব উপদ্বীপের নিকটবর্তী ছিল। উক্ত নীতি অনুযায়ী নবী (সাঃ)-এর মৃত্যুর পর খোলাফায়ে রাশেদীন (রাঃ)গণ রোমের খ্রিষ্টানদের এবং ইরানের অগ্নিপূজকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছিলেন。

[২] অর্থাৎ কাফেরদের প্রতি মুসলিমগণের মন নরম নয়, কঠোর হওয়া দরকার। যেমন—
أَشِدّآءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَآءُ بَيْنَهُم
"কাফেরদের প্রতি কঠোর, নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহানুভূতিশীল" (আল ফাতহ-২৯) সাহাবায়ে কিরামগণের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে। অনুরূপ—
أَذِلَّّةٍ عَلَى الْمُؤمِنِينَ أَعِزّةٍ عَلَى الْكَافِرِين
(আল মায়িদাহ-৫৪) মু'মিনদের বৈশিষ্ট্য।