প্রশ্ন: আসসালামু আলাইকুম। আমি আপনাদের আগের পোষ্টটি পড়েছি। এখানে একটি বিষয় নিয়ে আমি এখনো দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছি। এখানে প্রফিটের হার ফিক্সড (নির্দিষ্ট) নয়, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন হারে প্রফিট দেয়। তাহলে ফিক্সড না হলে কীভাবে সুদের অন্তর্ভুক্ত হবে? আমাকে একজন প্রশ্নটা এভাবে করতে বলল: "আমি আর আমার বন্ধুরা SNAI থেকে আয় করি। ন্যূনতম ১২৫০ টাকা ডিপোজিট করে NFT কিনতে হয়। ৫ দিন পর বিভিন্ন হারে লভ্যাংশ দেয়। ৪০ দিনে টাকা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। ৮ জনকে রেফার করলে ১২% কমিশন ও মাসিক বেতন। অনেক আলেম এতে জড়িত আছেন এবং কেউ প্রতারিত হয়নি।" এখন দয়া করে ফতোয়া দিন, এই ইনকাম কি হালাল?
ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
সম্মানিত ভাই মারুফ আহমেদ, আপনার জিজ্ঞাসা এবং যে ব্যক্তি আপনাকে শব্দের গাঁথুনি পরিবর্তন করে পুনরায় প্রশ্নটি করতে শিখিয়েছেন, তার বুদ্ধিমত্তার প্রতি আমরা সম্মান জানাই। তবে একটি অমোঘ সত্য আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে—শব্দের মারপ্যাঁচ, বাক্যের পরিবর্তন কিংবা কোনো মানুষের যুক্তির কারণে ইসলামী শরীয়তের অকাট্য বিধান কখনোই পরিবর্তিত হয় না। হারামকে হালাল করার জন্য যদি আসমান ও জমিন একাকার হয়ে যায়, তবুও সত্য তার নিজ স্থানে অটল থাকে। কুরআন, সুন্নাহ এবং হানাফী ফিকহের মানদণ্ডে আপনাদের এই নতুন যুক্তির দালিলিক ও সুস্পষ্ট খণ্ডন নিচে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পেশ করা হলো:
আপনাকে যিনি বুঝিয়েছেন যে "ফিক্সড না হলে সুদ হয় না", তিনি ইসলামী ফিকহের (ফিকহুল বুয়ূ) একটি বিশাল বড় মূলনীতি এড়িয়ে গেছেন। ইসলামে হালাল ব্যবসার (মুদারাবা বা অংশীদারি) প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো 'লোকসানের ঝুঁকি' (Risk of Loss) থাকা।
যদি এমন হয় যে, আপনার মূলধন (১২৫০ টাকা বা তদূর্ধ্ব) ১০০% সুরক্ষিত, আপনি কখনোই মূলধন হারাবেন না, শুধু প্রফিট পাবেন (কখনো ৫ টাকা, কখনো ১০ টাকা)—তবে ইসলামী শরীয়তে এটি কোনো ব্যবসাই নয়, এটি হলো সরাসরি ঋণ (Qardh)। আর ঋণের বিপরীতে প্রাপ্ত যেকোনো অতিরিক্ত অর্থই হলো 'রিবা' বা সুদ, তা ফিক্সড হোক বা পরিবর্তনশীল (Variable) হোক।
বিখ্যাত ফিকহী মূলনীতি: "যেকোনো ঋণ যা কোনো ধরনের মুনাফা টেনে আনে, তা-ই সুদ।"
— (সুনানে আল-বায়হাকী: ৫/৩৪৯; ফতোয়ায়ে শামী: ৫/১৬৬)ইসলামী অর্থনীতিতে হালাল ব্যবসার মূলনীতি হলো:
"মুনাফা অর্জনের অধিকার ঝুঁকির সাথে সম্পৃক্ত।" (সুনানে আবু দাউদ: ৩৫১০)
যেহেতু SNAI সাইটগুলোতে আপনার মূলধন কমার বা জিরো হওয়ার কোনো ব্যবসায়িক ঝুঁকি নেই এবং ৪০ দিনে টাকা অবধারিতভাবে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়, তাই এর মুনাফা ৫% থেকে ১২% এর মধ্যে যতবারই ওঠানামা করুক না কেন—এটি একটি নিখাদ সুদী কারবার। মুনাফার হার পরিবর্তনশীল হওয়াটা সুদকে হালাল করার একটি আইওয়াশ মাত্র।
ইসলামী শরীয়তে ক্রয়-বিক্রয় সহীহ হওয়ার জন্য পণ্যের বাস্তব অস্তিত্ব ও ক্রেতার পূর্ণ 'কবজা' (Possession) থাকা শর্ত। এই সাইটগুলোতে তথাকথিত যে NFT কেনা হয়, তার কোনো বাস্তব উপযোগিতা (Utility) নেই এবং তা আপনি ওই সাইটের বাইরে স্বাধীনভাবে অন্য কোনো প্ল্যাটফর্মে বিক্রি করতে পারেন না। এটি মূলত সুদ লেনদেনের একটি সাজানো নাটক, যাকে ফিকহের ভাষায় 'বাইউল ইনা' (بيع العينة) বা হালাল লেবাসে সুদের ফাঁদ বলা হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) এই ধরনের ধোঁকাপূর্ণ লেনদেনকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন। (সুনানে আবু দাউদ: ৩৪৬২)
৮ জনকে রেফার করলে তাদের আয়ের ওপর ১২% কমিশন এবং কোম্পানির দেওয়া মাসিক বেতনের যে প্রলোভন দেখানো হয়েছে, এটি মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং (MLM) ও পনজি স্কিমের (Ponzi Scheme) ক্লাসিক রূপ। অন্যের বিনিয়োগ এবং সুদী আয়ের ওপর ভিত্তি করে চেইন সিস্টেমে কমিশন খাওয়া শরীয়তে সম্পূর্ণ হারাম। এটি পবিত্র কুরআনের এই আয়াতের সরাসরি লঙ্ঘন:
"তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না।" (সূরা আল-বাকারা: ১৮৮)
ইসলামে কোনো কাজ হালাল বা হারাম হওয়ার মানদণ্ড কোনো ব্যক্তির আমল বা হুজুরদের সম্পৃক্ততা নয়। শরীয়তের একমাত্র মানদণ্ড হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা.) অকাট্য বিধান। হযরত আলী (রা.)-এর একটি ঐতিহাসিক ও অমর উক্তি রয়েছে:
"মানুষ দিয়ে সত্যকে চেনা যায় না; বরং সত্যকে চিনো, তাহলে কারা সত্যের ওপর আছে তা চিনতে পারবে।"
"কেউ প্রতারিত হয়নি" বা "টাকা ঠিকমতো দিচ্ছে"—এটি ব্যবসার বৈধতার দলিল নয়। পৃথিবীর বড় বড় সুদী ব্যাংক এবং ক্যাসিনোগুলোও তাদের কাস্টমারদের ঠিকমতো টাকা দেয়, তাই বলে সুদ ও জুয়া হালাল হয়ে যায় না।
প্রিয় ভাই, দুনিয়ার কোনো হালাল ব্যবসায় জাদুর মতো ৪০ দিনে টাকা দ্বিগুণ হয় না। এটি একটি আন্তর্জাতিক পনজি স্কিম এবং সুদভিত্তিক এমএলএম চক্র। মুনাফা পরিবর্তনশীল হওয়ার যুক্তি দিয়ে এই হারামকে কোনোভাবেই হালাল করার সুযোগ নেই।
SNAI এবং এই জাতীয় সমস্ত প্ল্যাটফর্মে বিনিয়োগ করা, কাজ করা, অন্যকে রেফার করা এবং এর থেকে প্রাপ্ত যেকোনো প্রকার আয় ইসলামী শরীয়তে সম্পূর্ণরূপে হারাম।
আমরা অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আপনাকে এবং আপনার বন্ধুদের অনুরোধ করছি, হারামের ভেতরে হালাল খোঁজার চেষ্টা না করে আল্লাহর ভয়ে এই পথ থেকে ফিরে আসুন। যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে হারাম বর্জন করে, আল্লাহ তাকে এর চেয়েও উত্তম হালাল রিজিক দান করেন।
আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।
WhatsApp us