প্রশ্ন: আমার প্রশ্ন হচ্ছে এই যে, আমার আগের চশমাটা ভেঙে যাওয়ায় নতুন একটা চশমা কিনেছি, কিন্তু বাসায় আসার পর লক্ষ্য করলাম যে এই চশমায় এমন এক ব্যক্তির নাম লিখা আছে যে স্পষ্টভাবেই সমকামী—মানে চশমাটা এই নামে থাকা একটি জনপ্রিয় ব্র্যান্ডেরই চশমা বলা যায়, "Tom Ford" ব্র্যান্ড। কেনার সময় খেয়াল করলেও জানতাম না বিষয়টা, বাসায় পরে সবটা জেনেছি। তো চশমার মূল্য পরিশোধ করে ফেলেছি এবং পাওয়ারের গ্লাসও বসানো হয়েছে বিধায় ফেরত দেওয়ার কথা মাথা থেকে ফেলে দিয়ে মোট তিনটা জায়গায় লিখা সেই নামকে ডলে ডলে উঠিয়ে ভালোভাবে মুছে ফেলেছি; কারণ এমন এক ব্যক্তির নাম চশমায় নিয়ে চলাফেরা করাটা আমার কাছে স্বাভাবিক ঠেকেনি। কিন্তু চশমার সামনের দিকে দুই পাশে "T" অক্ষরের মতো দুইটা লোগো মজবুতভাবে লাগানো আছে যেগুলো এই ব্র্যান্ডের প্রায় সব চশমাতেই থাকে হয়তো যা "Tom"-এর "T"-কে নির্দেশ করে বোধহয়, তো সেগুলো সহজে উঠাতে পারিনি চেষ্টা করেও। তো এগুলোকে পার্মানেন্ট মার্কার পেন দিয়ে কালো করে পরে উপরে সাবধানে সুপার গ্লু লাগিয়ে দিলে কি যথেষ্ট হবে? কিংবা আমার জন্য এই চশমা কেনাটাই কি হারাম ছিল? নাকি কেনা ঠিক থাকলেও যা যা আরো করা উচিত তা সবটুকু করিনি? প্লিজ বিস্তারিত দালিলিক বিশ্লেষণ সহকারে সম্ভব হলে আমাকে জানান যে এটা ব্যবহার করাই আমার জন্য বৈধ হবে কিনা অথবা আরো কী কী করা যেতে পারে।
ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
সম্মানিত ভাই হাসিব, কওমে লূতের জঘন্যতম পাপ সমকামিতার (اللواط) প্রতি আপনার অন্তরের এই তীব্র ঘৃণা এবং একজন পাপিষ্ঠ ব্যক্তির নাম নিজের ব্যবহৃত জিনিসে বহন না করার এই ঈমানী অনুভূতি নিঃসন্দেহে আপনার অন্তরে বিদ্যমান ‘ঈমানী গাইরত’ ও তাকওয়ার পরিচায়ক। আল্লাহ তাআলা আপনার এই ঈমানী সচেতনতাকে কবুল করুন।
তবে প্রিয় ভাই, ইসলামী শরীয়ত যেমন আমাদেরকে পাপ ও পাপীদের প্রতি ঘৃণা পোষণ করতে শেখায়, ঠিক তেমনি দ্বীনের ভেতরে অহেতুক কাঠিন্য (التشدد), নিজের সম্পদ নষ্ট করা এবং অতিরিক্ত মানসিক পেরেশানি বা ওয়াসওয়াসা থেকেও আমাদেরকে মুক্তি দেয়। পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে সালেহীনের আমল এবং হানাফী মাযহাবের আইম্মায়ে মুজতাহিদীনের অকাট্য ফিকহী মূলনীতির আলোকে আপনাকে শুরুতেই আশ্বস্ত করছি যে— এই চশমাটি কেনা আপনার জন্য মোটেও হারাম ছিল না, এবং এটি যেভাবে আছে ঠিক সেভাবে ব্যবহার করাও আপনার জন্য ১০০% জায়েজ ও হালাল। চশমার ফ্রেমে সুপার গ্লু বা মার্কার লাগিয়ে চশমাটি নষ্ট বা বিশ্রী করারও কোনো শরয়ী প্রয়োজন নেই।
আপনার মনের সমস্ত সংশয় দূর করার জন্য নিচে কুরআন-হাদিস ও ফিকহে হানাফীর দালিলিক বিশ্লেষণ ধাপে ধাপে পেশ করা হলো:
ইসলামী ফিকহের সর্বজনস্বীকৃত মূলনীতি হলো, কোনো বস্তু হালাল বা হারাম হওয়া নির্ভর করে ওই বস্তুটির নিজস্ব উপাদান এবং তার ব্যবহারের উদ্দেশ্যের ওপর—নির্মাতা বা ব্র্যান্ডের মালিকের ব্যক্তিগত আকীদা বা চরিত্রের ওপর নয়। দুনিয়াতে শিরক ও কুফরের চেয়ে বড় কোনো পাপ নেই; অথচ স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) এবং সাহাবায়ে কেরাম (রা.) মুশরিক, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের তৈরি পোশাক, অস্ত্র, পাত্র ও জুতা ক্রয় করেছেন এবং আজীবন ব্যবহার করেছেন।
পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য দলীল:
১. মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন:
অর্থ: "তিনিই সেই মহান সত্তা, যিনি পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তোমাদের (ব্যবহারের) জন্য সৃষ্টি করেছেন।" (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৯)
এই আয়াতের আলোকে হানাফী মাযহাবের ফিকহী কায়েদা হলো:
মূলনীতি: "বস্তুজগতের সকল কিছুর মূল ভিত্তি হলো তা ব্যবহার করা বৈধ (হালাল), যতক্ষণ না তা হারাম হওয়ার সুনির্দিষ্ট কোনো শরয়ী দলীল পাওয়া যায়।"
— (আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, ইবনে নুজাইম হানাফী: পৃ. ৬০; ফাতহুল কাদীর: ৭/১১৯)২. সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) নাজরানের খ্রিস্টানদের তৈরি চাদর এবং রোমক (বাইজান্টাইন খ্রিস্টান) ও ইয়ামেনের ইহুদিদের বোনা জুব্বা পরিধান করেছেন:
অর্থ: হযরত মুগীরা ইবনে শু'বা (রা.) হতে বর্ণিত, "রাসূলুল্লাহ (সা.) সংকীর্ণ হাতাওয়ালা একটি রোমান (অমুসলিমদের তৈরি) জুব্বা পরিধান করেছিলেন।"
— (সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৩৬৩; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৭৪)সুতরাং, না জেনে তো বটেই, এমনকি জেনেশুনেও কোনো অমুসলিম বা পাপী ব্যক্তির কোম্পানির তৈরি বৈধ পণ্য (যেমন: চশমার ফ্রেম, মোবাইল, ঘড়ি বা কাপড়) প্রয়োজনের তাগিদে ক্রয় করা ও ব্যবহার করা শরীয়তে সম্পূর্ণ জায়েজ। এতে গুনাহ হওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না।
আপনি চশমার গায়ে লেখা নামটি ডলে মুছে ফেলেছেন—এটি আপনার ব্যক্তিগত তাকওয়া ও রুচিবোধের কারণে করেছেন, যা ভালো কাজ। কিন্তু সামনের দিকে থাকা ধাতব “T” লোগোটি নিয়ে আপনার মনে যে অস্থিরতা কাজ করছে, তার ফিকহী সমাধান অত্যন্ত স্পষ্ট:
হানাফী মাযহাবের প্রামাণ্য ফতোয়া গ্রন্থ ‘রদ্দুল মুহতার’ (ফতোয়ায়ে শামী) এবং ‘ফাতহুল কাদীর’-এ ‘তাশাব্বুহ’ (সাদৃশ্য অবলম্বন)-এর সীমা নির্ধারণ করে বলা হয়েছে:
অনুবাদ: "জেনে রাখুন, আহলে কিতাব (বা ফাসেকদের) সাথে সাদৃশ্য হওয়া সব কিছুর ক্ষেত্রে মাকরূহ বা নিষিদ্ধ নয়; বরং কেবল ওই বিষয়েই নিষিদ্ধ যা স্বয়ং নিন্দনীয় এবং যেখানে তাদের সাদৃশ্য অবলম্বনের নিয়ত থাকে, অথবা যা একান্তই তাদের বিশেষ ধর্মীয় বা পাপাচারের প্রতীক (শিআর) হিসেবে পরিচিত।"
— (রদ্দুল মুহতার বা ফতোয়ায়ে শামী: ১/৬২৪ ও ৬/৪০৭; উমদাতুল কারী শরহু সহীহিল বুখারী, আল্লামা আইনী হানাফী: ২২/৪১)প্রিয় ভাই হাসিব, আপনি জিজ্ঞেস করেছেন— "এগুলোকে পার্মানেন্ট মার্কার পেন দিয়ে কালো করে পরে উপরে সাবধানে সুপার গ্লু লাগিয়ে দিলে কি যথেষ্ট হবে?"
আমাদের সুস্পষ্ট ফিকহী পরামর্শ হলো— দয়া করে চশমাটিতে সুপার গ্লু লাগাতে যাবেন না! কারণ:
যখন কোনো যুবক দ্বীনের পথে চলতে শুরু করে এবং হালাল-হারাম মেনে চলতে চায়, তখন শয়তান তাকে সরাসরি গুনাহ করাতে না পেরে ছোটখাটো বৈধ বিষয়ে অতিরিক্ত খুঁতখুঁতে স্বভাব (تعمق ووسوسة) তৈরি করে দেয়, যাতে সে ভাবতে থাকে—"আমি বুঝি এখনো পুরোপুরি হক আদায় করতে পারিনি!" এর ফলে একসময় তার কাছে দ্বীন পালন করাটাই বোঝা মনে হয়। এজন্য রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) আমাদেরকে সতর্ক করে ইরশাদ করেছেন:
অর্থ: "নিশ্চয়ই ইসলাম (দ্বীন) অত্যন্ত সহজ ও স্বাভাবিক। যে কেউ দ্বীনের বিষয়ে (অহেতুক) কড়াকড়ি বা বাড়াবাড়ি করবে, সে পরাজিত হবে (ক্লান্ত হয়ে পড়বে)। সুতরাং তোমরা মধ্যমপন্থা অবলম্বন করো, কাছাকাছি থাকো এবং সুসংবাদ গ্রহণ করো।"
— (সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৩৯; সুনানে নাসায়ী: ৫০৩৪)বিখ্যাত তাবেয়ী ইমাম সুফিয়ান সাওরী (রহ.) বলতেন:
অর্থ: "প্রকৃত ফিকহ (দ্বীনের প্রজ্ঞা) হলো নির্ভরযোগ্য দলীলের ভিত্তিতে শরীয়তের সহজতা ও অবকাশকে জানা; কেননা কঠোরতা তো যে কেউই দেখাতে পারে।"
— (জামিউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাদলিহী, ইবনে আবদিল বার: ২/৮১৭; শরহু উকূদি রাসমিল মুফতি লিশ-শামী)প্রাতিষ্ঠানিক দায়মুক্তি (Disclaimer): প্রশ্নকারীর প্রদত্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কুরআন, সুন্নাহ ও হানাফী ফিকহের আলোকে এই শরয়ী সমাধান প্রদান করা হয়েছে। এটি একান্তই ধর্মীয় দিকনির্দেশনা ও পরকালীন আমলের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত; কোনো রাষ্ট্রীয় আদালত বা আইনি বিরোধের দলিল হিসেবে ব্যবহারযোগ্য নয়।
আল্লাহ তাআলা আপনার ঈমানী সচেতনতাকে বৃদ্ধি করে দিন এবং আপনার অন্তরকে সকল প্রকার অহেতুক সংশয় থেকে মুক্ত রাখুন। (আমীন) আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।
WhatsApp us