প্রশ্ন: আসসালামু আলাইকুম শাইখ। আমি একজন তালাকপ্রাপ্তা মহিলাকে বিয়ে করতে চাচ্ছি। মহিলার তালাকটি শরীয়াহ সম্মতভাবে হয়েছে কি না জানার জন্য প্রশ্নটি করতেছি। মহিলার স্বামী তাকে ৫/৬ বার মেসেজের মাধ্যমে লিখেছে যে "যাহ তোকে তালাক দিলাম" এবং ফোনকলে ও ৩/৪ বার বলেছে যে "তোকে তালাক দিলাম"। এই তালাকটি শরীয়াহ সম্মতভাবে হয়েছে কি না? আর যদি তালাক হয়ে যায় তবে মহিলাটি কিভাবে ইদ্দত পালন করবে? আর আমি কি মহিলাটিকে বিবাহ করতে পারবো কি না ইদ্দত পালনের পর?
ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
সম্মানিত ভাই ফজলে এলাহী, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট। শরীয়াহসম্মতভাবে জীবনযাপন করার যে আগ্রহ আপনি দেখিয়েছেন, আল্লাহ তাআলা তা কবুল করুন এবং আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। হানাফী ফিকহ, কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আপনার তিনটি প্রশ্নের পর্যায়ক্রমিক উত্তর নিচে প্রদান করা হলো:
ইসলামী শরীয়তে তালাকের ব্যাপারে সরাসরি সম্বোধন করে বলা এবং লিখে পাঠানো—উভয়টিই সমানভাবে কার্যকর। ফিকহের মূলনীতি হলো:
"লেখাও সরাসরি সম্বোধন করে কথা বলার মতো (কার্যকর)।"
— (রদ্দুল মুহতার বা ফতোয়ায়ে শামী: ৩/২৪৬)যেহেতু প্রথম স্বামী মেসেজে ৫/৬ বার এবং ফোনকলে ৩/৪ বার "তোকে তালাক দিলাম" (যাকে শরীয়তের পরিভাষায় 'তালাকে সরীহ' বা সুস্পষ্ট তালাক বলা হয়) বলেছে, তাই উচ্চারণের সাথে সাথেই শরীয়তের বিধান অনুযায়ী তিন তালাক পতিত হয়ে গেছে।
হানাফী মাযহাবের চূড়ান্ত ফতোয়া:
যখন স্বামী সুস্পষ্ট ভাষায় স্ত্রীকে তিন বা ততোধিক বার তালাক দেয়, তখন স্ত্রীর উপর 'তালাকে মুগাল্লাযা' (الطلاق المغلظة) বা চূড়ান্ত তালাক পতিত হয়। এর ফলে তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক সম্পূর্ণরূপে এবং চিরতরে হারাম হয়ে যায়।
"আর যদি স্বামী তাকে তিন তালাক দেয়, তবে সে স্ত্রী তার জন্য আর হালাল থাকবে না, যতক্ষণ না সে অন্য কোনো স্বামীকে বিয়ে করে।"
— (আল-হেদায়া: ২/৪০৯; আল-কুরআন, সূরা আল-বাকারা: ২৩০)সুতরাং, শরীয়াহসম্মতভাবে উক্ত মহিলার তালাক সম্পূর্ণভাবে কার্যকর হয়ে গেছে এবং তিনি এখন পূর্বের স্বামী থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত।
তালাকপ্রাপ্তা হওয়ার পর নারীকে অবশ্যই ইদ্দত পালন করতে হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইদ্দতের বিধান সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন:
"আর তালাকপ্রাপ্তা নারীরা তিন হায়েয (ঋতুস্রাব) পর্যন্ত নিজেদেরকে অপেক্ষায় রাখবে।"
— (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২২৮)ইদ্দতের নিয়মসমূহ:
ইদ্দত চলাকালীন সময়ে মহিলাকে বিনা প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়া, সাজগোজ করা এবং নতুন বিবাহের প্রস্তাব গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
ইসলামী শরীয়তে তালাকপ্রাপ্তা নারীকে বিবাহ করা কোনো দোষণীয় কাজ নয়, বরং এটি রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) এবং সাহাবায়ে কেরামের (রা.) সুন্নাহ। অনেক সাহাবী ও সালাফে সালেহীন তালাকপ্রাপ্তা ও বিধবা নারীদের অত্যন্ত সম্মানের সাথে বিবাহ করেছেন।
উপরোক্ত মহিলার ইদ্দত (৩ হায়েয বা নির্দিষ্ট সময়) পূর্ণ হওয়ার পর, আপনি অবশ্যই তাকে ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক নতুন মোহরানা নির্ধারণ করে এবং ২ জন সাক্ষীর উপস্থিতিতে বিবাহ করতে পারবেন। এতে শরীয়তের কোনো বাধা নেই, বরং একজন অসহায় নারীকে সম্মানজনক জীবন দেওয়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
১. মেসেজ এবং ফোনকলের মাধ্যমে স্বামী একাধিকবার সুস্পষ্ট তালাক দেওয়ায়, শরীয়াহ মোতাবেক মহিলার ওপর 'তিন তালাক' পতিত হয়ে বৈবাহিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন হয়ে গেছে।
২. মহিলাকে তালাকের দিন থেকে পূর্ণ ৩ হায়েয (মাসিক) পর্যন্ত ইদ্দত পালন করতে হবে।
৩. মহিলার ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার পর আপনি তাকে বিবাহ করতে পারবেন; এটি সম্পূর্ণ জায়েজ এবং হালাল।
আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।
WhatsApp us