বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

বিষয়ঃ তালাক

(নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ আয়াত-এর তরজমা ও তাফসীর)

আয়াতে কারীমাহ্

فَإِن طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِن بَعْدُ حَتَّىٰ تَنكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ ۗ فَإِن طَلَّقَهَا فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا أَن يَتَرَاجَعَا إِن ظَنَّا أَن يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ ۗ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ يُبَيِّنُهَا لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ

[البقرة: 230]

সরল অনুবাদ

অতঃপর উক্ত স্ত্রীকে যদি সে (তৃতীয়) তালাক দেয়, তবে যে পর্যন্ত না ঐ স্ত্রী অন্য স্বামীকে বিবাহ করবে, তার পক্ষে সে বৈধ হবে না। অতঃপর ঐ দ্বিতীয় স্বামী যদি তাকে তালাক দেয় এবং যদি উভয়ে মনে করে যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করে চলতে পারবে, তাহলে তাদের (পুনর্বিবাহের মাধ্যমে দাম্পত্য-জীবনে) ফিরে আসায় কোন দোষ নেই।[১] এ সব আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা, জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য আল্লাহ এগুলি স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন।
সূরার নাম — আল বাকারা | অবর্তীণ — মদীনায় | আয়াত নম্বর — ২৩০

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

[১] এই তালাক থেকে তৃতীয় তালাক বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, তৃতীয় তালাক দেওয়ার পর স্বামী স্ত্রীকে না ফিরিয়ে নিতে পারবে, আর না পুনর্বিবাহ করতে পারবে। তবে হ্যাঁ, এই মহিলার যদি অন্যত্র বিবাহ হয় এবং দ্বিতীয় স্বামী যদি স্বেচ্ছায় তাকে তালাক দেয় অথবা সে (স্বামী) যদি মারা যায়, তাহলে প্রথম স্বামীর জন্য তাকে পুনর্বিবাহ করা জায়েয হবে। কিন্তু এ ব্যাপারে আমাদের দেশে যে হালালা (হীলা) প্রথা চালু আছে, তা একটি অভিশপ্ত কর্মকান্ড। নবী করীম (সাঃ) যে হালালা করে এবং যে করায় তাদের উভয়কেই অভিশাপ করেছেন। হালালা করানোর উদ্দেশ্যে কৃত বিবাহ, প্রকৃতপক্ষে বিবাহ নয়, বরং তা ব্যভিচার। এই (অবৈধ পরিকল্পিত) বিবাহের মাধ্যমে মহিলা প্রথম স্বামীর জন্য বৈধ হবে না।

আয়াতে কারীমাহ্

وَإِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَبَلَغْنَ أَجَلَهُنَّ فَأَمْسِكُوهُنَّ بِمَعْرُوفٍ أَوْ سَرِّحُوهُنَّ بِمَعْرُوفٍ ۚ وَلَا تُمْسِكُوهُنَّ ضِرَارًا لِّتَعْتَدُوا ۚ وَمَن يَفْعَلْ ذَٰلِكَ فَقَدْ ظَلَمَ نَفْسَهُ ۚ وَلَا تَتَّخِذُوا آيَاتِ اللَّهِ هُزُوًا ۚ وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَمَا أَنزَلَ عَلَيْكُم مِّنَ الْكِتَابِ وَالْحِكْمَةِ يَعِظُكُم بِهِ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ

[البقرة: 231]

সরল অনুবাদ

যখনই তোমরা স্ত্রীদের (রজয়ী) তালাক দাও এবং তারা ‘ইদ্দত’ (নির্দিষ্ট সময়) পূর্ণ করে, তখন তাদেরকে বিধিমতে বহাল কর অথবা সদ্ভাবে বিদায় দাও।[১] তাদের প্রতি নির্যাতন করার উদ্দেশ্যে তাদেরকে আটক করে রেখো না। যে ব্যক্তি এমন করে, সে নিজের ক্ষতি করে এবং তোমরা আল্লাহর নিদর্শনাবলীকে ঠাট্টা-তামাশার বস্তু করো না।[২] তোমাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ ও কিতাব এবং বিজ্ঞান যা তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ করেছেন ও যা দিয়ে তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন, তা স্মরণ কর। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আর জেনে রেখো যে, আল্লাহ সর্ব বিষয়ে জ্ঞানময়।
সূরার নাম — আল বাকারা | অবর্তীণ — মদীনায় | আয়াত নম্বর — ২৩১

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

[১] ((الطلاق مرتان)) এ বলা হয়েছিল যে, দু'বার তালাক পর্যন্ত ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকার থাকে। এই আয়াতে বলা হচ্ছে যে, ফিরিয়ে নেওয়া ইদ্দতের মধ্যে হতে পারে। ইদ্দত অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পর নয়। অতএব এখানে একই কথার পুনরাবৃত্তি হয়নি, যেমন বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হয়。

[২] কেউ কেউ ঠাট্টাচ্ছলে তালাক দিয়ে অথবা বিবাহ করে কিংবা ক্রীতদাস স্বাধীন করে দিয়ে বলে যে, আমি তো ঠাট্টা করেছিলাম। মহান আল্লাহ এটাকে তাঁর আয়াতের সাথে ঠাট্টা বলে গণ্য করেছেন। এ থেকে উদ্দেশ্য হল, এ রকম কার্যকলাপ থেকে মানুষকে বিরত রাখা। এই জন্য নবী করীম (সাঃ) বলেছেন যে, ঠাট্টাচ্ছলেও কেউ যদি উল্লিখিত কাজগুলো করে বসে, তাহলে তা বাস্তবই গণ্য হবে এবং ঠাট্টাচ্ছলে তালাক দিলে অথবা বিবাহ করলে বা স্বাধীন করলে তা কার্যকরী হয়ে যাবে। (ইবনে কাসীর)

আয়াতে কারীমাহ্

وَإِن طَلَّقْتُمُوهُنَّ مِن قَبْلِ أَن تَمَسُّوهُنَّ وَقَدْ فَرَضْتُمْ لَهُنَّ فَرِيضَةً فَنِصْفُ مَا فَرَضْتُمْ إِلَّا أَن يَعْفُونَ أَوْ يَعْفُوَ الَّذِي بِيَدِهِ عُقْدَةُ النِّكَاحِ ۚ وَأَن تَعْفُوا أَقْرَبُ لِلتَّقْوَىٰ ۚ وَلَا تَنسَوُا الْفَضْلَ بَيْنَكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ

[البقرة: 237]

সরল অনুবাদ

যদি স্পর্শ করার পূর্বে স্ত্রীদের তালাক দাও, অথচ মোহর পূর্বেই ধার্য করে থাক, তাহলে নির্দিষ্ট মোহরের অর্ধেক আদায় করতে হবে।[১] কিন্তু যদি স্ত্রী অথবা যার হাতে বিবাহ-বন্ধন[২] সে যদি মাফ করে দেয়, (তাহলে স্বতন্ত্র কথা।) অবশ্য তোমাদের মাফ করে দেওয়াই আত্মসংযমের নিকটতর। তোমরা নিজেদের মধ্যে সহানুভূতি (ও মর্যাদার) কথা বিস্মৃত হয়ো না। নিশ্চয় তোমরা যা কর, আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা।
সূরার নাম — আল বাকারা | অবর্তীণ — মদীনায় | আয়াত নম্বর — ২৩৭

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

[১] এখানে আর এক নিয়মের কথা বলা হচ্ছে, সহবাসের পূর্বে তালাক দিয়ে দিয়েছে, কিন্তু মোহর নির্ধারিত ছিল। এমতাবস্থায় স্বামীর জন্য জরুরী হল অর্ধেক মোহর আদায় করা। কিন্তু স্ত্রী যদি তার মোহরের অধিকার মাফ করে দেয়, তাহলে স্বামীকে কিছুই দিতে হবে না।

[২] এ থেকে স্বামীকে বুঝানো হয়েছে। কারণ, বিবাহের বন্ধন (অটুট রাখা না রাখার এখতিয়ার) তার হাতেই। সে অর্ধেক মোহর মাফ করে দেয়। অর্থাৎ, আদায়কৃত মোহর থেকে অর্ধেক মোহর ফিরিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে নিজের এ অধিকার (অর্ধেক মোহর) মাফ করে দিয়ে সম্পূর্ণ মোহর স্ত্রীকে দিয়ে দেয়। এরপর পারস্পরিক সহানুভূতি ও অনুগ্রহের কথা বিস্মৃত না হওয়ার তাকীদ করে মোহরের অধিকারেও এই সহানুভূতি ও অনুগ্রহ প্রদর্শনের উপর অনুপ্রাণিত করা হয়েছে।

দ্রষ্টব্যঃ কেউ কেউ {بِيَدِهِ عُقْدَةُ النِّكَاحِ} (যার হাতে বিবাহ-বন্ধন) থেকে মহিলার অভিভাবককে বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ, মহিলা নিজে মাফ করে দিক অথবা তার অভিভাবক মাফ করে দিক। কিন্তু এ অর্থ সঠিক নয়। কারণ, প্রথমতঃ অভিভাবকের হাতে বিবাহের বন্ধন নেই। দ্বিতীয়তঃ মোহর মহিলার নিজসব অধিকার ও তার ব্যক্তিগত সম্পদ, তাই এটা মাফ করার অধিকার অভিভাবকের নেই। সুতরাং পূর্বের অর্থই সঠিক। (ফাতহুল ক্বাদীর)

জরুরী বিশ্লেষণঃ

তালাকপ্রাপ্তা মহিলারা চার ধরনের।
(ক) যার মোহর নির্ধারিত, স্বামী তার সাথে সহবাসও করেছে, তাকে তার মোহরের সম্পূর্ণ অধিকার দেওয়া হবে। যেমন, ২২৯নং আয়াতে এর বর্ণনা রয়েছে।
(খ) মোহরও নির্ধারিত নেই এবং তার সাথে সহবাসও করা হয়নি, তাকে কেবল কিছু খরচপত্র দেওয়া হবে।
(গ) মোহর নির্ধারিত, কিন্তু সহবাস হয়নি, তাকে অর্ধেক মোহর দেওয়া জরুরী। (উভয়ের ব্যাখ্যা ২৩৬-২৩৭ নং আয়াতে বিদ্যমান।)
(ঘ) মোহর নির্ধারিত নেই, কিন্তু সহবাস করা হয়েছে, তার জন্য রয়েছে মোহরে মিসল। অর্থাৎ, এই মহিলার সমাজে যে পরিমাণ মোহরের প্রচলন আছে অথবা তার মত মহিলাদের সাধারণতঃ যে পরিমাণ মোহর দেওয়া হয়, তাকেও সে পরিমাণ মোহর দিতে হবে। (নাইনুল আওত্বার ও আ'উনুল মা'বুদ)

আয়াতে কারীমাহ্

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ وَأَحْصُوا الْعِدَّةَ ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ رَبَّكُمْ ۖ لَا تُخْرِجُوهُنَّ مِن بُيُوتِهِنَّ وَلَا يَخْرُجْنَ إِلَّا أَن يَأْتِينَ بِفَاحِشَةٍ مُّبَيِّنَةٍ ۚ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ ۚ وَمَن يَتَعَدَّ حُدُودُ اللَّهِ فَقَدْ ظَلَمَ نَفْسَهُ ۚ لَا تَدْرِي لَعَلَّ اللَّهَ يُحْدِثُ بَعْدَ ذَٰلِكَ أَمْرًا

[الطلاق: 1]

সরল অনুবাদ

হে নবী! (তোমার উম্মতকে বল,) তোমরা যখন তোমাদের স্ত্রীদেরকে তালাক দিতে ইচ্ছা কর[১] তখন তাদেরকে তালাক দিয়ো ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রেখে,[২] ইদ্দতের হিসাব রেখো[৩] এবং তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করো; তোমরা তাদেরকে তাদের বাসগৃহ হতে বহিষ্কার করো না[৪] এবং তারা নিজেও যেন বের না হয়; [৫] যদি না তারা লিপ্ত হয় স্পষ্ট অশ্লীলতায়।[৬] এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা। আর যে আল্লাহর সীমা লংঘন করে, সে নিজের উপরই অত্যাচার করে।[৭] তুমি জান না, হয়তো আল্লাহ এর পর কোন উপায় করে দেবেন।[৮]
সূরার নাম — আত ত্বালাক | অবর্তীণ — মদীনায় | আয়াত নম্বর — ০১

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

  • [১] নবী করীম (সাঃ)-কে সম্বোধন করা হয়েছে তাঁর সম্মান ও মর্যাদার কারণে। নচেৎ এই নির্দেশ উম্মতকে দেওয়া হচ্ছে। অথবা সম্বোধন তাঁকেই করা হয়েছে এবং বহুবচন ক্রিয়া তাঁর সম্মানার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। আর উম্মতের জন্য তো তাঁর আদর্শই যথেষ্ট। طَلَّقْتُمْ এর অর্থ হল, যখন তালাক দেওয়ার পাকা ইচ্ছা করে নিবে। (ইদ্দত মানে গণনা। অর্থাৎ, তালাকের নির্ধারিত দিন গণনা করা।)
  • [২] এতে তালাক দেওয়ার তরীকা ও তার সময় উল্লেখ করা হয়েছে। لِعِدَّتِهِنَّ তে 'লাম' অক্ষরটি 'তাওক্বীত' (সময় নির্ণয়) এর জন্য ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ, لأَوَّلِ অথবা لاسْتِقْبَالِ عِدَّتِهِنَّ (ইদ্দতের শুরুতে) তালাক দাও। অর্থাৎ, যখন মহিলা ঋতু (মাসিক) থেকে পবিত্র হয়ে যাবে, তখন তার সাথে আর সহবাস না করেই তালাক দাও। পবিত্র অবস্থা হল তার ইদ্দতের শুরু। এর অর্থ হল, মাসিক অবস্থায় অথবা পবিত্র অবস্থায় সহবাস করার পর তালাক দেওয়া ভুল তরীকা। এটাকেই ফিকাহ শাস্ত্রের পন্ডিতগণ 'বিদয়ী তালাক' এবং পূর্বের (সঠিক) তরীকাকে 'সুন্নী তালাক' বলে আখ্যায়িত করেছেন। এর সমর্থন হাদীসেও পাওয়া যায়; ইবনে উমার (রাঃ) মাসিক অবস্থায় তাঁর স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেন। এতে রসূল (সাঃ) রাগান্বিত হন এবং তাঁকে তালাক প্রত্যাহার করে নিতে বলার সাথে সাথে পবিত্র অবস্থায় তালাক দেওয়ার নির্দেশ দেন। আর এর সমর্থনে তিনি এই আয়াতকেই দলীল হিসাবে গ্রহণ করেন। (বুখারীঃ তালাক অধ্যায়) তবে মাসিক অবস্থায় দেওয়া তালাকও বিদআত হওয়া সত্ত্বেও তা তালাক বলে গণ্য হবে। মুহাদ্দিসগণের এবং অধিকাংশ আলেমগণের এটাই উক্তি। অবশ্য ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রঃ) এবং ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম (রঃ) বিদয়ী তালাককে তালাক গণ্য করেননি। (বিস্তারিত জানার জন্য দ্রষ্টব্যঃ নাইলুল আওতার, তালাক অধ্যায়, পরিচ্ছেদ, মাসিক ও পবিত্র অবস্থায় তালাক দেওয়া নিষেধ। এ ছাড়া অন্যান্য হাদীসের ব্যাখ্যাগ্রন্থও দেখুন।)
  • [৩] অর্থাৎ, এর প্রথম ও শেষটার খেয়াল রাখ, যাতে স্ত্রী এর পর দ্বিতীয় বিবাহ করতে পারে। অথবা তোমরাই যদি রুজু' (প্রত্যাহার) করতে (স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে) চাও, তবে (প্রথম এবং দ্বিতীয় তালাকের পর) ইদ্দতের ভিতরেই যেন রুজু' করতে পার
  • [৪] অর্থাৎ, তালাক দেওয়ার সাথে সাথেই স্ত্রীকে নিজ ঘর থেকে বের করে দিও না, বরং ইদ্দত পর্যন্ত তাকে তোমাদেরই ঘরে থাকতে দাও। ইদ্দত শেষ হওয়া পর্যন্ত তার বাসস্থান ও ভরণ-পোষণের দায়িত্ব তোমাদের উপরেই থাকবে।
  • [৫] অর্থাৎ, ইদ্দতের দিনগুলোতে স্ত্রীও যেন ঘর হতে বের হওয়া থেকে বিরত থাকে। তবে যদি একান্ত কোন জরুরী কাজে বের হতে হয় তবে সে কথা ভিন্ন।
  • [৬] অর্থাৎ, ব্যভিচার, মুখ-খিস্তি, গালাগালি, ঝগড়া বা চরম অভদ্রতা প্রদর্শন করলে, যা থেকে ঘরের লোকদের কষ্ট হয়। এই অবস্থায় তাকে (বাড়ি থেকে) বের করা জায়েয হবে।
  • [৭] অর্থাৎ, উল্লিখিত সমূহ বিধান হল আল্লাহর কর্তৃক নির্ধারিত সীমারেখা। যা অতিক্রম করা নিজের উপর যুলুম করার নামান্তর। কেননা, এই সীমালঙ্ঘনের যাবতীয় ক্ষতি ভোগ করতে হবে সীমালঙ্ঘনকারী নিজেকেই।
  • [৮] অর্থাৎ, পুরুষের অন্তরে তালাকপ্রাপ্তা মহিলার প্রতি চাহিদা ও আকর্ষণ সৃষ্টি করে দেবেন ফলে সে রুজু করার প্রতি উদ্বুদ্ধ হয়ে যাবে। কেননা, প্রথম ও দ্বিতীয় তালাকের পর স্বামী ইদ্দতের ভিতরেই ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকার রাখে। এই জন্য কোন কোন মুফাসসিরদের মত হল, এই আয়াতে আল্লাহ কেবল এক তালাক দেওয়ার আদেশ করেছেন এবং এক সাথে তিন তালাক দিতে নিষেধ করেছেন। কেননা, সে যেদি একই সময়ে তিন তালাক দিয়ে দেয় (আর শরীয়ত যদি তার এই তালাককে বৈধ গণ্য করে কার্যকরী করে দেয়), তবে এ কথা বলার কি কোন অর্থ হবে যে, 'হয়তো আল্লাহ কোন নতুন উপায় বের করে দেবেন।' (ফাতহুল ক্বাদীর) এটাকেই দলীল বানিয়ে ইমাম আহমাদ ও অন্যান্য উলামাগণ বলেছেন যে, বাসস্থান ও ভরণ-পোষণের উপর যে তাকীদ করা হয়েছে, তা কেবল সেই মহিলাদের জন্য, যাদেরকে তাদের স্বামীরা প্রথম অথবা দ্বিতীয় তালাক দিয়েছে। কেননা, এতে স্বামীর ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকার অবশিষ্ট থাকে। আর যে মহিলাকে ইতিপূর্বে বিভিন্ন সময়ে দুই তালাক দেওয়া হয়ে গেছে, তৃতীয় তালাক তার জন্য তালাকে 'বাত্তাহ' অথবা 'বায়েনাহ' (কুবরা; যার পর আর স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকার থাকে না) গণ্য হবে। তার বাসস্থান এবং ভরণ-পোষণ স্বামীর দায়িত্বে থাকে না। তাকে সত্বর স্বামীর ঘর থেকে অন্যত্র স্থানান্তরিত করা হবে। কেননা, স্বামী আর তাকে ফিরিয়ে নিয়ে তার সাথে সংসার করতে পারে না। ﴿حَتَّى تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ﴾ "যে পর্যন্ত না স্ত্রী কোন অন্য পুরুষকে বিবাহ করেছে।" (অতঃপর সে স্বামী তালাক দিয়েছে বা মারা গেছে তারপর তাকে পুনর্বিবাহ করেছে।) এই জন্য এই স্ত্রীর আর তার স্বামীর কাছে থাকার এবং তার কাছ থেকে খোরপোশ আদায় করার অধিকার থাকে না। এর সমর্থন ফাতিমা বিনতে ক্বাইস (রাঃ) র ঘটনা থেকেও হয় যে, যখন তাঁর স্বামী তাঁকে তৃতীয় তালাকও দিয়ে দিলেন এবং তাঁকে স্বামীর ঘর থেকে বের হওয়ার জন্য বলা হলে তিনি বের হতে চাইলেন না। পরিশেষে বিষয়টা রসূল (সাঃ)-এর কাছে পৌঁছলে তিনি ফায়সালা করলেন যে, তাঁর বাসস্থান ও ভরণ-পোষণ নেই। তাকে সত্বর কোন অন্যত্র স্থানান্তরিত হওয়া উচিত। এমন কি কোন কোন বর্ণনায় পরিষ্কারভাবে এসেছে যে, (إِنَّمَا النَّفَقَةُ وَالسُّكْنَى لِلْمَرْأَةِ عَلَى زَوْجِهَا مَا كَانَتْ لَهُ عَلَيْهَا رَجْعَةٌ) অর্থাৎ, ভরণ-পোষণ ও বাসস্থান কেবল সেই মহিলার জন্য আছে, যাকে ফিরিয়ে নেওয়া তার স্বামীর অধিকারে আছে। (আহমাদ, নাসাঈ) অবশ্য কোন কোন বর্ণনায় গর্ভবতী মহিলার জন্যেও বাসস্থান ও খোরপোশের কথার উল্লেখ রয়েছে। (বিস্তারিত জানার জন্য নাইলুল আওতার দ্রষ্টব্যঃ) কেউ কেউ এই বর্ণনাগুলোকে কুরআনের উল্লিখিত ﴿لاَ تُخْرِجُوْهُنَّ مِنْ بُيُوْتِهِنَّ﴾ (তোমরা তাদেরকে তাদের ঘর হতে বের করে দিও না) এই নির্দেশের পরিপন্থী মনে করে তা প্রত্যাখ্যান করেন, যা সঠিক নয়। কেননা, কুরআনের আয়াত তার পূর্বাপর প্রাসঙ্গিক আলোচনার ভিত্তিতে প্রতীয়মান হয় যে, উক্ত নির্দেশ রজয়ী তালাক (যে তালাকের পর ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকার থাকে) প্রাপ্তা মহিলার ক্ষেত্রে দেওয়া হয়েছে। আর যদি এটাকে ব্যাপক ধরে নেওয়াও যায়, তবে হাদীসের এই বর্ণনাগুলো তার নির্দিষ্টকারী হবে। অর্থাৎ, কুরআনের সাধারণ নির্দেশকে হাদীসের এই বর্ণনাগুলো রজয়ী তালাকপ্রাপ্তা মহিলার জন্য নির্দিষ্ট করে দিল এবং 'বায়েনাহ' তালাকপ্রাপ্তা মহিলাকে উক্ত সাধারণ হুকুমের আওতা থেকে বের করে নিল।