প্রশ্ন: আসসালামু আলাইকুম। আমার স্বামী ০৫.০৫.২০২৫ তারিখে আমাকে লিখিতভাবে স্পষ্টভাবে "(১) এক তালাক" প্রদান করেন। এরপর ১৫ ও ১৯ মে আমাদের মাঝে শারীরিক সম্পর্ক (সহবাস) হয়। পরবর্তীতে ১৬.০৯.২০২৫ তারিখে একটি আপোষনামা স্বাক্ষরিত হয়, যেখানে ০৫ মে-র ঘটনাকে উল্লেখ করতে গিয়ে ভুলবশত "তালাক-ই-বাইন (তিন তালাক)" লেখা হয়েছে, যা একটি টাইপিং মিস্টেক। মূল দলিলে ১ তালাকই লেখা আছে। এই অবস্থায় হানাফী ফিকহ অনুযায়ী: ১৫ ও ১৯ মে-র সহবাসের কারণে কি 'রুজু' সংঘটিত হয়েছে? পরবর্তী আপোষনামায় ভুলভাবে 'তিন তালাক' লেখা কি নতুন কোনো তালাক সৃষ্টি করে? বর্তমানে আমাদের বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল আছে কি না এবং বাংলাদেশী আইন (MFLO 1961) অনুযায়ী এর সমাধান কী?
ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
সম্মানিতা বোন তানজিনা আফরিন, আপনার ঘটনাটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং আইনি ও শরয়ী দলিলসহ উপস্থাপন করার জন্য ধন্যবাদ। দাম্পত্য জীবনের এই স্পর্শকাতর বিষয়টিতে আপনার উদ্বেগটি সম্পূর্ণ যৌক্তিক। আলহামদুলিল্লাহ, কুরআন, সুন্নাহ, হানাফী ফিকহ এবং বাংলাদেশের প্রচলিত মুসলিম পারিবারিক আইনের (Muslim Family Laws Ordinance, 1961) আলোকে আপনার বৈবাহিক সম্পর্কটি সম্পূর্ণরূপে বহাল ও সুরক্ষিত আছে। নিচে আপনার প্রতিটি প্রশ্নের দালিলিক ও বিস্তারিত ফয়সালা ধাপে ধাপে প্রদান করা হলো:
০৫.০৫.২০২৫ তারিখে আপনার স্বামী লিখিতভাবে আপনাকে যে '১ (এক) তালাক' প্রদান করেছেন, ইসলামী ফিকহের পরিভাষায় এটি 'তালাক-ই-রাজঈ' (الطلاق الرجعي - প্রত্যাহারযোগ্য তালাক)। রাজঈ তালাকের হুকুম হলো, ইদ্দত (৩ মাসিক) চলাকালীন স্বামী চাইলে নতুন কোনো আকদ (বিবাহ) বা মোহরানা ছাড়াই স্ত্রীকে পুনরায় স্ত্রীর মর্যাদায় ফিরিয়ে নিতে পারে।
হানাফী মাযহাবের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, 'রুজু' বা ফিরিয়ে নেওয়া দুইভাবে হতে পারে: ক. মৌখিকভাবে (قولاً) এবং খ. কাজের মাধ্যমে (فعلاً)। ইদ্দত চলাকালীন স্বামী যদি স্ত্রীর সাথে সহবাস (Intercourse), চুম্বন বা কামভাবের সাথে স্পর্শ করে, তবে এর দ্বারাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ১০০% রুজু সম্পন্ন হয়ে যায়। এর জন্য মুখে "আমি ফিরিয়ে নিলাম" বলা বা আলাদা করে রুজুর নিয়ত করাও আবশ্যক নয়।
বিখ্যাত হানাফী ফিকহ গ্রন্থ 'আল-হেদায়া'-তে উল্লেখ রয়েছে: "রুজু হলো স্বামীর এ কথা বলা যে 'আমি তোমাকে ফিরিয়ে নিলাম'... অথবা যদি স্বামী ইদ্দতের মধ্যে স্ত্রীর সাথে সহবাস করে বা কামভাবের সাথে স্পর্শ করে... তবে সে রুজুকারী হিসেবে গণ্য হয়ে যাবে।"
— (আল-হেদায়া: ২/৪০০; ফতোয়ায়ে শামী: ৩/৩৯৭)যেহেতু তালাকের মাত্র ১০ ও ১৪ দিন পর (১৫ ও ১৯ মে) আপনাদের মাঝে শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে (যা আপনার স্বামীও স্বীকার করেছেন), তাই শরীয়তের অকাট্য বিধান অনুযায়ী আপনাদের রুজু সম্পন্ন হয়ে গেছে এবং তালাকটি বাতিল হয়ে বৈবাহিক সম্পর্ক পুনর্জীবিত হয়েছে।
১৬.০৯.২০২৫ তারিখের আপোষনামায় আপনার স্বামী নতুন করে কোনো তালাক দেননি, বরং তিনি অতীতের একটি ঘটনার (০৫ মে) Reference বা বিবরণ (إخبار) দিচ্ছিলেন। ফিকহুল ইসলামীর মূলনীতি হলো, অতীত ঘটনার বিবরণে যদি বাস্তবতার সাথে গরমিল বা ভুল (كذب أو خطأ) থাকে, তবে বাস্তবে যা ঘটেছিল সেটিই ধর্তব্য হবে।
যেহেতু ০৫ মের মূল দলিলে স্পষ্টভাবে ১ তালাক লেখা আছে এবং আপনার স্বামীও স্বীকার করছেন যে এটি টাইপিং মিস্টেক (سبق القلم - কলমের ভুল), তাই শরীয়তের দৃষ্টিতে এই ভুল লেখাটি নতুন কোনো তালাক তৈরি করবে না এবং অতীতকে পরিবর্তন করে তিন তালাক বানাতে পারবে না।
"চুক্তির ক্ষেত্রে মূল উদ্দেশ্য ও অর্থ ধর্তব্য হয়, কেবল শব্দ বা বাক্য গঠন নয়।" (মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যাহ, ধারা: ৩)
সুতরাং, এই টাইপিং মিস্টেকের শরয়ী কোনো প্রভাব আপনাদের বর্তমান বৈবাহিক সম্পর্কের ওপর পড়বে না।
Muslim Family Laws Ordinance, 1961 এর ধারা ৭(১) অনুযায়ী, চেয়ারম্যানের কাছে নোটিশ পৌঁছানোর তারিখ থেকে ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হয়। কিন্তু ধারা ৭(৩) এ বলা হয়েছে:
"...unless revoked earlier, expressly or otherwise." (যদি না তার আগেই তা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রত্যাহার করা হয়)।
আইনের দৃষ্টিতে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ইদ্দতের ভেতরে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন বা একত্রে বসবাস করাটা হলো 'otherwise revocation' (পরোক্ষ প্রত্যাহার) এর সবচেয়ে শক্তিশালী আইনি প্রমাণ। যেহেতু ১৫ ও ১৯ মে আপনাদের মাঝে সহবাস হয়েছে (যা ৯০ দিনের অনেক আগেই), তাই শরীয়তের পাশাপাশি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ীও আপনাদের এই তালাকটি Revoked (প্রত্যাহারকৃত) বা বাতিল হয়ে গেছে।
আল্লাহ তাআলা আপনাদের মধ্যকার ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটান এবং দাম্পত্য জীবনে রহমত ও বরকত দান করুন। (আমীন) আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।
WhatsApp us