বিষয়: বালেগ পুরুষ খতনা না করলে তার নামাজ, রোজা অন্যান্য আমলের হুকুম সম্পর্কে।
প্রশ্ন: মুহতারাম মুফতি সাহেব, আমার ছেলে বালেগ হয়ে গেছে, কিন্তু এখনো তার সুন্নতে খাতনা করানো হয় নাই। এখন হুজুরের নিকট আমার জানার বিষয় হলো, বালেগ পুরুষ খতনা না করলে তার নামাজ, রোজা ও অন্যান্য আমলের হুকুম কি? দলিলসহ জানালে কৃতজ্ঞ থাকব।
ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
সম্মানিত ভাই আরিফ জামিল, ইসলামের শিআর ও সুন্নাতের প্রতি আপনার সচেতনতার জন্য শুকরিয়া। বালেগ পুরুষের খতনা (Circumcision) না থাকা সংক্রান্ত মাসআলাটি ফিকহে ইসলামীর অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কুরআন, সুন্নাহ, সালাফে সালেহীন এবং হানাফী মাযহাবের নির্ভরযোগ্য ফতোয়ার কিতাবের আলোকে আপনার প্রশ্নের বিস্তারিত সমাধান নিচে পেশ করা হলো:
ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে খতনা করানো 'সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ' (সুন্নাতে হুদা) এবং ইসলামের একটি অন্যতম প্রকাশ্য প্রতীক বা নিদর্শনের (শাআইরে ইসলাম) অন্তর্ভুক্ত। এটি হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর আমল এবং মানব স্বভাবের (ফিতরাত) অংশ।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) এরশাদ করেন: "স্বভাবজাত সুন্নত হলো পাঁচটি: খতনা করা, নাভির নিচের লোম পরিষ্কার করা, গোঁফ ছাঁটা, নখ কাটা এবং বগলের লোম উপড়ে ফেলা।"
— (সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৫৮৮৯; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৫৭)হযরত ইবরাহীম (আ.) আশি বছর বয়সে নিজের খতনা সম্পন্ন করেছিলেন। (সহীহ বুখারী: ৬২৯৮)
খতনা না করলেও তার নামাজ, রোজা, হজ, কোরবানি এবং যাবতীয় নেক আমল শরীয়তের দৃষ্টিতে সহীহ ও গ্রহণযোগ্য হবে। খতনা করা নামাজ বা রোজা শুদ্ধ হওয়ার কোনো শর্ত (Shart) বা রুকন (Rukn) নয়। খতনা না থাকার কারণে কোনো মুসলমানের আমল বাতিল হয়ে যায় না।
সালাফে সালেহীন ও ফুকাহায়ে কেরামের সিদ্ধান্ত:
তাবেয়ী ইমাম হাসান বসরী (রহ.)-কে এমন ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে খতনা ব্যতীত ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং খতনা ছাড়াই ইবাদত করে। তিনি বলেন:
"রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم)-এর যুগে রোমান, পারসিয়ান ও হাবশী বহু লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন; তাঁদের কারো খতনা হয়েছে কি না—তা পরীক্ষা করে দেখা হতো না এবং তাদের নামাজ-ইবাদত সম্পূর্ণ শুদ্ধ বলেই গণ্য হতো।"
— (আল-মুগনী, ইবনে কুদামা: ১/১১৬; ফাতহুল বারী: ১০/২৮১)হানাফী মাযহাবের বিখ্যাত ফিকহ গ্রন্থ 'ফতোয়ায়ে শামী' (রদ্দুল মুহতার) ও 'ফতোয়ায়ে আলমগীরী'-তে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে:
"খতনা হলো সুন্নাত এবং ইসলামের প্রতীক। যদি কোনো ব্যক্তি প্রাপ্তবয়স্ক বা বালেগ হয়ে যায়, তবে তার জন্য খতনা করানোই বাঞ্ছনীয়; যদি না সে তার জীবনের ক্ষতি বা মারাত্মক অসুস্থতার ভয় করে।"
— (ফতোয়ায়ে শামী বা রদ্দুল মুহতার: ৬/৭৫১; ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া বা আলমগীরী: ৫/৩৫৭)পবিত্রতা (তাহারাত) সংক্রান্ত অত্যন্ত জরুরি সতর্কতা:
খতনা না থাকলে পুরুষাঙ্গের অতিরিক্ত চামড়ার নিচে পেশাবের ফোঁটা জমে থাকার প্রবল ঝুঁকি থাকে। নামাজের মূল শর্ত হলো শরীর ও কাপড়ের পবিত্রতা। তাই খতনা না করা ব্যক্তি যদি পেশাব করার পর পানি দ্বারা ওই চামড়ার ভেতরটা উত্তমরূপে পরিষ্কার না করে, তবে নাপাকি লেগে থাকার কারণে তার ওজু ও নামাজ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এই কারণেই খতনা করানো অত্যন্ত জরুরি, যাতে সহজেই নাপাকি থেকে পবিত্র থাকা যায়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সুন্নাতের ওপর অবিচল থাকার তৌফিক দান করুন। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।
WhatsApp us