প্রশ্ন: আসসালামু আলাইকুম। এক সকালে আমার স্বামীর সাথে আমার ঝগড়ার মতো কিছু একটা শুরু হয় এবং আমার স্বামী আমাকে একটা থাপ্পড় দেয়। আমি ব্যথা পেলে বলি— "আল্লাহর গজব পড়বে যদি আমাকে অকারণে মেরে থাকো।" তখন সে আমাকে রাগের মাথায় বলে— "এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক, যা যা তোকে ছেড়ে দিলাম, তুই চলে যা।" সেখানে শুধু আমার শাশুড়ি উপস্থিত ছিল। তারপর ৪/৬ মিনিট পর সে অনেক কান্নাকাটি করেছে, বলেছে "আমার ভুল হয়েছে" এবং আমরা দুজন একসাথেই ছিলাম। এছাড়া আরেক দিনও আমার স্বামী আমাকে এক তালাক বলেছিল। এখন সে অনুতপ্ত, কিন্তু আমার শ্বশুর বিষয়টা পুরো এলাকার মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছে। আমাদের এখানের হুজুরেরা বলেন তালাক হয়ে গেছে, কিন্তু অনেক জায়গায় শুনি তালাক হয়নি। এখন শরীয়তের সঠিক ফয়সালা কী?
ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
সম্মানিতা বোন মরিয়ম, আপনার পারিবারিক জীবনের এই আকস্মিক দুর্ঘটনাটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। ঝগড়ার মুহূর্তে রাগের বশবর্তী হয়ে স্বামীরা যে চরম অবিবেচকের মতো কাজ করে এবং পরক্ষণেই অনুতপ্ত হয়ে কান্নাকাটি করে—এটি বর্তমান সমাজের একটি নিয়মিত ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু ইসলামী শরীয়ত মানুষের আবেগ বা কান্নাকাটির ওপর চলে না; বরং মহান আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত অকাট্য সীমারেখার (হুদুদুল্লাহ) ওপর প্রতিষ্ঠিত।
পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীগণের ইজমা, চার মাযহাবের ইমামগণ (আইম্মায়ে মুজতাহিদীন) এবং বিশেষ করে হানাফী মাযহাবের চূড়ান্ত ফতোয়া অনুযায়ী— আপনার এলাকার আলেমগণ (হুজুরেরা) যে ফতোয়া দিয়েছেন, সেটিই ১০০% সঠিক ও কুরআন-সুন্নাহসম্মত। আপনার স্বামীর উচ্চারিত শব্দের মাধ্যমে আপনাদের ওপর তিনটি তালাকই (তালাকে মুগাল্লাযা বা চূড়ান্ত বিচ্ছেদ) পতিত হয়ে গেছে এবং আপনাদের বৈবাহিক সম্পর্ক সম্পূর্ণরূপে ছিন্ন হয়ে গেছে। নিচে আপনার ঘটনার প্রতিটি দিকের দালিলিক ও বিস্তারিত বিশ্লেষণ পেশ করা হলো:
আপনার স্বামী স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন: “এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক, যা যা তোকে ছেড়ে দিলাম, তুই চলে যা।” শুধু তাই নয়, আপনি উল্লেখ করেছেন যে তিনি অন্য আরেক দিনও আপনাকে এক তালাক দিয়েছিলেন।
ইসলামী শরীয়তে একসাথে তিন তালাক উচ্চারণ করা মারাত্মক গুনাহের কাজ (তালাকে বিদঈ)। কিন্তু কেউ যদি এই গুনাহের কাজটি করে ফেলে এবং একসাথে তিন তালাক উচ্চারণ করে, তবে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন, সালাফে সালেহীন এবং ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)—চার মাযহাবের সকল ইমামের ঐকমত্যে (ইজমা) তিনটি তালাকই পতিত হয়ে যায় এবং স্ত্রী স্বামীর জন্য সম্পূর্ণ হারাম হয়ে যায়।
পবিত্র কুরআন ও হাদিসের অকাট্য দলীল:
মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন:
অর্থ: "(ফিরিয়ে নেওয়া যায় এমন) তালাক দুইবার। অতঃপর হয়তো বিধিমতো রাখবে, নতুবা সদয়ভাবে মুক্ত করে দেবে... অতঃপর স্বামী যদি তাকে (তৃতীয়বার) তালাক দেয়, তবে সে নারী তার জন্য আর হালাল থাকবে না, যতক্ষণ না সে অন্য একজন স্বামীকে বিবাহ করে।"
— (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২২৯-২৩০)সহীহ বুখারী এবং সুনানে নাসায়ীর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم)-এর যুগে এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে একসাথে তিন তালাক দিলে নবীজী (সা.) প্রচণ্ড রাগান্বিত হয়ে দাঁড়িয়ে বলেন: «أَيُلْعَبُ بِكِتَابِ اللَّهِ وَأَنَا بَيْنَ أَظْهُرِكُمْ» (আমি তোমাদের মাঝে জীবিত থাকতেই আল্লাহর কিতাব নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে?)—অতঃপর সাহাবায়ে কেরামের যুগে হযরত উমর ফারুক (রা.), হযরত উসমান (রা.), হযরত আলী (রা.), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) সহ সকল সাহাবী এক মজলিসে প্রদত্ত তিন তালাককে ‘তিন তালাক’ হিসেবেই কার্যকর করার ওপর ইজমা (ঐকমত্য) করেছেন।
হানাফী মাযহাবের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ ‘আল-হেদায়া’ এবং ‘ফতোয়ায়ে আলমগীরী’-তে সুস্পষ্ট বলা হয়েছে:
অনুবাদ: "যদি কেউ তার স্ত্রীকে একই পবিত্রতায় (একই মজলিসে) এক বাক্যে অথবা পৃথক বাক্যে (যেমন: এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক বলে) তিন তালাক প্রদান করে, তবে তিনটি তালাকই পতিত হয়ে যাবে, এবং এভাবে তালাক দেওয়ার কারণে সে গুনাহগার হবে।"
— (আল-হেদায়া: ২/৩৫৫, কিতাবুত তালাক; বাদায়েউস সানায়ে: ৩/৯৪; ফতোয়ায়ে আলমগীরী: ১/৩৪৯)অনেকে মনে করেন, রাগের মাথায় তালাক দিলে তালাক হয় না—এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। সাধারণ মানুষ তো খুশির মেজাজে স্ত্রীকে তালাক দেয় না, বরং ঝগড়া ও রাগের মাথায়ই তালাক দেয়।
হানাফী ফিকহের অকাট্য মূলনীতি অনুযায়ী, শুধুমাত্র সেই রাগের তালাকই অকার্যকর হয়, যখন মানুষ রাগের তীব্রতায় ‘মাদহুশ’ (المدهوش) বা পূর্ণ পাগল ও জ্ঞানশূন্য হয়ে যায়—অর্থাৎ সে কাকে কী বলছে তার বিন্দুমাত্র হুঁশ তার থাকে না। কিন্তু আপনার স্বামীর আচরণ লক্ষ্য করুন:
যে ব্যক্তি কথা বলার মাত্র ৪ মিনিট পরই স্পষ্টভাবে মনে করতে পারে যে সে কী বলেছে এবং নিজের ভুলের জন্য কান্নাকাটি করে—সে কখনোই ‘মাদহুশ’ বা পাগল ছিল না; বরং সে সজ্ঞানেই তীব্র রাগের মাথায় তালাক দিয়েছে। আর শরীয়তে তিন তালাক মুখ থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর হাজারবার কান্নাকাটি করলেও বা "আমার ভুল হয়েছে" বললেও পতিত হওয়া তালাক কখনোই ফিরে আসে না।
অনুবাদ: "প্রত্যেক সুস্থমস্তিষ্ক ও প্রাপ্তবয়স্ক স্বামীর তালাক কার্যকর হয়... যদিও সে রাগান্বিত অবস্থায় থাকে, যতক্ষণ না তার রাগ এমন চরম মস্তিষ্কবিকৃতির (দাহাশ) পর্যায়ে পৌঁছায় যেখানে সে নিজেই জানে না যে সে কী বলছে।"
— (রদ্দুল মুহতার বা ফতোয়ায়ে শামী: ৩/২৪৪; ফতোয়ায়ে আলমগীরী: ১/৩৫৩)আপনি উল্লেখ করেছেন যে, তালাক দেওয়ার সময় সেখানে শুধু আপনার শাশুড়ি ছিলেন। জেনে রাখা জরুরি যে, ইসলামী শরীয়তে বিবাহ (নিকাহ) সংঘটিত হওয়ার জন্য দুজন সাক্ষী থাকা শর্ত, কিন্তু তালাক পতিত হওয়ার জন্য কোনো সাক্ষী থাকার প্রয়োজন নেই। স্বামী যদি বদ্ধ ঘরে একা একা কিংবা ফোনে অথবা শুধুমাত্র স্ত্রীর বা শাশুড়ির সামনেও তালাক উচ্চারণ করে, তবুও সাথে সাথে তালাক কার্যকর হয়ে যায়।
অনুবাদ: "সকল ইমামের ঐকমত্যে (ইজমা অনুযায়ী) তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য কোনো সাক্ষী থাকা শর্ত নয়।"
— (আল-বাহরুর রায়েক: ৩/২৫৫; ফতোয়ায়ে শামী: ৩/২৩০)আপনি বলেছেন, "আমাদের এখানের হুজুরেরা বলেন তালাক হয়ে গেছে, কিন্তু অনেক জায়গায় শুনি তালাক হয়নি।"
সম্মানিতা বোন, বর্তমান যুগে ইন্টারনেটে বা সমাজে কিছু মানুষ (যারা চার মাযহাবের কোনো মাযহাবই মানে না) সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দিয়ে বলে থাকে যে, "রাগের মাথায় তালাক দিলে তালাক হয় না" অথবা "একসাথে তিন তালাক দিলে এক তালাক হয়"।
প্রথমত: উম্মতে মুহাম্মাদীর ১৪০০ বছরের ইতিহাসে খুলাফায়ে রাশেদীন, সাহাবায়ে কেরাম এবং চার মাযহাবের ইমামগণের ইজমার বিরুদ্ধে গিয়ে এমন বিচ্ছিন্ন (শয) মত গ্রহণ করা সম্পূর্ণ হারাম। ফিকহের অকাট্য মূলনীতি হলো—নিজের সুবিধার জন্য বা সংসার টিকিয়ে রাখার লোভে কুরআন-সুন্নাহ ও ইজমাবিরোধী ফতোয়া গ্রহণ করলে আল্লাহর কাছে তা গ্রহণযোগ্য হবে না এবং সেই সংসার আজীবন ‘যিনা’ (ব্যভিচার) হিসেবে গণ্য হবে।
দ্বিতীয়ত: আপনার ক্ষেত্রে তো সেই বিতর্কেরও কোনো অবকাশ নেই! কারণ আপনার স্বামী ইতিপূর্বে আরেক দিন আপনাকে ‘এক তালাক’ দিয়েছিলেন, আর এবারের ঘটনায় প্রথমে বলেছেন ‘এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক’ এবং তার সাথে আবার বলেছেন ‘যা যা তোকে ছেড়ে দিলাম, তুই চলে যা’! সুতরাং যেদিক থেকেই হিসাব করা হোক না কেন, আপনার ওপর ৩টি তালাকই চূড়ান্তভাবে পূর্ণ হয়ে গেছে।
যত কষ্টই হোক না কেন, আখেরাতের চিরস্থায়ী আজাব ও ব্যভিচারের গুনাহ থেকে বাঁচার জন্য আপনাদের এখন নিচের নির্দেশগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করা ফরজ:
প্রাতিষ্ঠানিক দায়মুক্তি (Disclaimer): প্রশ্নকারীর প্রদত্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কুরআন, সুন্নাহ ও হানাফী ফিকহের আলোকে এই শরয়ী সমাধান প্রদান করা হয়েছে। এটি একান্তই ধর্মীয় দিকনির্দেশনা ও পরকালীন আমলের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত; কোনো রাষ্ট্রীয় আদালত বা আইনি বিরোধের দলিল হিসেবে ব্যবহারযোগ্য নয়।
আল্লাহ তাআলা আপনাদেরকে এই কঠিন পরীক্ষায় সবর করার এবং শরীয়তের বিধানের ওপর অবিচল থাকার তৌফিক দান করুন। (আমীন) আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।
WhatsApp us