প্রশ্ন: আসসালামু আলাইকুম মুফতি সাহেব, আমি ঈশ্বরদী, পাবনা থেকে বলছি। আমার বিবাহ ও তালাক নিয়ে ৩টি প্রশ্ন ছিল। হানাফি মাযহাব অনুযায়ী কুরআন-হাদিসের রেফারেন্সসহ ফতোয়া দিয়ে বাধিত করবেন।
ঘটনা ১ (প্রথম বিবাহ): দুপুর ২:১৫ মিনিটে ছেলে তার বাড়িতে ৪ জন সাক্ষী (মা, নানী, মামা, মামী)-এর সামনে বলেছে, "আমি আমার মা, নানী, মামা আর মামীকে সাক্ষী রেখে তোমাকে বিয়ে করলাম, আলহামদুলিল্লাহ কবুল" এবং ভয়েস রেকর্ড পাঠিয়েছে। মেয়ে অন্য জায়গায় একা ছিল, তার পাশে কোনো সাক্ষী ছিল না। মেয়ে ভয়েস শুনে এসএমএস-এ লিখেছে "কবুল, কবুল, কবুল"। ছেলের পাশের সাক্ষীরা মেয়ের এসএমএসটা স্ক্রিনে দেখেছে। প্রশ্ন: এই বিবাহ কি হানাফি মাযহাব অনুযায়ী সহিহ হয়েছে?
ঘটনা ২ (তালাক): প্রথম বিবাহের ২ মাস পর ছেলে রাগ করে এসএমএস-এ লিখেছে "১ তালাক, ২ তালাক, ৩ তালাক"। প্রশ্ন: তালাক কি পতিত হয়েছে?
ঘটনা ৩ (দ্বিতীয় বিবাহ): লাইভ অডিও কলে ৪/৫ জন পুরুষ সাক্ষী ছিল আলাদা আলাদা জায়গায়। সাক্ষীদের মধ্যে একজন মেয়ের পক্ষ থেকে উকিল হয়ে বলেছে, "আমি আমার বোন তামান্নাকে তোমার সাথে বিয়ে দিলাম"। ছেলে শুনে বলেছে, "আমি তোমাকে ৩.৫ লাখ টাকা কাবিন দিয়ে বউ হিসেবে কবুল করলাম"। কল কেটে যাওয়ায় আবার কলে এসে ছেলে আবার কবুল বলেছে। মেয়ে ছেলের কবুল শুনে বলেছে, "আমি তোমাকে জামাই হিসেবে কবুল করলাম"। সাক্ষীরা উভয়ের কবুল নিজ কানে শুনেছে। তারপর দোয়া পড়ানো হয়েছে। প্রশ্ন: এই দ্বিতীয় বিবাহ কি হানাফি মাযহাব অনুযায়ী সহিহ হয়েছে? দয়া করে জানাবেন আমাদের বর্তমান সম্পর্ক হালাল আছে কি না।
ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
সম্মানিত ভাই মো: তামিম ইকবাল, আপনার দাম্পত্য জীবনটি হালাল না হারাম—তা যাচাই করার জন্য আপনি যে সুনির্দিষ্টভাবে তিনটি ঘটনার বিবরণ দিয়ে শরীয়তের ফয়সালা জানতে চেয়েছেন, তা একজন মুমিনের ঈমানী দায়িত্ববোধের পরিচায়ক। ইসলামী শরীয়তে ‘নিকাহ’ বা বিবাহ কোনো সাধারণ সামাজিক চুক্তি নয়; বরং এটি একটি পবিত্র ইবাদত এবং ‘মীসাকান গালীযা’ (দৃঢ় অঙ্গীকার), যা সহীহ হওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু শরয়ী শর্ত (শুরুতে ইনইকাদ ও সিহহাত) পূরণ হওয়া অপরিহার্য।
পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীগণের ইজমা এবং হানাফী মাযহাবের আইম্মায়ে মুজতাহিদীনের অকাট্য ফিকহী মূলনীতির আলোকে আপনার তিনটি ঘটনার দালিলিক বিশ্লেষণ এবং আপনাদের একত্রিত হওয়ার সঠিক শরয়ী পথ নিচে ধারাবাহিকভাবে পেশ করা হলো:
আপনার বর্ণিত প্রথম ঘটনায় ছেলে তার বাড়িতে সাক্ষীদের সামনে ভয়েস রেকর্ড করে পাঠিয়েছে এবং মেয়ে অন্য স্থানে সম্পূর্ণ একা থেকে এসএমএস (SMS) লিখে "কবুল" জানিয়েছে। হানাফী মাযহাবের সর্বসম্মত ফতোয়া অনুযায়ী এই বিবাহটি সম্পূর্ণ বাতিল (باطل) এবং শরীয়তের দৃষ্টিতে তা আদৌ সংঘটিত হয়নি।
কেন এই বিবাহটি সহীহ হয়নি? (৩টি অকাট্য ফিকহী কারণ ও দলীল):
অর্থ: "অভিভাবক এবং দুজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষীর উপস্থিতি ছাড়া কোনো বিবাহ সংঘটিত হয় না।" (সহীহ ইবনে হিব্বান: ৪০৭৫; সুনানে দারাকুতনী: ৩/২২১; আস-সুনানুল কুবরা লিল-বায়হাকী: ৭/১২৫)
হানাফী ফিকহের বিধান অনুযায়ী, কেউ যদি দূরে অবস্থানরত কোনো নারীর কাছে চিঠি বা বার্তার মাধ্যমে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়, তবে বিবাহ শুদ্ধ হওয়ার শর্ত হলো—মেয়েটি যেখানে আছে সেখানে তার সামনে সশরীরে দুজন সাক্ষী উপস্থিত থাকতে হবে, মেয়েটি সাক্ষীদেরকে ছেলের প্রস্তাবটি পড়ে বা শুনিয়ে তাদের সামনেই মুখে ‘কবুল করলাম’ উচ্চারণ করবে। আপনার ঘটনায় মেয়েটি সম্পূর্ণ একা ছিল; তার পাশে কোনো সাক্ষীই ছিল না! তাই বিবাহ আদৌ সংঘটিত হয়নি।
হানাফী মাযহাবের প্রামাণ্য গ্রন্থসমূহের মূল আরবি ইবারত:
অনুবাদ: "ইজাব ও কবুলের অন্যতম শর্ত হলো উভয়টি একই মজলিসে হওয়া... আর যদি কেউ চিঠিতে লেখে: 'আমি তোমাকে বিবাহ করলাম', অতঃপর চিঠিটি মেয়ের কাছে পৌঁছানোর পর মেয়ে যদি দুজন সাক্ষীর সামনে বলে 'আমি নিজেকে তার কাছে বিবাহ দিলাম'—তবুও বিবাহ হবে না, যতক্ষণ না মেয়েটি তার সামনে উপস্থিত ওই দুজন সাক্ষীকে ছেলের প্রস্তাবটি পড়ে শোনায় বা এর বিষয়বস্তু জানায়... আর মেয়ে যদি জবাবে লিখে (মেসেজ করে) জানায় যে 'আমি কবুল করলাম', তবে তো আদৌ কোনো বিবাহ সংঘটিত হবে না।"
— (রদ্দুল মুহতার বা ফতোয়ায়ে শামী: ৩/১২ ও ৩/২১; ফতোয়ায়ে আলমগীরী বা হিন্দিয়া: ১/২৬৯-২৭০; বাদায়েউস সানায়ে: ২/২৩১)সম্মানিত ভাই, এখানে আপনার জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে একটি বিশাল রহমত ও পরিত্রাণের পথ খোলা রয়েছে! যেহেতু ১নং ঘটনায় আপনাদের প্রথম বিবাহটি শরীয়তের দৃষ্টিতে আদৌ সংঘটিত হয়নি (বাতিল ছিল), তাই ওই মেয়েটি তখন আপনার শরয়ী স্ত্রীই ছিল না।
আর পবিত্র কুরআন, হাদিস এবং সাহাবায়ে কেরামের ইজমা অনুযায়ী—বিবাহ সহীহভাবে সংঘটিত হওয়ার পূর্বে বা বাতিল বিবাহে কোনো নারীকে ৩ তালাক কেন, হাজারবার তালাক দিলেও একটি তালাকও পতিত হয় না! সুতরাং, ২ মাস পর আপনি রাগ করে এসএমএসে যে "১ তালাক, ২ তালাক, ৩ তালাক" লিখেছেন, তা শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অনর্থক (لغو) হয়েছে এবং এর দ্বারা কোনো তালাকই কার্যকর হয়নি।
পবিত্র কুরআন, হাদিস ও ফিকহে হানাফীর দলীল:
১. মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন:
অর্থ: "হে মুমিনগণ! তোমরা যখন মুমিন নারীদেরকে (সহীহভাবে) বিবাহ করো, অতঃপর তাদেরকে তালাক দাও..." (সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৪৯)। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় সাহাবী হযরত আলী (রা.) ও হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন, সহীহ বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পূর্বে কোনো তালাক পতিত হয় না।
২. হযরত আমর ইবনে শুআইব (রহ.) তাঁর পিতা ও দাদার সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) ইরশাদ করেছেন:
অর্থ: "মানুষের মালিকানায় যা নেই তাতে কোনো মানত চলে না, তার মালিকানায় যে দাস নেই তাকে আজাদ করা চলে না, এবং যে নারী তার বৈধ বিবাহ-মালিকানায় নেই তার ওপর কোনো তালাকও পতিত হয় না।"
— (জামে তিরমিযী, হাদিস নং: ১১৮১; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ২১৯০; সহীহ বুখারী, কিতাবুত তালাক)৩. হানাফী মাযহাবের প্রামাণ্য গ্রন্থ ‘আল-হেদায়া’, ‘বাদায়েউস সানায়ে’ এবং ‘ফতোয়ায়ে শামী’-তে স্পষ্ট বলা হয়েছে:
অনুবাদ: "তালাক পতিত হওয়ার পূর্বশর্ত হলো বৈধ বিবাহ-মালিকানা অথবা ইদ্দত বিদ্যমান থাকা... সুতরাং কোনো গাইরে মাহরাম নারীর ওপর কিংবা বাতিল বিবাহে আবদ্ধ নারীর ওপর প্রদত্ত তালাক কখনোই পতিত হয় না।"
— (বাদায়েউস সানায়ে: ৩/১২৩; রদ্দুল মুহতার বা ফতোয়ায়ে শামী: ৩/২৩০; ফতোয়ায়ে আলমগীরী: ১/৩৪৯)আপনার বর্ণিত তৃতীয় ঘটনায় বর, কনে, উকিল এবং ৪/৫ জন সাক্ষী—সবাই আলাদা আলাদা জায়গায় অবস্থান করে লাইভ অডিও কনফারেন্স কলের মাধ্যমে ইজাব ও কবুল বলেছেন। হানাফী মাযহাবের মূলনীতি এবং উপমহাদেশসহ সারা বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দারুল ইফতাগুলোর (যেমন: দারুল উলূম দেওবন্দ, জামিয়া বিন্নুরি টাউন করাচী, মারকাযুদ দাওয়াহ আল ইসলামিয়া ঢাকা ইত্যাদি) সর্বসম্মত ফতোয়া অনুযায়ী—ভিন্ন ভিন্ন স্থান থেকে অডিও বা ভিডিও কলের মাধ্যমে এভাবে সরাসরি বিবাহ সম্পন্ন করলে তা সহীহ হয় না।
কেন লাইভ অডিও কলে আলাদা স্থান থেকে বিবাহ সহীহ হয় না? (ফিকহী দলীল):
হানাফী ফিকহ অনুযায়ী বিবাহের মজলিস এক হওয়া (اتحاد المجلس حقيقةً) এবং দুজন সাক্ষীর সশরীরে ওই মজলিসে উপস্থিত থাকা (حضور الشاهدين حسًّا) অপরিহার্য শর্ত। মানুষ যখন আলাদা আলাদা বাড়িতে বা শহরে থেকে ফোনে কথা বলে, তখন তাদের শারীরিক অবস্থান বা মজলিস এক হয় না (المجلس متفرق حقيقةً); বরং তা কেবল কণ্ঠস্বরের যোগাযোগ মাত্র।
ইমাম মারগীনানী (রহ.) ‘আল-হেদায়া’ গ্রন্থে এবং আল্লামা ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) ‘রদ্দুল মুহতার’ গ্রন্থে স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন:
অনুবাদ: "মুসলমানদের বিবাহ দুজন স্বাধীন, সুস্থমস্তিষ্ক, প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম সাক্ষীর সশরীরে উপস্থিতি ছাড়া সংঘটিত হয় না... এবং এর শর্ত হলো বাস্তবেই মজলিস এক হওয়া (একই স্থানে উপস্থিত থাকা)। সুতরাং আকদকারীদ্বয় এবং সাক্ষীগণ যদি ভিন্ন ভিন্ন স্থানে (আলাদা জায়গায়) অবস্থান করে, তবে বিবাহ সংঘটিত হবে না। আর মজলিসে উপস্থিত হওয়া ছাড়া দূর থেকে কেবল কণ্ঠস্বর শুনলে তা জায়েজ হবে না; কেননা এক কণ্ঠের সাথে অন্য কণ্ঠের সাদৃশ্য হতে পারে।"
— (আল-হেদায়া: ২/৩০৬; ফতোয়ায়ে আলমগীরী: ১/২৬৮; রদ্দুল মুহতার বা ফতোয়ায়ে শামী: ৩/১৪ ও ৩/২১; বুহুস ফী কাযায়া ফিকহিয়্যাহ মুআসিরাহ, মুফতি ত্বকী উসমানী: ২/১৫২)উপরোক্ত দালিলিক বিশ্লেষণ থেকে এটি স্পষ্ট যে, আপনাদের প্রথম এবং দ্বিতীয়—কোনো বিবাহটিই হানাফী মাযহাব অনুযায়ী সহীহভাবে সংঘটিত হয়নি। ফলে বর্তমানে আপনাদের সম্পর্কটি হালাল অবস্থায় নেই। না জেনে বা ভুল পদ্ধতিতে বিবাহ করে এতদিন একসাথে থাকার কারণে আপনাদের উভয়কে আল্লাহ তাআলার দরবারে খাঁটি অন্তরে তওবা ও ইস্তিগফার করতে হবে এবং সঠিক নিয়মে বিবাহ না পড়া পর্যন্ত একান্ত মেলামেশা থেকে বিরত থাকতে হবে।
তবে সবচেয়ে স্বস্তির বিষয় হলো: প্রথম বিবাহ না হওয়ার কারণে আপনার দেওয়া ৩ তালাক পতিত হয়নি! তাই আপনাদের মাঝে কোনো ‘হিল্লা’ বা ইদ্দতের বাধা নেই; আপনারা আজই বা যেকোনো মুহূর্তে নিচের যেকোনো একটি সহীহ পদ্ধতিতে মাত্র ৫ মিনিটে শরয়ী বিবাহ সম্পন্ন করে হালাল স্বামী-স্ত্রী হয়ে যেতে পারবেন:
বিবাহ সহীহ করার ২টি সহজ শরয়ী পদ্ধতি (যেকোনো একটি অনুসরণ করুন):
প্রাতিষ্ঠানিক দায়মুক্তি (Disclaimer): প্রশ্নকারীর প্রদত্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কুরআন, সুন্নাহ ও হানাফী ফিকহের আলোকে এই শরয়ী সমাধান প্রদান করা হয়েছে। এটি একান্তই ধর্মীয় দিকনির্দেশনা ও পরকালীন আমলের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত; কোনো রাষ্ট্রীয় আদালত বা আইনি বিরোধের দলিল হিসেবে ব্যবহারযোগ্য নয়।
আল্লাহ তাআলা আপনাদের পূর্বের অনিচ্ছাকৃত ভুল ক্ষমা করুন এবং সহীহ সুন্নাহ অনুযায়ী বিবাহ সম্পন্ন করে পবিত্র দাম্পত্য জীবন যাপনের তৌফিক দান করুন। (আমীন) আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।
WhatsApp us