প্রশ্ন: আমার একটা প্রশ্ন। আমি নিজে নিজে স্ত্রীর সাথে ঝগড়া করতে থাকি। একবার ভাবলাম সকালে ফোন দিব, তারপর নিজে নিজেই ভাবলাম তাকে ফোন দিয়েছি এবং ঝগড়া করতে লাগলাম। অর্থাৎ আমি নিজে নিজেই মুখ-ঠোঁট নেড়ে কোনো উচ্চারণ, শব্দ বা আওয়াজ না করেই দুপক্ষের কথা বলছিলাম। এক পর্যায়ে বললাম, "তালাক দিলাম, ১ তালাক, ২ তালাক।" পরে ভাবতে লাগলাম এইভাবে তো তালাক হয়ে যাবে! আমার স্ত্রীর সাথে তখন কথা হচ্ছিল না বা সে ফোনেও ছিল না। আমি একাই একাই শব্দ না করে তবে ঠোঁট নেড়ে কল্পনা বা ভাবনায় কথাগুলো বলেছি। এখন এর শরয়ী হুকুম কী?
ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
সম্মানিত ভাই শাকিব, আপনার প্রশ্নের বিবরণ পড়ে আপনার মনের অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তার বিষয়টি আমরা অনুধাবন করতে পারছি। মানুষের মন অনেক সময় নানা কল্পনা, আবেগ এবং শয়তানের ওয়াসওয়াসার (কুমন্ত্রণার) শিকার হয়, যা তাকে অহেতুক পেরেশানিতে ফেলে দেয়।
আপনাকে শুরুতেই অত্যন্ত আনন্দের সাথে সুসংবাদ দিচ্ছি এবং আশ্বস্ত করছি যে— আপনার এই একা একা কল্পনায় ঝগড়া করা এবং কোনো আওয়াজ বা শব্দ ছাড়া শুধু ঠোঁট নেড়ে তালাক উচ্চারণ করার দ্বারা শরীয়তের দৃষ্টিতে বিন্দুমাত্র কোনো তালাক পতিত হয়নি। আপনাদের বিবাহ ও সংসার পূর্বের মতোই ১০০% অক্ষুণ্ণ ও হালাল রয়েছে।
পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবায়ে কেরামের ইজমা এবং হানাফী মাযহাবের আইম্মায়ে মুজতাহিদীনের অকাট্য ফিকহী মূলনীতির আলোকে এর দালিলিক বিশ্লেষণ নিচে পর্যায়ক্রমে তুলে ধরা হলো:
আপনি যে একা একা মনে মনে একটি পরিস্থিতি কল্পনা করে স্ত্রীর সাথে ঝগড়া করছিলেন, ইসলামী শরীয়তে একে ‘হাদিসুন নাফস’ (حديث النفس) বা অন্তরের জল্পনা-কল্পনা বলা হয়। দ্বীন ইসলাম অত্যন্ত সহজ ও বিজ্ঞানসম্মত। আল্লাহ তাআলা মানুষের মনের ভেতরের এই ধরনের কল্পনা বা ইচ্ছাকে সম্পূর্ণরূপে ক্ষমারযোগ্য ঘোষণা করেছেন, যতক্ষণ না মানুষ তা বাস্তবে রূপ দেয় বা স্পষ্ট শব্দে উচ্চারণ করে।
হাদিস ও সালাফে সালেহীনের দলীল:
সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ইরশাদ করেছেন:
অর্থ: "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতের মনের জল্পনা-কল্পনা ও ওয়াসওয়াসাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না সে তা কাজে পরিণত করে অথবা মুখে (শব্দ করে) উচ্চারণ করে।"
— (সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ২৫২৮; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ১২৭)ইমাম নববী (রহ.) এবং হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, শুধু মনে মনে তালাকের কথা ভাবলে বা উচ্চারণ করলে কোনো অবস্থাতেই তালাক পতিত হয় না, এ বিষয়ে উম্মতের ইজমা (ঐকমত্য) রয়েছে।
আপনার বর্ণনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো: "আমি নিজে নিজেই মুখ-ঠোঁট নেড়ে কোনো উচ্চারণ, শব্দ বা আওয়াজ না করেই কথা বলছিলাম।"
ইসলামী ফিকহে যেকোনো মৌখিক ইবাদত (যেমন: নামাজের কেরাত) অথবা লেনদেন ও চুক্তি (যেমন: বিবাহ, তালাক, কসম) কার্যকর হওয়ার জন্য অপরিহার্য শর্ত হলো ‘আত-তালাফফুজ’ (التلفظ - উচ্চারণ করা)। আর হানাফী মাযহাবের ইমামগণের ঐকমত্যে ‘তালাফফুজ’ বা উচ্চারণের সর্বনিম্ন সীমা হলো— পরিবেশ শান্ত থাকলে নিজের উচ্চারিত শব্দের আওয়াজ অন্তত নিজের কানে পৌঁছাতে হবে। যদি জিহ্বা ও ঠোঁট নড়ে, কিন্তু কোনো আওয়াজ বা শব্দ তৈরি না হয় (যাতে সে নিজেও কিছু শুনতে পায়নি), তবে ইসলামী শরীয়তে তাকে ‘كَلَامٌ’ (كلام - কথা) বা উচ্চারণ হিসেবে গণ্যই করা হয় না!
হানাফী মাযহাবের শ্রেষ্ঠ ফতোয়া গ্রন্থসমূহের আরবি ইবারত:
১. খাতামুল মুহাক্কিকীন আল্লামা ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) তাঁর জগদ্বিখ্যাত ফতোয়া গ্রন্থ ‘رَدُّ الْمُحْتَارِ’ (ফতোয়ায়ে শামী)-তে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে লিখেছেন:
অনুবাদ: "যদি কোনো ব্যক্তি নিজের মনে মনে তালাক দেয়, অথবা তালাকের শব্দে শুধু নিজের ঠোঁট নাড়ায় কিন্তু (আওয়াজ করে) উচ্চারণ না করে, তবে কোনো তালাক পতিত হবে না... কেননা শরীয়তে ‘উচ্চারণ’ (তালাফফুজ) বলা হয়— অন্তত নিজেকে শোনানোকে।"
— (রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার [ফতোয়ায়ে শামী]: ৩/২৩০, কিতাবুত তালাক)২. মালেকুল উলামা ইমাম কাসানী হানাফী (রহ.) ‘বাদায়েউস সানায়ে’ এবং আল্লামা ইবনে নুজাইম ‘আল-বাহরুর রায়েক’-এ উল্লেখ করেছেন:
অনুবাদ: "সর্বনিম্ন অনুচ্চ আওয়াজের সীমা হলো অন্তত নিজেকে শোনানো... আর কোনো আওয়াজ বা শব্দ ছাড়া শুধুমাত্র জিহ্বা বা ঠোঁটের নড়াচড়া শরীয়তে ধর্তব্য বা গ্রহণযোগ্য নয়।"
— (বাদায়েউস সানায়ে: ১/১৬১; আল-বাহরুর রায়েক: ৩/২৫৫; ফতোয়ায়ে আলমগীরী: ১/৩৫৪)সম্মানিত ভাই, আপনি যে মানসিক পরিস্থিতি বর্ণনা করেছেন, তা মূলত শয়তানের একটি সূক্ষ্ম ধোঁকা। শয়তান চায় স্বামী-স্ত্রীর পবিত্র সম্পর্কের মাঝে সন্দেহ ও ওয়াসওয়াসা ঢুকিয়ে দিয়ে মানুষের মনকে সর্বদা পেরেশান রাখতে। আপনি যখন একাকী বসে এই কাল্পনিক ঝগড়া করছিলেন, তখন শয়তানই আপনার মনে এই ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে যে "এইভাবে তো তালাক হয়ে যাবে!"
আপনার করণীয়:
প্রাতিষ্ঠানিক দায়মুক্তি (Disclaimer): প্রশ্নকারীর প্রদত্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কুরআন, সুন্নাহ ও হানাফী ফিকহের আলোকে এই শরয়ী সমাধান প্রদান করা হয়েছে। এটি একান্তই ধর্মীয় দিকনির্দেশনা ও পরকালীন আমলের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত; কোনো রাষ্ট্রীয় আদালত বা আইনি বিরোধের দলিল হিসেবে ব্যবহারযোগ্য নয়।
আল্লাহ তাআলা আপনার অন্তর থেকে সকল প্রকার ওয়াসওয়াসা দূর করে দিন এবং আপনাদের দাম্পত্য জীবনে অফুরন্ত শান্তি ও বরকত দান করুন। (আমীন) আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।
WhatsApp us