প্রশ্ন: আসসালামু আলাইকুম হুজুর। একজন নারীর প্রথম স্বামীর সঙ্গে সহবাস হয়েছিল। সর্বশেষ সহবাসের প্রায় ৭ মাস পর তাদের মধ্যে তালাক/খুলা হয়। এরপর ওই নারী ইদ্দত পালন না করেই খুব অল্প সময়ের মধ্যে (অজ্ঞতাবশত) অন্য একজন পুরুষকে বিয়ে করেন। বর্তমানে তাদের ১টি সন্তান আছে। আমার প্রশ্ন: ১. তার ওপর কতদিনের ইদ্দত ওয়াজিব ছিল? ২. ৭ মাস পার হওয়ার কারণে কি ইদ্দত শেষ গণ্য হবে নাকি তালাকের দিন থেকে গণনা করতে হবে? ৩. ইদ্দত শেষ হওয়ার আগে দ্বিতীয় বিয়ে কি সহীহ হয়েছে? ৪. বর্তমানে ওই নারী ও দ্বিতীয় স্বামীর কী করণীয়? ৫. ইদ্দত পূর্ণ করে কি একই ব্যক্তির সাথে নতুন করে বিয়ে করা যাবে? ৬. এ বিষয়ে কোনো তওবা বা কাফফারা আছে কি?
ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
সম্মানিত ভাই মিজান, এটি ইসলামী পারিবারিক জীবনের অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি মাসআলা। না জানার কারণে একটি বড় ধরনের শরয়ী ভুল সংঘটিত হয়েছে, তবে আলহামদুলিল্লাহ, ইসলামে প্রতিটি সমস্যারই শরীয়তসম্মত এবং বিজ্ঞানভিত্তিক সমাধান রয়েছে। সন্তান এবং পরিবারের ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা এবং হানাফী ফিকহের আলোকে আপনার ৬টি প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট ও দালিলিক উত্তর নিচে পর্যায়ক্রমে প্রদান করা হলো:
ইসলামী শরীয়তে যে নারীর সাথে স্বামীর সহবাস হয়েছে, তালাক বা খোলা হওয়ার পর তার জন্য ইদ্দত পালন করা ফরজ। আর ইদ্দত সর্বদা তালাক বা বিচ্ছেদের দিন থেকে গণনা শুরু হয়, সর্বশেষ সহবাসের দিন থেকে নয়। দীর্ঘ ৭ মাস বা ৭ বছর ধরে সহবাস না হলেও, যেদিন মুখে বা কাগজে তালাক কার্যকর হয়েছে, সেদিন থেকেই ইদ্দত শুরু হবে।
"আর তালাকপ্রাপ্তা নারীরা তিন হায়েয (ঋতুস্রাব) পর্যন্ত নিজেদেরকে অপেক্ষায় রাখবে।"
— (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২২৮)হানাফী ফিকহের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ 'আল-হেদায়া'-তে বলা হয়েছে: "তালাকের ক্ষেত্রে ইদ্দতের শুরু হয় ঠিক তালাক সংঘটিত হওয়ার পর থেকেই।" (আল-হেদায়া: ২/৪২৯)
সুতরাং, তালাকের দিন থেকে ওই নারীর ওপর পূর্ণ তিনটি হায়েজ (মাসিক) অতিবাহিত হওয়া পর্যন্ত ইদ্দত ওয়াজিব ছিল। (গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসব পর্যন্ত)।
ইসলামী শরীয়তে ইদ্দত চলাকালীন অন্য কোনো পুরুষের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া সম্পূর্ণ হারাম এবং ইজমা (সকল মুজতাহিদের ঐকমত্য) অনুযায়ী এই বিবাহ 'ফাসিদ' (অবৈধ/বাতিল)।
"আর তোমরা ইদ্দত পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত বিবাহ বন্ধনের সংকল্প করো না।" (সূরা আল-বাকারা: ২৩৫)
সুতরাং, যেহেতু ইদ্দত শেষ হওয়ার আগেই তাদের বিয়ে হয়েছে, তাই ইসলামী আইন অনুযায়ী তাদের এই দ্বিতীয় বিয়েটি সহীহ বা শুদ্ধ হয়নি।
যেহেতু তারা না জেনে (অজ্ঞতাবশত) এই ভুলটি করেছে এবং তাদের একটি সন্তানও রয়েছে, তাই ইসলামী শরীয়ত এখানে অত্যন্ত দয়াশীল একটি বিধান রেখেছে যাকে 'ওয়াতী বিশ-শুবহাহ' (ভুলবশত বা সন্দেহের বশবর্তী হয়ে শারীরিক সম্পর্ক) বলা হয়। সন্তানের ভবিষ্যৎ রক্ষার্থে ইসলামী শরীয়ত এই সন্তানের পিতৃত্বকে ওই দ্বিতীয় স্বামীর দিকেই সম্বন্ধিত করবে। সন্তানটি মোটেও অবৈধ নয়, সে সম্পূর্ণ বৈধ এবং ওই দ্বিতীয় স্বামীরই সন্তান হিসেবে আইনি ও শরয়ী স্বীকৃতি পাবে।
"ফাসিদ বিবাহের ক্ষেত্রেও সন্তানের নসব (পিতৃত্ব) সাব্যস্ত হয়, পুরুষের বীর্যের সম্মান রক্ষার্থে এবং সন্তানকে সামাজিক জীবন দানের উদ্দেশ্যে।"
— (আল-হেদায়া, কিতাবুন নিকাহ; রদ্দুল মুহতার)বর্তমানে তাদের করণীয়: শরীয়তের নির্দেশ হলো, যেহেতু বিয়েটি ফাসিদ, তাই অবিলম্বে তাদের মাঝে 'তাফরীফ' (পৃথক হয়ে যাওয়া) ওয়াজিব। দ্বিতীয় স্বামীকে বলতে হবে, "আমি তোমাকে ছেড়ে দিলাম।" এবং তারা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে মেলামেশা ও এক বিছানায় থাকা তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দেবে।
পৃথক হওয়ার পর, নারীটিকে এই দ্বিতীয় স্বামীর সাথে কাটানো ফাসিদ সংসারের কারণে নতুন করে একটি ইদ্দত পালন করতে হবে। অর্থাৎ, যেদিন তারা আলাদা হলো, সেদিন থেকে ৩ হায়েজ (মাসিক) পর্যন্ত ওই নারীকে অপেক্ষা করতে হবে।
এই ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার পর, তারা চাইলে নতুন করে মোহরানা ধার্য করে, দুজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে নতুনভাবে ইজাব-কবুলের মাধ্যমে শরিয়তি নিয়মে বিবাহ করতে পারবে। এতে হালালা বা অন্য কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই। নতুন বিয়ের মাধ্যমে তাদের দাম্পত্য জীবন সম্পূর্ণ হালাল হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।
ইদ্দতের মধ্যে বিয়ে করা একটি কবিরা গুনাহ, যদিও তা না জেনে হয়েছে। এর জন্য শরীয়তে আর্থিক কোনো 'কাফফারা' (জরিমানা) নেই। তবে খাঁটি অন্তরে তওবা (তওবাতুন নাসুহা) এবং ইস্তিগফার করা ওয়াজিব। তারা উভয়েই আল্লাহর কাছে চোখের পানি ফেলে ক্ষমা চাইবে। আল্লাহ তাআলা পরম দয়ালু, তিনি অজ্ঞতাবশত হওয়া ভুল অবশ্যই ক্ষমা করবেন ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ তাআলা তাদের সমস্যার সহজ সমাধান করুন এবং তাদের পরিবারে শান্তি ফিরিয়ে দিন। (আমীন) আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।
WhatsApp us