ইসলামিক প্রশ্নোত্তর - গিনিপিক পালন ও ব্যবসার শরয়ী বিধান
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيم

ফতোয়া ও মাসআলা বিভাগ

প্রশ্নকারী: আলমাস

প্রশ্ন: গিনিপিক পালন করা কি জায়েজ ? এর ব্যবসা বা ক্রয় বিক্রয় করা কি জায়েজ ?

ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

সম্মানিত ভাই আলমাস, গিনিপিক বা গিনিপিগ (Guinea pig) হলো নিরীহ, তৃণভোজী এবং অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের একটি প্রাণী, যা মূলত সৌন্দর্যবর্ধন এবং শখের বশে পোষা হয়। ইসলামী শরীয়ত, পবিত্র সুন্নাহ এবং হানাফী ফিকহের আলোকে আপনার দুটি প্রশ্নের (পালন করা এবং ব্যবসা করা) সুস্পষ্ট ও দালিলিক উত্তর নিচে প্রদান করা হলো:

১. গিনিপিক পালন করার হুকুম

ইসলামী শরীয়তের সাধারণ মূলনীতি হলো, যে প্রাণী ক্ষতিকর (বিষাক্ত) নয় এবং যার সত্তা অপবিত্র (নাজিসুল আইন যেমন- শুকর বা কুকুর) নয়, তা শখ করে বা সঙ্গ পাওয়ার উদ্দেশ্যে পালন করা সম্পূর্ণ জায়েজ। গিনিপিক একটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও নিরীহ প্রাণী। সাহাবায়ে কেরাম (রা.) নিরীহ প্রাণী শখ করে পালতেন এবং স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) তা অনুমোদন করেছেন।

يَا أَبَا عُمَيْرٍ، مَا فَعَلَ النُّغَيْرُ

সহীহ বুখারীর একটি বিখ্যাত হাদিসে হযরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন: "নবীজী (সা.) আমার ছোট ভাই আবু উমায়েরের সাথে রসিকতা করতেন। আবু উমায়ের একটি ছোট পাখি (নুগাইর) পুষত। নবীজী তাকে দেখলে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করতেন: 'হে আবু উমায়ের! তোমার নুগাইর (পাখি) কী করছে?'"

— (সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৬১২৯; সহীহ মুসলিম: ২১৫০)

হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) 'ফাতহুল বারী' গ্রন্থে এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন: "এ হাদিস থেকে প্রমাণিত হয় যে, খাঁচায় বা ঘরে শখ করে বৈধ প্রাণী পালন করা জায়েজ।"

তবে একটি কঠিন শর্ত হলো: প্রাণী পালন করলে তার খাবার, পানীয় ও চিকিৎসার পূর্ণ দায়িত্ব নিতে হবে। খাঁচায় আটকে রেখে কষ্ট দিলে বা খাবার না দিলে তা কবিরা গুনাহের কারণ হবে।

২. গিনিপিক ক্রয়-বিক্রয় ও ব্যবসার হুকুম

হানাফী মাযহাবের ফিকহী মূলনীতি অনুযায়ী, কোনো প্রাণী ক্রয়-বিক্রয় হালাল হওয়ার জন্য শর্ত হলো—প্রাণীটির মধ্যে মানুষের জন্য কোনো 'বৈধ উপকারিতা' (منفعة مباحة) থাকতে হবে। গিনিপিকের ক্ষেত্রে এই বৈধ উপকারিতা হলো মানুষের চিত্তবিনোদন, সৌন্দর্যবর্ধন এবং পোষা প্রাণী হিসেবে সঙ্গ দেওয়া (যাকে ফিকহে 'তাফরীহুন নাফস' বলা হয়)।

يَجُوزُ بَيْعُ كُلِّ حَيَوَانٍ فِيهِ مَنْفَعَةٌ تَحِلُّ شَرْعًا

হানাফী মাযহাবের প্রখ্যাত ফিকহ গ্রন্থ 'ফতোয়ায়ে শামী' এবং 'বাদায়েউস সানায়ে' তে সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে: "যে প্রাণীর মধ্যে শরীয়তসম্মত কোনো উপকারিতা রয়েছে, তার ক্রয়-বিক্রয় জায়েজ।"

— (বাদায়েউস সানায়ে: ৫/১৪৩; রদ্দুল মুহতার: ৪/৫১১)

যেহেতু তোতাপাখি, বিড়াল বা অন্যান্য নিরীহ পোষা প্রাণীর ব্যবসা করা ইসলামী ফিকহে হালাল, ঠিক একইভাবে গিনিপিকের ব্যবসাও সম্পূর্ণ হালাল। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ব্যবসাকে হালাল করেছেন (وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ)। এর মাধ্যমে অর্জিত আয় আপনার জন্য হালাল রিযিক হিসেবে গণ্য হবে।

একটি জরুরি জ্ঞাতব্য (খাওয়া প্রসঙ্গে)

গিনিপিক পালন করা এবং ক্রয়-বিক্রয় করা হালাল হলেও, এটি ইঁদুর (Rodent) জাতীয় প্রাণীর অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় গিনিপিক খাওয়া ইসলামী শরীয়তে হারাম (নাজায়েজ)। ইসলামে যেসব প্রাণীর গোশত খাওয়া হারাম, জীবিত অবস্থায় তার ব্যবসা করা বা পালন করা হারাম হওয়া জরুরি নয় (যেমন- বিড়াল পালন ও কেনাবেচা জায়েজ, কিন্তু খাওয়া হারাম)।

সারসংক্ষেপ

  • শখ করে বা পোষা প্রাণী হিসেবে গিনিপিক পালন করা সম্পূর্ণ জায়েজ।
  • আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে গিনিপিকের ফার্ম করা বা এর ব্যবসা ও ক্রয়-বিক্রয় করা হালাল।
  • প্রাণীর প্রতি সদয় আচরণ করা এবং তাদের পর্যাপ্ত খাবার ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করা পালকের ওপর শরয়ী দায়িত্ব।

আল্লাহ তাআলা আপনার ব্যবসায় বরকত দান করুন। (আমীন) আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।