প্রশ্ন: মুহতারাম মুফতি সাহেব, আমাদের এলাকায় একটি মারামারিতে কিছু লোক মারা যাওয়ার পর মামলা হয়। মামলার ভয়ে এলাকার সমস্ত পুরুষ পালিয়ে যায় বিধায়, এলাকা পুরুষ-শূন্য হয়ে পড়ে। মৃত ব্যক্তিদের জানাযা পড়ানোর মতো কোন পুরুষ এলাকায় ছিল না বিধায়, মহিলার ইমামতিতে মৃতদের জানাজা নামাজ পড়ানো হয়েছে। এখন হুজুরের নিকট আমার জানার বিষয় হল, পুরুষ-শূন্য এলাকায় মহিলার ইমামতিতে জানাযা নামাজ পড়ার হুকুম কি? দলিলসহ জানালে কৃতজ্ঞ থাকব।
ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
সম্মানিত ভাই আরিফ জামিল, আপনার বর্ণিত পরিস্থিতিটি অত্যন্ত মর্মান্তিক এবং দুঃখজনক। এমন কঠিন মুহূর্তেও মৃত মুসলমানদের হক (জানাযা) আদায়ের যে ফিকির এলাকার মহিলারা করেছেন, তা প্রশংসনীয়। ইসলামী ফিকহ এবং হানাফী মাযহাবের নির্ভরযোগ্য কিতাবের আলোকে আপনার প্রশ্নের বিস্তারিত ও দলিলভিত্তিক উত্তর নিচে প্রদান করা হলো:
জানাযার নামাজ হলো 'ফরজে কিফায়া' (অর্থাৎ এলাকার কয়েকজন আদায় করলে সবার পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যায়, আর কেউ না পড়লে সবাই গোনাহগার হয়)। যদি এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয় যে, জানাযা পড়ার মতো কোনো পুরুষ উপস্থিত নেই, তখন এই ফরজে কিফায়ার দায়িত্ব সরাসরি মহিলাদের ওপর বর্তায়। এমন অবস্থায় মহিলাদের জানাযার নামাজ পড়া শরীয়তের নির্দেশ।
হানাফী মাযহাবের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শুধু মহিলাদের জন্য আলাদা জামাত করা (যেকোনো নামাজে) 'মাকরুহে তাহরীমী'। তাই জানাযার ক্ষেত্রেও হুকুম হলো, পুরুষ না থাকলে মহিলারা প্রত্যেকে আলাদা আলাদা (একা একা) জানাযার নামাজ পড়ে নেবে। তবে, যদি তারা একা একা না পড়ে কোনো মহিলার ইমামতিতে জামাতবদ্ধ হয়ে জানাযা পড়ে ফেলে, তবুও তাদের জানাযা সহীহ হয়ে যাবে এবং ফরজে কিফায়া আদায় হয়ে যাবে।
হানাফী ফিকহের বিখ্যাত গ্রন্থ 'ফতোয়ায়ে আলমগীরী (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া)'-তে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে:
"আর যদি সেখানে (মৃতের জানাযা পড়ার জন্য) কেবল মহিলারাই থাকে, তবে তারা একা একা (জানাযা) পড়বে। আর যদি তারা জামাতের সাথে পড়ে নেয়, তাহলেও তা জায়েজ (সহীহ) হবে এবং ফরজ আদায় হয়ে যাবে। তবে এক্ষেত্রে ইমাম (মহিলা) তাদের মাঝখানে দাঁড়াবে, পুরুষ ইমামের মতো সামনে অগ্রসর হয়ে দাঁড়াবে না। ফতোয়ায়ে কাযীখান গ্রন্থে এমনটিই রয়েছে।"
— (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া বা আলমগীরী: ১/১৬৩; বাদাইউস সানাঈ: ১/৩১১)সালাফে সালেহীন এবং উম্মাহাতুল মুমিনীন (রা.)-এর আমল দ্বারা প্রমাণিত যে, মহিলারা যদি একান্তই জামাত করে, তবে মহিলা ইমাম পুরুষদের মতো সামনের কাতারে একা দাঁড়াবেন না, বরং তিনি প্রথম কাতারের মাঝখানে (অন্য মহিলাদের সাথে একই লাইনে) দাঁড়াবেন।
হযরত আয়েশা (রা.) এবং উম্মে সালামা (রা.) থেকে মহিলাদের জামাতে ইমামতির সময় কাতারের মাঝখানে দাঁড়ানোর বিষয়টি মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবায় নির্ভরযোগ্য সনদে বর্ণিত রয়েছে। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা: হা/৪৯৫৪)
জ্ঞাতব্য: তবে যদি আপনাদের এলাকার মহিলা ইমাম না জেনে পুরুষদের মতো সামনে এগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, তবুও জানাযা বাতিল হবে না, বরং তা সহীহ বলে গণ্য হবে।
যেহেতু আপনাদের এলাকায় পুরুষ-শূন্যতার কারণে নিরুপায় হয়ে মহিলারা জামাতের সাথে জানাযা আদায় করেছেন, তাই ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক মৃত ব্যক্তিদের জানাযা সম্পূর্ণভাবে সহীহ হয়ে গেছে এবং ফরজে কিফায়া আদায় হয়ে গেছে। এ নিয়ে কোনো প্রকার সন্দেহ বা পেরেশানির কারণ নেই এবং নতুন করে এই জানাযা দোহরানোরও (পুনরায় পড়ার) কোনো প্রয়োজন নেই।
আল্লাহ তাআলা মৃতদের শাহাদাতের মর্যাদা দান করুন এবং আপনাদের এলাকাকে শান্ত করুন। (আমীন) আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।
WhatsApp us