ইনসাফ

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

বিষয়ঃ ইনসাফ
(নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ আয়াত-এর তরজমা ও তাফসীর)

আল কুরআন: আল হাদীদ/৫৭:২৫

لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَأَنزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ ۖ وَأَنزَلْنَا الْحَدِيدَ فِيهِ بَأْسٌ شَدِيدٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَلِيَعْلَمَ اللَّهُ مَن يَنصُرُهُ وَرُسُلَهُ بِالْغَيْبِ ۚ إِنَّ اللَّهَ قَوِيٌّ عَزِيزٌ

অনুবাদ:
নিশ্চয়ই আমি আমার রসূলদেরকে প্রেরণ করেছি স্পষ্ট প্রমাণসহ এবং তাদের সঙ্গে অবতীর্ণ করেছি কিতাব ও তুলাদন্ড (ন্যায়-নীতি);[১] যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে। আর আমি লোহা অবতীর্ণ করেছি;[২] যাতে রয়েছে প্রচন্ড শক্তি[৩] ও রয়েছে মানুষের জন্য বহুবিধ কল্যাণ,[৪] আর যাতে আল্লাহ জানতে পারেন যে, কে না দেখেও তাঁকে ও তাঁর রসূলদেরকে সাহায্য করে।[৫] নিশ্চয় আল্লাহ শক্তিমান, পরাক্রমশালী। [৬]

[১] ميزان (তুলাদন্ড) বলতে ন্যায়নীতি বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, আমি লোকদেরকে সুবিচার করার নির্দেশ দিয়েছি। কেউ কেউ এর অনুবাদ করেছেন দাঁড়িপাল্লা। দাঁড়িপাল্লা অবতীর্ণ করার অর্থ হল, আমি দাঁড়িপাল্লার দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছি যে, এর দ্বারা ওজন করে মানুষকে পুরো পুরো প্রাপ্য দিয়ে দাও।

[২] এখানে অবতীর্ণ করার অর্থ সৃষ্টি করা ও তার শিল্পকাজ শিখানো। লোহা থেকে অসংখ্য জিনিস তৈরী হয়। এসব আল্লাহর প্রেরণা দান ও তাঁর দিগ্দর্শনের ফল; যা তিনি মানুষের প্রতি করেছেন।

[৩] অর্থাৎ, লোহা থেকে যুদ্ধাস্ত্র তৈরী হয়। যেমন, তরবারি, বর্শা, বন্দুক এবং আধুনিক এ্যাটম বোম, তোপ-কামান, যুদ্ধ-বিমান, ডুবোজাহাজ, রকেট ও ট্যাঙ্ক ইত্যাদি অনেক জিনিস। যার দ্বারা শত্রুর উপর আক্রমণও করা যায় এবং নিজেদের প্রতিরক্ষাও করা যায়।

[৪] অর্থাৎ, যুদ্ধাস্ত্র ছাড়া লোহা থেকে আরো এমন অনেক জিনিষ তৈরী হয়, যা বাড়িতেও বিভিন্ন সাংসারিক কাজে আসে। যেমন, ছুরি, চাকু, কাঁচি, হাতুড়ি, সূচ, অনুরূপ চাষী, ছুতার ও রাজমিস্ত্রীর কাজের আসবাব-পত্র সহ ছোট-বড় অসংখ্য মেশিন ও জিনিস-পত্র। (এই লোহা থেকে গাড়ি তৈরী হয় এবং তারই উপর তা চলে।)

[৫] এর সংযোগ হল لِيَقُوْمَ এর সাথে। অর্থাৎ, রসূলদেরকে এই জন্য প্রেরণ করেছেন যে, যাতে তিনি জেনে নেন কে তাঁর রসূলদের উপর আল্লাহকে না দেখেই ঈমান নিয়ে আসে এবং তাঁদের সাহায্য করে।

[৬] তাঁর এর প্রয়োজন নেই যে, মানুষ তাঁর দ্বীনের এবং তাঁর রসূলগণের সাহায্য করুক। বরং তিনি চাইলে কারো সাহায্য ছাড়াই তাঁদেরকে জয়ী করতে পারেন। কিন্তু মানুষদেরকে তিনি তাঁদের সাহায্য করার নির্দেশ কেবল তাদেরই মঙ্গলার্থে দিয়েছেন। এইভাবে যাতে তারা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে তাঁর ক্ষমা ও করুণার অধিকারী হয়ে যায়।

 

আল কুরআন: আন নাহল/১৬:৯০

إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَىٰ وَيَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ وَالْبَغْيِ ۚ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ

অনুবাদ:
নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন এবং তিনি অশ্লীলতা, অসৎকার্য ও সীমালংঘন করা হতে নিষেধ করেন।[১] তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন; যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর।

[১] عدل এর প্রসিদ্ধ অর্থ ন্যায়পরায়ণতা (সুবিচার)। অর্থাৎ, ঘর-পর সকলের ব্যাপারে সুবিচার করা। কারো সাথে শত্রুতা, ঝগড়া, ভালবাসা বা আত্মীয়তার কারণে সুবিচার যেন প্রভাবিত না হয়। এর দ্বিতীয় অর্থ মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা এবং কোন ব্যাপারে বাড়াবাড়ি না করা, এমন কি দ্বীনের ব্যাপারেও। কেননা, দ্বীনের মধ্যে إفراط এর পরিণাম সীমা অতিক্রম বা অতিরঞ্জন করা যা অত্যন্ত নিন্দনীয়। পক্ষান্তরে এর বিপরীত تفريط এর অর্থ দ্বীনের মধ্যে অলসতা করা; আর এটিও অপছন্দনীয়।إحسان এর একটি অর্থ সদাচরণ, ক্ষমা ও মাফ করা। দ্বিতীয় অর্থ এহসানি বা অনুগ্রহ করা; ওয়াজিব (প্রাপ্য) অধিকারের চেয়ে বেশি দেওয়া বা ওয়াজেব (কর্তব্য) কাজের অধিক করা। যেমন কোন শ্রমিকের পারিশ্রমিক ঠিক হয়েছে এক শত টাকা, কিন্তু দেওয়ার সময় একশত দশ বা বিশ টাকা দেওয়া। এক শত টাকা দেওয়া এটি ওয়াজেব (প্রাপ্য) অধিকার, আর এটাই সুবিচার, আর দশ বিশ টাকা বেশি দেওয়া এটাই হল এহসান বা অনুগ্রহ। সুবিচার দ্বারা সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়, কিন্তু সদাচরণ ও অনুগ্রহ প্রদর্শন দ্বারা সমাজে অধিক সৌন্দর্য, সৌহার্দ্য ত্যাগ-তিতিক্ষার স্পৃহা সৃষ্টি হয়। অনুরূপভাবে ফরয কাজ সম্পাদন করার সাথে সাথে নফল কাজে আগ্রহী হওয়া কর্তব্যের চাইতে বেশি আমল। যার দ্বারা আল্লাহর বিশেষ নৈকট্য লাভ হয়। এহসানের তৃতীয় অর্থঃ ইবাদত একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা ও তা সুন্দরভাবে সম্পন্ন করা। যার হাদীসে أن تعبد الله كأنك تراه (আল্লাহর ইবাদত এমনভাবে কর, যেন তুমি আল্লাহকে দেখছ) বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। إيتاء ذي القربى আত্মীয়-স্বজনের অধিকার আদায় করা, অর্থাৎ, তাদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করা। এটাকেই হাদীসে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা বলা হয়েছে এবং তার প্রচুর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সুবিচার, সদাচরণ অনুগ্রহের পর এর পৃথকভাবে উল্লেখ জ্ঞাতি-বন্ধন বজায় রাখার গুরুত্বকে আরো অধিকরূপে বাড়িয়ে তোলে। فحشاء অশ্লীল কাজ, আজকাল অশ্লীলতা এত ব্যাপকতা লাভ করেছে যে, তার নামই সভ্যতা, সংস্কৃতি, প্রগতি ও শিল্পকলা হয়ে গেছে! অথবা চিত্ত-বিনোদন বা মনোরঞ্জনের নামে তাকে বৈধ করে নেওয়া হয়েছে। তবে সুন্দর লেবেল লাগালে কোন জিনিসের আসলত্ব পাল্টে যায় না। অনুরূপ ইসলাম ব্যভিচার ও তার সকল ছিদ্রপথ; নাচ, পর্দাহীনতা, ফ্যাশন-প্রবণতা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা এবং অনুরূপ লজ্জাহীনতা প্রদর্শনকে অশ্লীলতা বলে অভিহিত করেছে। তার নাম যত সুন্দরই হোক না কেন; পাশ্চাত্য হতে আমদানীকৃত নোংরামি কোন মতেই বৈধ হতে পারে না। منكر (গর্হিত) প্রত্যেক সেই কাজ, যা শরীয়তে অবৈধ। بغي অর্থ অত্যাচার ও সীমালংঘন করা। একটি হাদীসে বলা হয়েছে যে, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা ও অত্যাচার করা এই দুই পাপ মহান আল্লাহর নিকট এত ঘৃণিত যে, আল্লাহর পক্ষ হতে পরকাল ছাড়া পৃথিবীতেই তার তৎক্ষণাৎ শাস্তির আশংকা থেকে যায়। (ইবনে মাজাহ কিতাবুয যুহদ)

 

আল কুরআন: আল আরাফ/৭:২৯

قُلْ أَمَرَ رَبِّي بِالْقِسْطِ ۖ وَأَقِيمُوا وُجُوهَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَادْعُوهُ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ ۚ كَمَا بَدَأَكُمْ تَعُودُونَ

অনুবাদ:
বল, ‘আমার প্রতিপালক ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে নির্দেশ দিয়েছেন।[১] প্রত্যেক নামাযে তোমাদের লক্ষ্য স্থির রাখ[২] এবং তাঁরই আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে একনিষ্ঠভাবে তাঁকে ডাক। তিনি যেভাবে প্রথমে তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তোমরা সেভাবে ফিরে আসবে।’

[১] ‘ন্যায় প্রতিষ্ঠা’ বলতে এখানে কারো কারো নিকট لاَإِلَهَ إلاَّ اللهُ অর্থাৎ, তাওহীদ প্রতিষ্ঠা বুঝানো হয়েছে।

[২] ইমাম শাওকানী এর অর্থ বর্ণনা করেছেন, “তোমাদের নামাযে নিজেদের চেহারাকে ক্বিবলার দিকে করে নাও, তাতে তোমরা যে মসজিদেই থাক না কেন।” আর ইমাম ইবনে কাসীর এই ‘স্থির বা সোজা’ রাখা বলতে রসূল (সাঃ)-এর আনুগত্য এবং পরবর্তী বাক্য থেকে আল্লাহর জন্য নিষ্ঠাবান হওয়াকে বুঝিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রত্যেক আমল কবুল হওয়ার জন্য জরুরী হল তা শরীয়তের অনুবর্তী হওয়া এবং দ্বিতীয়তঃ তা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানের জন্য হওয়া। আয়াতে এই কথাগুলোর প্রতি তাকীদ করা হয়েছে।

 

আল কুরআন: আল আরাফ/৭:১৫৯

وَمِن قَوْمِ مُوسَىٰ أُمَّةٌ يَهْدُونَ بِالْحَقِّ وَبِهِ يَعْدِلُونَ

অনুবাদ:
মূসার সম্প্রদায়ের মধ্যে এমন একদল রয়েছে যারা (অন্যকে) ন্যায় পথ দেখায় ও ন্যায় বিচার করে। [১]

[১] এই দল থেকে ঐ কয়েকজন মানুষকে বুঝানো হয়েছে, যাঁরা মুসলমান হয়ে গিয়েছিলেন। যেমন, আব্দুল্লাহ বিন সালাম (রাঃ) প্রমুখ।