ইসলামিক প্রশ্নোত্তর - মুখে ইজাব-কবুল ছাড়া বিবাহ ও তালাকের বিধান
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيم

ফতোয়া ও মাসআলা বিভাগ

প্রশ্নকারী: Ibrahim

প্রশ্ন: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। হুজুর, একটি জরুরি ও জটিল বিষয়ের সমাধান চাই। একটি ছেলে ও মেয়ে পারিবারিকভাবে না জানিয়ে কোর্টে গিয়ে সাক্ষীদের উপস্থিতিতে শুধু কাবিননামা ও হলফনামায় স্বাক্ষর করে বিবাহ করে। সেখানে মৌখিকভাবে কোনো প্রকার ইজাব ও কবুল হয়নি। এরপর তারা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বসবাস শুরু করে। পরবর্তীতে ঝগড়ার সময় ছেলেটি রাগের মাথায় ৩ বারেরও বেশি ‘তালাক’ শব্দ উচ্চারণ করে। বর্তমানে পরিবার মেনে নিয়েছে এবং ঘরোয়াভাবে শরীয়তের নিয়মে নতুন করে বিয়ে দিতে চায়। প্রশ্ন হলো: ১) মৌখিক ইজাব-কবুল ছাড়া শুধু স্বাক্ষরের মাধ্যমে তাদের প্রথম বিবাহটি কি সহীহ হয়েছিল? ২) প্রথম বিবাহ সহীহ না হলে, ৩ বারের বেশি উচ্চারিত তালাক কি কার্যকর হয়েছে? ৩) হালালা ছাড়াই কি তারা নতুন করে মোহরানা ধার্য করে মৌখিক ইজাব-কবুলের মাধ্যমে পুনরায় বৈধভাবে বিয়ে করতে পারবে? (তারা হানাফী মাযহাব অনুসরণ করেন)

ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

সম্মানিত ভাই ইব্রাহিম, ছেলে-মেয়ে উভয়ে নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে শরীয়তের সঠিক পথে ফিরে আসতে চাওয়ায় আলহামদুলিল্লাহ। হানাফী ফিকহ, কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য দলীলের আলোকে আপনার বর্ণিত ঘটনাটি বিশ্লেষণ করলে অত্যন্ত স্পষ্ট একটি সমাধান বেরিয়ে আসে। আপনার প্রতিটি প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট ও দলীলভিত্তিক উত্তর নিচে পর্যায়ক্রমে দেওয়া হলো:

১. মৌখিক ইজাব-কবুল ছাড়া শুধু স্বাক্ষরের মাধ্যমে বিবাহের হুকুম

শরয়ী দৃষ্টিকোণ: প্রথম বিবাহটি আদৌ সম্পন্ন হয়নি (বাতিল)

ইসলামী শরীয়তে 'নিকাহ' (বিবাহ) মূলত একটি মৌখিক চুক্তি (عقد قولي)। বিবাহ সহীহ হওয়ার প্রধান এবং মৌলিক শর্ত (রুকন) হলো, সাক্ষীদের উপস্থিতিতে বর ও কনের (বা তাদের ওকিলের) মুখে সুস্পষ্ট ভাষায় 'ইজাব' (প্রস্তাব) এবং 'কবুল' (গ্রহণ) উচ্চারণ করা। যদি বর ও কনে শারীরিকভাবে একই মজলিসে উপস্থিত থাকে, তবে মুখে উচ্চারণ করা ছাড়া শুধু কাগজে বা কাবিননামায় স্বাক্ষর করলে ইসলামী শরীয়তে বিবাহ আদৌ সংঘটিত হয় না (বাতিল)।

يَنْعَقِدُ بِإِيجَابٍ وَقَبُولٍ بِوَضْعِ الْمَاضِي... وَلَا يَكْفِي الْكِتَابَةُ مِنَ الْحَاضِرَيْنِ

হানাফী মাযহাবের নির্ভরযোগ্য ফিকহ গ্রন্থ 'ফতোয়ায়ে শামী' (রদ্দুল মুহতার) এবং 'আল-হেদায়া' তে সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে: "বিবাহ অতীতকালের শব্দ দ্বারা ইজাব ও কবুল উচ্চারণের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়... যারা উপস্থিত আছে তাদের ক্ষেত্রে শুধু লেখা (বা স্বাক্ষর করা) যথেষ্ট নয়, বরং মুখে উচ্চারণ করা অপরিহার্য।"

— (রদ্দুল মুহতার: ৩/৯; ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া: ১/২৬৯)

যেহেতু তারা কোর্টে গিয়ে উপস্থিত থাকা অবস্থায় মুখে কোনো ইজাব ও কবুল করেনি, শুধু কাগজে স্বাক্ষর করেছে, তাই শরীয়তের দৃষ্টিতে তাদের কোনো বিবাহই হয়নি। তারা বিবাহ বহির্ভূত (গাইরে মাহরাম) অবস্থাতেই বসবাস করেছে, যা একটি গুরুতর গুনাহ। এর জন্য তাদেরকে আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে তওবা ও ইস্তিগফার করতে হবে।

২. বাতিল বিবাহের পর তিন তালাক উচ্চারণের বিধান

যেহেতু শরীয়তের দৃষ্টিতে তাদের প্রথম বিবাহটি সংঘটিতই হয়নি, তাই শরীয়তের নিয়মে ছেলেটি মেয়েটির 'স্বামী' ছিল না এবং মেয়েটি তার 'স্ত্রী' ছিল না। আর ইসলামী ফিকহের অকাট্য মূলনীতি হলো, তালাক কেবল বৈধ স্ত্রীর ওপরই পতিত হয়। বিবাহ বন্ধন (عصمة النكاح) ছাড়া তালাক দিলে তার কোনো কার্যকারিতা নেই।

لَا طَلَاقَ قَبْلَ النِّكَاحِ

রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) স্পষ্টভাবে এরশাদ করেছেন: "নিকাহের পূর্বে কোনো তালাক নেই।"

— (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং: ২০৪৭; জামে তিরমিযী, হাদিস নং: ১১৮১)

সুতরাং, ছেলেটি ঝগড়ার সময় ৩ বার কেন, হাজার বার তালাক উচ্চারণ করলেও তা বাতাসে মিলিয়ে গেছে। এর দ্বারা শরীয়তের কোনো তালাক কার্যকর হয়নি এবং কোনো চূড়ান্ত বিচ্ছেদ বা 'তালাকে মুগাল্লাযা' পতিত হয়নি।

৩. বর্তমান পরিস্থিতি: হালালা ছাড়া পুনরায় বিবাহের হুকুম

হালালার কোনো প্রয়োজন নেই, সরাসরি বিবাহ জায়েজ

যেহেতু পূর্বে কোনো বিবাহই হয়নি এবং কোনো তালাকই পতিত হয়নি, তাই এখানে 'হালালা' বা হিল্লা বিয়ের প্রশ্নই অবান্তর। মেয়েটি শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ মুক্ত।

তারা যেহেতু ভুল বুঝতে পেরেছে এবং পরিবারও রাজি হয়েছে, তাই এখন সম্পূর্ণ নতুন করে, নতুন মোহরানা নির্ধারণ করে এবং ন্যূনতম দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম পুরুষের সাক্ষীর উপস্থিতিতে মৌখিকভাবে স্পষ্ট ইজাব ও কবুল উচ্চারণের মাধ্যমে তারা অত্যন্ত বৈধ ও হালালভাবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে। এতে শরীয়তের বিন্দুমাত্র কোনো বাধা নেই।

সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত ফয়সালা

  1. প্রথম বিবাহ: মুখে ইজাব ও কবুল উচ্চারণ না করায় শুধু স্বাক্ষরের মাধ্যমে তাদের প্রথম বিবাহটি বাতিল বা অকার্যকর ছিল।
  2. তালাক: বিবাহ না হওয়ার কারণে ছেলেটির উচ্চারিত ৩ বা ততোধিক তালাক সম্পূর্ণ অর্থহীন এবং অকার্যকর; কোনো তালাক পতিত হয়নি।
  3. হালালা ও পুনরায় বিবাহ: তাদের জন্য কোনো হালালার প্রয়োজন নেই। তারা শুধু তওবা করে এখনই নতুন করে মোহরানা ধার্য করে, সাক্ষীদের সামনে মুখে ইজাব-কবুল পাঠ করে বৈধভাবে বিবাহ করতে পারবে।

আল্লাহ তাআলা তাদের ভুল ক্ষমা করুন এবং নতুন পবিত্র দাম্পত্য জীবনে বরকত দান করুন। (আমীন) আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।