ইসলামিক প্রশ্নোত্তর - রাগের মাথায় স্ত্রীকে হারাম ও চলে যেতে বলার শরয়ী বিধান
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيم

ফতোয়া ও মাসআলা বিভাগ

প্রশ্নকারী: ইয়াছমিন আক্তার

প্রশ্ন: আমার বিয়ে হয়েছে ৩ বছর। আমার স্বামী সৌদি আরব থাকেন। পারিবারিক ঝামেলা হলে উনি প্রায়ই আমাকে চলে যেতে বলেন, বলেন যে আমার সাথে সংসার করতে চান না, আমার প্রতি উনার কোনো আকর্ষণ নেই। কিন্তু ৪/৫ দিন পর আবার সব ঠিক হয়ে যায়। আমি একবার রাগ করে বাবার বাড়িতে ৫ মাস ছিলাম, তখন এলাকার লোক নিয়ে মিটিং করে আমাদের মিলিয়ে দেওয়া হয়। তখন নাকি উনি মনে মনে নিয়ত করেছিলেন আমাকে আর রাখবেন না।
দ্বিতীয়ত, উনি একবার রাগ করে বলেছিলেন— "আল্লাহর কসম, আমি যদি আজকের পর তোর শরীরে ধরি, তুই আমার জন্য হারাম হয়ে যাবি।" কিন্তু উনি পরের দিনই আমার সাথে শারীরিক সম্পর্ক করেন।
আমার প্রশ্ন হলো: ১. উনি মুখে কখনো তালাক উচ্চারণ করেননি, শুধু চলে যেতে বা সংসার না করার কথা বলেছেন এবং মনে মনে নিয়ত করেছিলেন; এতে কি তালাক হয়েছে? ২. কসম করে হারাম বলার পর সম্পর্ক করায় বিধান কী? ৩. আমাদের সম্পর্ক কি এখনো হালাল আছে? উনি জানেন আমি উনাকে অনেক ভালোবাসি এবং কষ্ট দিলেও যাব না, তাই বেশি বেশি এগুলো বলেন। আমার এখন কী করা উচিত?

ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

সম্মানিতা বোন ইয়াছমিন আক্তার, আপনার স্বামী আপনার প্রতি যে অবহেলা ও মানসিক চাপ প্রয়োগ করছেন এবং কথায় কথায় অহেতুক কসম খাচ্ছেন, তা একজন আদর্শ মুসলিম স্বামীর আচরণ হতে পারে না। তবে আপনি অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে শরীয়তের বিধান জানতে চেয়েছেন বলে আপনাকে ধন্যবাদ। পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ এবং হানাফী মাযহাবের নির্ভরযোগ্য ফিকহী মূলনীতির আলোকে আপনাকে শুরুতেই সুসংবাদ দিচ্ছি যে— আপনাদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক সম্পূর্ণ ১০০% হালাল ও অটুট রয়েছে। আপনার স্বামীর কোনো কথা বা কাজের দ্বারাই আপনাদের মাঝে কোনো তালাক পতিত হয়নি।

তবে একটি ক্ষেত্রে আপনার স্বামীর ওপর একটি ‘কাফফারা’ (জরিমানা) ওয়াজিব হয়েছে। নিচে আপনার প্রতিটি প্রশ্নের দালিলিক ফিকহী ফয়সালা ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করা হলো:

১. "চলে যাও" বা "সংসার করব না" বলা এবং মনে মনে নিয়ত করার শরয়ী বিধান

হানাফী ফিকহের ফয়সালা: কিনায়া শব্দে সুনির্দিষ্ট নিয়ত না থাকলে এবং মুখে তালাক না বললে তালাক হয় না

আপনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, আপনার স্বামী মুখে কখনো ‘তালাক’ শব্দটি উচ্চারণ করেননি। তিনি কেবল বলেছেন "চলে যাও" বা "সংসার করব না"। ইসলামী ফিকহে এগুলোকে ‘কিনায়া’ (ইঙ্গিতবাহী শব্দ) বলা হয়। এ ধরনের শব্দের ক্ষেত্রে নিয়ম হলো— স্বামী যদি কথাটি বলার ঠিক ওই মুহূর্তেই (অতীত বা ভবিষ্যতের জন্য নয়) তাৎক্ষণিকভাবে তালাক কার্যকর করার সুদৃঢ় নিয়ত না করেন, তবে কোনো তালাক পতিত হয় না।

আপনার স্বামী ৪-৫ দিন পর নিজেই আবার স্বাভাবিক হয়ে যান, যা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে কথাগুলো তিনি নিছক রাগ মেটানো বা আপনাকে ধমক দেওয়ার জন্য বলেছিলেন, প্রকৃত তালাক দেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়। তদুপরি, "আমি তোমার সাথে সংসার করব না" বাক্যটি ভবিষ্যৎকালের একটি ওয়াদা বা হুমকি (الوعد بالطلاق), যার দ্বারা শরীয়তে কোনোভাবেই তালাক কার্যকর হয় না।

মনে মনে নিয়ত করার হুকুম: আপনি বলেছেন যে, সালিশের সময় তিনি নাকি মনে মনে আপনাকে না রাখার নিয়ত করেছিলেন। ইসলামী শরীয়তের অকাট্য বিধান হলো, মুখে তালাকের শব্দ (স্পষ্ট বা কিনায়া) উচ্চারণ করা ছাড়া শুধু মনে মনে তালাক দেওয়ার চিন্তা বা নিয়ত করলে—তাতে বিন্দুমাত্র কোনো তালাক পতিত হয় না।

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ عَنْ أُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا مَا لَمْ تَعْمَلْ أَوْ تَكَلَّمْ»

অর্থ: রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) ইরশাদ করেছেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতের মনের ওয়াসওয়াসা বা কল্পনাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না সে তা মুখে উচ্চারণ করে বা কাজে পরিণত করে।" (সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৫২৬৯)

وَلَوْ نَوَى الطَّلَاقَ بِقَلْبِهِ وَلَمْ يَتَلَفَّظْ بِهِ لَا يَقَعُ شَيْءٌ

অনুবাদ: "যদি কেউ শুধু অন্তরে তালাকের নিয়ত করে এবং মুখে কোনো শব্দ উচ্চারণ না করে, তবে কোনো তালাক পতিত হয় না।"

— (ফতোয়ায়ে আলমগীরী বা হিন্দিয়া: ১/৩৫৪; রদ্দুল মুহতার বা ফতোয়ায়ে শামী: ৩/২৩০)

২. কসম করে "তুই আমার জন্য হারাম হয়ে যাবি" বলার পর শারীরিক সম্পর্ক করার হুকুম

শরয়ী ফয়সালা: কোনো তালাক হয়নি, তবে কসম ভাঙার কারণে স্বামীর ওপর ‘কাফফারা’ ওয়াজিব হয়েছে

আপনার স্বামী বলেছিলেন: "আল্লাহর কসম, আমি যদি আজকের পর তোর শরীরে ধরি, তুই আমার জন্য হারাম হয়ে যাবি।"

ফিকহে হানাফীর বিধান অনুযায়ী, স্ত্রীকে ‘হারাম’ বলা একটি কিনায়া শব্দ। কেউ যদি তালাকের নিয়তে স্ত্রীকে হারাম বলে, তবে ১টি তালাকে বায়েন পতিত হয়। কিন্তু আপনার স্বামী কথাটির শুরুতে স্পষ্টভাবে "আল্লাহর কসম" (اليمين بالله) যুক্ত করেছেন এবং তার আগের-পরের আচরণ বলে দিচ্ছে যে তিনি তালাকের নিয়তে নয়, বরং নিছক রাগের মাথায় কসম করে আপনাকে ভয় দেখাতে চেয়েছিলেন।

যেহেতু তিনি পরের দিনই আপনার সাথে শারীরিক সম্পর্ক করেছেন, তাই তার দেওয়া শর্তটি ভঙ্গ হয়েছে এবং আল্লাহর নামে করা তার কসমটি ভেঙে গেছে। কসম ভেঙে ফেলার কারণে কোনো তালাক পতিত হয়নি ঠিকই, কিন্তু পবিত্র কুরআনের বিধান অনুযায়ী আপনার স্বামীর ওপর একটি শরয়ী জরিমানা বা ‘কাফফারাতুল ইয়ামীন’ আদায় করা ফরজ হয়ে গেছে।

হানাফী মাযহাবের প্রামাণ্য কিতাবের ইবারত:

وَلَوْ قَالَ لِامْرَأَتِهِ: أَنْتِ عَلَيَّ حَرَامٌ ... إِنْ نَوَى الطَّلَاقَ يَقَعُ بَائِنًا ... وَإِنْ لَمْ يَنْوِ الطَّلَاقَ أَوْ نَوَى الْيَمِينَ كَانَ يَمِينًا

অনুবাদ: "যদি স্বামী স্ত্রীকে বলে 'তুমি আমার ওপর হারাম'... তবে সে যদি তালাকের নিয়ত করে থাকে তবে এক তালাকে বায়েন পতিত হবে। আর যদি সে তালাকের নিয়ত না করে অথবা কসমের নিয়ত করে (যেমন আপনার স্বামী 'আল্লাহর কসম' বলেছে), তবে তা নিছক একটি কসম হিসেবে গণ্য হবে (এবং তা ভাঙলে কাফফারা দিতে হবে)।"

— (ফতোয়ায়ে আলমগীরী বা হিন্দিয়া: ১/৩৭৪; আল-হেদায়া: ২/৩৭৩; রদ্দুল মুহতার বা ফতোয়ায়ে শামী: ৩/২৯৬)

কসমের কাফফারা কী?
আল্লাহ তাআলা সূরা আল-মায়িদার ৮৯ নং আয়াতে কসম ভাঙার কাফফারা নির্ধারণ করেছেন। আপনার স্বামীকে এই তিনটির যেকোনো একটি কাজ করতে হবে:
১. ১০ জন মিসকিনকে (গরিব মানুষকে) দুই বেলা তৃপ্তি সহকারে খাবার খাওয়াতে হবে, অথবা
২. ১০ জন মিসকিনকে পরিধান করার মতো এক জোড়া করে সাধারণ কাপড় কিনে দিতে হবে, অথবা
৩. বর্তমান ফিতরার সমপরিমাণ টাকা ১০ জন গরিবকে সদকা করে দিতে হবে।
(আর যদি আর্থিক সামর্থ্য একেবারেই না থাকে, তবে তাকে একাধারে ৩ দিন রোজা রাখতে হবে)।

৩. আপনাদের বর্তমান সম্পর্ক এবং আপনার জন্য মানসিক ও শরয়ী নসীহত

বর্তমান সম্পর্ক: আপনাদের সম্পর্ক সম্পূর্ণ হালাল। কিন্তু স্বামীর এই আচরণ জঘন্য অপরাধ।

বোন ইয়াছমিন, আপনি নির্দ্বিধায় এবং নিশ্চিন্তে আপনার সংসার চালিয়ে যেতে পারেন, এখানে যিনা বা হারামের কোনো ভয় নেই। কিন্তু আপনি বলেছেন— "আমি আমার জামাইকে অনেক ভালোবাসি, উনি জানেন আমাকে যত কষ্ট বা আঘাতই দিক না কেন আমি যাব না, এ কারণে আরও বেশি বেশি এগুলো করে।"

আপনার জন্য আমাদের দ্বীনি পরামর্শ হলো:

  1. ইসলামে স্বামীকে ভালোবাসার কথা যেমন বলা হয়েছে, তেমনি নারীর আত্মমর্যাদাবোধ (Self-respect) বজায় রাখার কথাও বলা হয়েছে। স্বামী আপনার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মানসিকভাবে নির্যাতন (Emotional Abuse) করছেন। আপনি উনাকে পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিন যে, "আল্লাহর নামে কসম খাওয়া এবং কথায় কথায় সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা বলা শরীয়তে মারাত্মক কবিরা গুনাহ। তুমি আমার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আল্লাহর হুকুমের সাথে তামাশা করছ।" উনাকে এই ফতোয়াটি পড়ার সুযোগ করে দেবেন।
  2. উনাকে স্মরণ করিয়ে দিন, রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) বলেছেন: "তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার স্ত্রীর নিকট উত্তম।" (জামে তিরমিযী: ৩৮৯৫)। প্রবাস জীবনে থেকে স্ত্রীকে এমন মানসিক কষ্টে রাখা কোনো মুমিন স্বামীর কাজ হতে পারে না।
  3. আপনি নিজে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আদায় করুন, তাহাজ্জুদে উঠে আল্লাহর কাছে স্বামীর হেদায়েতের জন্য দোয়া করুন। আর অকারণে উনার এই ভিত্তিহীন ধমকগুলোতে ভয় পাওয়া বন্ধ করুন। আপনি শক্ত থাকলে উনি আস্তে আস্তে এই স্বভাব পরিবর্তন করতে বাধ্য হবেন ইনশাআল্লাহ।

সারসংক্ষেপ

  • মুখে তালাক উচ্চারণ না করে শুধু "চলে যাও" বা "সংসার করব না" বলা এবং মনে মনে নিয়ত করার দ্বারা কোনো তালাক পতিত হয়নি।
  • "আল্লাহর কসম... তুই আমার জন্য হারাম হয়ে যাবি" বলে পরের দিন শারীরিক সম্পর্ক করার কারণে কোনো তালাক হয়নি, তবে কসম ভাঙার অপরাধে স্বামীর ওপর ১০ জন মিসকিনকে খাওয়ানো বা সমপরিমাণ টাকা সদকা করা ওয়াজিব (কাফফারা) হয়েছে।
  • আপনাদের সংসার সম্পূর্ণ হালাল ও পবিত্র রয়েছে। অহেতুক দুশ্চিন্তা করে নিজের ঘুম নষ্ট করবেন না। আল্লাহ আপনার সহায় হোন।

প্রাতিষ্ঠানিক দায়মুক্তি (Disclaimer): প্রশ্নকারীর প্রদত্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কুরআন, সুন্নাহ ও হানাফী ফিকহের আলোকে এই শরয়ী সমাধান প্রদান করা হয়েছে। এটি একান্তই ধর্মীয় দিকনির্দেশনা ও পরকালীন আমলের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত; কোনো রাষ্ট্রীয় আদালত বা আইনি বিরোধের দলিল হিসেবে ব্যবহারযোগ্য নয়।

আল্লাহ তাআলা আপনার স্বামীর অন্তরে হেদায়েত ও মায়া সৃষ্টি করে দিন এবং আপনাদের দাম্পত্য জীবনকে সুখময় ও শান্তিময় করুন। (আমীন) আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।