প্রশ্ন: আসসালামু আলাইকুম। আমি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাই। আমার এক ফ্রেন্ড কলেজ লাইফে একটি হারাম সম্পর্কে (রিলেশনে) ছিল। তো একদিন মজায় মজায় ছেলেটার ফ্রেন্ড তাদের বিয়ের কথা বলে, তখন ছেলে ও মেয়ে দুজনেই হাসাহাসির মাঝখানে রাজি হয় এবং দুজনেই মুখে 'কবুল' বলে। দুজনেরই বয়স ১৭+ ছিল। সেখানে ছেলের ২ জন অ্যাডাল্ট ফ্রেন্ড (যাদের একজন কাজী সেজেছিল), এবং মেয়ের ১ জন ছেলে ফ্রেন্ড ও ১ জন মেয়ে ফ্রেন্ড ছিল। মেয়ের ছেলে ফ্রেন্ডকে মেয়ের বাবা বানানো হয়েছিল, যদিও তার সাথে কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই এবং মেয়ের আসল বাবার কোনো অনুমতিও নেওয়া হয়নি। অর্থাৎ কোনো প্ল্যানিং, প্রস্তাব বা আসল বাবা-মা/আত্মীয় ছাড়া তারা ফাইজলামি করে এভাবে বিয়ে করে। এখন ইসলামিক দিক দিয়ে এটি কি বিয়ে হিসেবে গণ্য হবে? আমি ওয়াজে শুনেছি যে, রক্তের বাবা বা অভিভাবক না থাকলে নাকি বিয়ে হয় না; আবার কেউ বলে শুধু কবুল বললেই বিয়ে হয়ে যায়। দয়া করে সঠিক ফতোয়া ও পরামর্শ দিন।
ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
সম্মানিতা বোন আলিফা, বর্তমান সময়ে কলেজ-ভার্সিটি পড়ুয়া তরুণ-তরুণীদের মাঝে আল্লাহর পবিত্র বিধান ‘নিকাহ’ বা বিবাহকে নিয়ে ফাইজলামি বা নাটক করার যে এক ভয়াবহ প্রবণতা তৈরি হয়েছে, আপনার প্রশ্নটি তারই একটি বাস্তব চিত্র। ইসলামী শরীয়তে বিবাহ কোনো খেলনা নয়; এটি ‘মীসাকান গালীযা’ বা আল্লাহর নামে নেওয়া এক সুদৃঢ় পবিত্র অঙ্গীকার।
পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবায়ে কেরামের ইজমা এবং আমাদের দেশে প্রচলিত হানাফী মাযহাবের আইম্মায়ে মুজতাহিদীনের অকাট্য ফিকহী মূলনীতির আলোকে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানাচ্ছি যে— ফাইজলামি বা হাসাহাসি করে হলেও, যেহেতু সেখানে উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে ছেলে ও মেয়ে উভয়ে মুখে ‘কবুল’ বলেছে, তাই শরীয়তের দৃষ্টিতে তাদের এই বিবাহটি শতভাগ সহীহ ও কার্যকর হয়ে গেছে! তারা বর্তমানে স্বামী-স্ত্রী।
কেন ওয়াজের কথার সাথে ফতোয়ার পার্থক্য হলো এবং কেন এই ফাইজলামির বিয়েটি কার্যকর হলো—তার নিখুঁত দালিলিক ফিকহী বিশ্লেষণ নিচে ধাপে ধাপে পেশ করা হলো:
ইসলামী শরীয়তে কয়েকটি বিষয় এতটাই সংবেদনশীল যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (صلى الله عليه وسلم) এগুলোতে কোনো প্রকার অভিনয়, জোকস বা ফাইজলামির সুযোগ রাখেননি। কেউ যদি মনের দিক থেকে সিরিয়াস না হয়ে, নিছক হাসাহাসি বা মজা করার ছলেও সাক্ষীদের সামনে বিয়ের ইজাব-কবুল পড়ে, তবে তা সাথে সাথেই বাস্তব বিয়ে হিসেবে কার্যকর হয়ে যায়।
হাদিস ও ফিকহের দলীল:
সহীহ হাদিসে রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ইরশাদ করেছেন:
অর্থ: "তিনটি বিষয় এমন, যেগুলো সিরিয়াসলি করলেও কার্যকর হয়, আর ফাইজলামি বা মজা (Hazl) করে করলেও তা কার্যকর (বাস্তব) হয়ে যায়: ১. বিবাহ, ২. তালাক এবং ৩. রুজু (স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়া)।"
— (জামে তিরমিযী, হাদিস নং: ১১৮৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ২১৯৪; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং: ২০৩৯)হানাফী মাযহাবের চূড়ান্ত ফতোয়া গ্রন্থ ‘রদ্দুল মুহতার’ (ফতোয়ায়ে শামী) এবং ‘আল-বাহরুর রায়েক’-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে:
অনুবাদ: "যে ব্যক্তি মজা বা ফাইজলামি করে (আল-হাযিল) বিবাহ করে, তার বিবাহও সংঘটিত হয়ে যায়... ওই হাদিসের কারণে যেখানে বলা হয়েছে: তিনটি বিষয় ফাইজলামি করে করলেও তা বাস্তব হয়ে যায়... কারণ সে সজ্ঞানে বিবাহের শব্দটি উচ্চারণ করেছে।"
— (রদ্দুল মুহতার বা ফতোয়ায়ে শামী: ৩/৯; ফতোয়ায়ে আলমগীরী বা হিন্দিয়া: ১/২৬৮; আল-বাহরুর রায়েক: ৩/৮৪)ইসলামী শরীয়তে বিবাহ সহীহ হওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো, ইজাব ও কবুল বলার সময় একই মজলিসে কমপক্ষে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম পুরুষ সাক্ষী (অথবা ১ জন পুরুষ ও ২ জন নারী সাক্ষী) উপস্থিত থাকতে হবে এবং নিজ কানে ইজাব-কবুল শুনতে হবে।
আপনার বর্ণিত ঘটনায়, ওই মজলিসে ছেলের ২ জন অ্যাডাল্ট ফ্রেন্ড এবং মেয়ের ১ জন ছেলে ফ্রেন্ড (মোট ৩ জন অ্যাডাল্ট পুরুষ) উপস্থিত ছিল এবং তারা নিজ কানে ছেলে-মেয়ের ‘কবুল’ বলা শুনেছে। শরীয়তের দৃষ্টিতে সাক্ষীদের রক্তের আত্মীয় হওয়া কোনো শর্ত নয়; যেকোনো প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম পুরুষই সাক্ষী হতে পারে। তাই এই বিয়ের সাক্ষীর শর্তটি পরিপূর্ণভাবে পূরণ হয়েছে।
অনুবাদ: "দুজন স্বাধীন, সুস্থমস্তিষ্ক, প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম (পুরুষ) সাক্ষীর উপস্থিতি ছাড়া বিবাহ সংঘটিত হয় না।"
— (আল-হেদায়া: ২/৩০৬, কিতাবুন নিকাহ)আপনি বলেছেন, "আমি ওয়াজে শুনছি যে রক্তের বাপ বা অভিভাবক না থাকলে নাকি বিয়ে হয় না।"
ফিকহী বিশ্লেষণ: আপনি ওয়াজে যা শুনেছেন তা শাফেয়ী, মালেকী ও হাম্বলী মাযহাবের ফতোয়া অথবা আহলে হাদিস আলেমদের বক্তব্য। কিন্তু বাংলাদেশসহ উপমহাদেশে সুন্নি মুসলমানগণ যে হানাফী মাযহাব (ইমাম আবু হানিফা রহ.) অনুসরণ করেন, তার ফতোয়াটি সম্পূর্ণ ভিন্ন! হানাফী ফিকহের অকাট্য বিধান হলো, কোনো মেয়ে যদি ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী ‘বালেগা’ বা প্রাপ্তবয়স্কা (বয়স ১৫ বছর বা তার বেশি) হয়ে যায়, তবে সে নিজেই নিজের বিবাহের পূর্ণ অধিকারিণী হয়ে যায়। তখন তার আসল পিতা উপস্থিত না থাকলেও বা অনুমতি না দিলেও, সে যদি দুজন সাক্ষীর সামনে নিজ মুখে কোনো ছেলেকে ‘কবুল’ বলে, তবে তার বিবাহ শতভাগ সহীহ হয়ে যাবে।
যেহেতু ওই মেয়ের বয়স ১৭+ (অর্থাৎ সে শরীয়তের দৃষ্টিতে একজন পূর্ণাঙ্গ প্রাপ্তবয়স্কা ও স্বাধীন নারী), তাই তার বিয়ে হওয়ার জন্য আসল পিতার অনুমতি শরয়ী শর্ত নয়। আর বন্ধুকে যে ভুয়া "বাবা" বানানো হয়েছিল, সেটি ফাইজলামি হলেও তা মূল বিবাহের কোনো ক্ষতি করবে না; কারণ মেয়েটি নিজেই যখন কবুল বলেছে, তখন আর কোনো বাবারই প্রয়োজন ছিল না!
হানাফী মাযহাবের প্রামাণ্য কিতাবসমূহের মূল আরবি ইবারত:
শায়খুল ইসলাম বুরহানুদ্দীন মারগীনানী (রহ.) তাঁর জগদ্বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-হেদায়া’-তে সুস্পষ্টভাবে লিখেছেন:
অনুবাদ: "স্বাধীন, প্রাপ্তবয়স্কা ও সুস্থমস্তিষ্কসম্পন্না নারী যদি নিজ সম্মতিতে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়, তবে তার বিবাহ সম্পূর্ণ সংঘটিত হয়ে যাবে; যদিও কোনো ওয়ালী (পিতা বা অভিভাবক) তার বিবাহ না পড়ায়। আর এটিই হলো ظاهر الرواية (সর্বোচ্চ নির্ভরযোগ্য বর্ণনা) অনুযায়ী ইমাম আবু হানিফা এবং ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর অকাট্য ফতোয়া।"
— (আল-হেদায়া: ২/৩১৩; বাদায়েউস সানায়ে: ২/২৪৭; ফতোয়ায়ে আলমগীরী: ১/২৮৭)(নোট: তবে অভিভাবককে না জানিয়ে গোপনে বা ফাইজলামি করে বিয়ে করা চরম গুনাহের কাজ এবং এটি পিতা-মাতার অধিকার ক্ষুণ্ণ করার শামিল। কিন্তু গুনাহ হলেও আইনিভাবে বিয়েটি সহীহ হয়ে যায়।)
অনেকে মনে করেন, কাজী অফিসে গিয়ে কাবিননামায় সাইন না করলে কিংবা দেনমোহর ধার্য না করলে বিয়ে হয় না। এটিও ভুল ধারণা।
প্রাতিষ্ঠানিক দায়মুক্তি (Disclaimer): প্রশ্নকারীর প্রদত্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কুরআন, সুন্নাহ ও হানাফী ফিকহের আলোকে এই শরয়ী সমাধান প্রদান করা হয়েছে। এটি একান্তই ধর্মীয় দিকনির্দেশনা ও পরকালীন আমলের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত; কোনো রাষ্ট্রীয় আদালত বা আইনি বিরোধের দলিল হিসেবে ব্যবহারযোগ্য নয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের যুবসমাজকে হারাম সম্পর্ক থেকে রক্ষা করুন এবং দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করুন। (আমীন) আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।
WhatsApp us