ইসলামিক প্রশ্নোত্তর - কাপড়ের ওপর দিয়ে স্পর্শ ও হুরমতে মুসাহারাতের শরয়ী বিধান
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيم

ফতোয়া ও মাসআলা বিভাগ

প্রশ্নকারী: Shafiullah

প্রশ্ন: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ। একটি মাসআলা সম্পর্কে হানাফি মাজহাবের নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহের আলোকে বিস্তারিত ফতোয়া জানার আবেদন করছি।
ঘটনার বিবরণ: যদি কোনো পুরুষ দিনের বেলায় গাড়িতে অথবা বাড়িতে এমন অবস্থায় কোনো নারীর সঙ্গে অসংগত আচরণ করে, যখন সেখানে অন্য লোকজনও উপস্থিত থাকে, অর্থাৎ তাদের নির্জনে মিলিত হওয়ার সুযোগ থাকে না এবং তারা উভয়েই নিশ্চিত থাকে যে, সেখানে তাদের পক্ষে সহবাস বা জিনায় লিপ্ত হওয়া সম্ভব নয়। এমন অবস্থায় পুরুষটি ওই নারীর পরিহিত কাপড়ের ওপর দিয়ে তার স্তন স্পর্শ করে ও চাপ দেয় এবং ওই নারীও পুরুষটির পরিহিত কাপড়ের ওপর দিয়ে তার লজ্জাস্থান স্পর্শ করে ও চাপ দেয়। এ সময় উভয়ের মযি (مذي) নির্গত হয়, কিন্তু কারও মনি (مني) নির্গত হয় না।
প্রশ্নসমূহ:
১. বর্ণিত ঘটনায় হানাফি মাজহাব অনুযায়ী হুরমতে মুসাহারাত সাব্যস্ত হবে কি না?
২. যদি হুরমতে মুসাহারাত সাব্যস্ত হয়, তাহলে ওই পুরুষের জন্য উক্ত নারীর মেয়েকে বিবাহ করা হারাম হবে কি না?

ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

সম্মানিত ভাই শফিউল্লাহ, আপনার প্রেরিত প্রশ্নটি ফিকহে হানাফীর অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সংবেদনশীল একটি অধ্যায়—যাকে ‘বাবু হুরমাতিল মুসাহারাহ’ (بَابُ حُرْمَةِ الْمُصَاهَرَةِ - বৈবাহিক বা স্পর্শজনিত কারণে বিবাহ নিষিদ্ধ হওয়ার অধ্যায়) বলা হয়। আপনি আপনার প্রশ্নে অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে চারটি ফিকহী অনুষঙ্গ (১. লোকজনের উপস্থিতি ও সহবাসের অসম্ভাব্যতা, ২. কাপড়ের ওপর দিয়ে স্পর্শ ও চাপ প্রদান, ৩. মযী নির্গত হওয়া এবং ৪. মনী নির্গত না হওয়া) উল্লেখ করেছেন।

পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীগণের আসার এবং হানাফী মাযহাবের আইম্মায়ে মুজতাহিদীনের অকাট্য ফিকহী মূলনীতির আলোকে আপনার প্রতিটি পয়েন্টের নিখুঁত বিশ্লেষণ এবং উভয় প্রশ্নের চূড়ান্ত ফয়সালা নিচে পর্যায়ক্রমে পেশ করা হলো:

১. লোকজনের উপস্থিতি ও সেখানে সহবাস অসম্ভব হওয়া কি হুরমতে মুসাহারাতের প্রতিবন্ধক?

প্রথমেই একটি তাত্ত্বিক বিভ্রান্তি দূর করা প্রয়োজন। অনেকে মনে করেন, কামভাবের সাথে স্পর্শ (الْمَسُّ بِشَهْوَةٍ) যেহেতু সহবাসের ভূমিকা বা মাধ্যম (داعية إلى الوطء) হওয়ার কারণে হুরমতে মুসাহারাত সৃষ্টি করে, তাই যেখানে লোকজনের উপস্থিতির কারণে সহবাস বা যিনায় লিপ্ত হওয়া অসম্ভব, সেখানে বোধহয় স্পর্শের দ্বারা হুরমতে মুসাহারাত সাব্যস্ত হবে না!

উসুলুল ফিকহ ও হানাফী মাযহাবের অকাট্য ফয়সালা হলো: এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। শরীয়তের হুকুম তার ‘হিকমত’ (অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞা)-এর ওপর ঘোরে না, বরং তার ‘ইল্লত’ বা ‘সবব’ (প্রত্যক্ষ কারণ)-এর ওপর ঘোরে (الْحُكْمُ يَدُورُ مَعَ عِلَّتِهِ لَا مَعَ حِكْمَتِهِ)। হানাফী ফিকহ অনুযায়ী, কামভাবের সাথে স্পর্শ করা স্বয়ং একটি স্বতন্ত্র সবব (কারণ)। তাই দিনের বেলায়, গাড়ির ভেতর কিংবা লোকারণ্য স্থানে সহবাস করা অসম্ভব হওয়া সত্ত্বেও যদি হুরমতে মুসাহারাতের শর্ত সাপেক্ষে স্পর্শ পাওয়া যায়, তবে নিঃসন্দেহে হুরমতে মুসাহারাত সাব্যস্ত হয়ে যাবে।

وَالْمَسُّ بِشَهْوَةٍ أُقِيمَ مَقَامَ الْوَطْءِ فِي إِثْبَاتِ الْحُرْمَةِ اِحْتِيَاطًا، وَلَا يُشْتَرَطُ فِيهِ الْخَلْوَةُ أَوْ إِمْكَانُ الْوَطْءِ فِي ذَلِكَ الْمَجْلِسِ

অনুবাদ: "সতর্কতামূলক বিধান হিসেবে হুরমত সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে কামভাবের সাথে স্পর্শকে সহবাসের স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে; আর এর জন্য নির্জনবাস (খলওয়াত) বা ওই মজলিসে সহবাস সম্ভব হওয়া মোটেও শর্ত নয়।"

— (বাদায়েউস সানায়ে: ২/২৬০; আল-মাবসূত লিস-সারাখসী: ৪/২০৫; রদ্দুল মুহতার বা ফতোয়ায়ে শামী: ৩/৩২)

২. ‘মযী’ (مذي) নির্গত হওয়া এবং ‘মনী’ (مني) নির্গত না হওয়ার ফিকহী প্রভাব

আপনার প্রশ্নে উল্লেখ করা হয়েছে যে, স্পর্শের সময় উভয়ের ‘মযী’ (কামোত্তেজনার কারণে নির্গত পাতলা পিচ্ছিল তরল) বের হয়েছে, কিন্তু কারও ‘মনী’ (বীর্যপাত) নির্গত হয়নি। ফিকহে হানাফীতে এর বিধান অত্যন্ত সুস্পষ্ট:

  • মনী (বীর্যপাত) নির্গত না হওয়া: হানাফী মাযহাবের মূলনীতি অনুযায়ী, স্পর্শের ফলে যদি মনী (বীর্যপাত/إنزال) হয়ে যায়, তবে হুরমতে মুসাহারাত সাব্যস্ত হয় না। কিন্তু যেহেতু এখানে কারও মনী নির্গত হয়নি, তাই হুরমতে মুসাহারাত বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার এই ব্যতিক্রমটি এখানে পাওয়া যায়নি।
  • মযী নির্গত হওয়া: মযী নির্গত হওয়া কোনোভাবেই হুরমতে মুসাহারাতের প্রতিবন্ধক নয়; বরং উভয়ের মযী নির্গত হওয়া অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, উভয়ের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ ‘শাহওয়াত’ (الشَّهْوَةُ - প্রবল যৌন কামভাব ও লিঙ্গোত্থান) বিদ্যমান ছিল।
وَحَدُّ الشَّهْوَةِ فِي الرَّجُلِ أَنْ تَنْتَشِرَ آلَتُهُ أَوْ تَزْدَادَ انْتِشَارًا ... وَلَوْ أَمْذَى تَثْبُتُ الْحُرْمَةُ، بِخِلَافِ مَا إِذَا أَنْزَلَ (أَيْ أَمْنَى)

অনুবাদ: "পুরুষের ক্ষেত্রে কামভাবের (শাহওয়াতের) সীমা হলো তার গোপনাঙ্গ উত্থিত হওয়া বা উত্থান বৃদ্ধি পাওয়া... আর স্পর্শের ফলে যদি ‘মযী’ নির্গত হয়, তবে হুরমত সাব্যস্ত হয়ে যাবে; পক্ষান্তরে ‘মনী’ (বীর্য) নির্গত হলে হুরমত সাব্যস্ত হয় না।"

— (ফতোয়ায়ে আলমগীরী বা হিন্দিয়া: ১/২৭৫; আল-বাহরুর রায়েক: ৩/১০০; রদ্দুল মুহতার: ৩/৩৩)

৩. ১নং প্রশ্নের মূল ফয়সালা: পরিহিত কাপড়ের ওপর দিয়ে স্পর্শ ও চাপ দেওয়ার হুকুম

হুরমতে মুসাহারাত সাব্যস্ত হওয়া বা না হওয়ার চূড়ান্ত মাপকাঠি (مَنَاطُ الْحُكْمِ) হলো কাপড়ের পুরুত্ব!

সম্মানিত প্রশ্নকারী, আপনার পুরো ঘটনার ফয়সালাটি ঝুলে আছে একটিমাত্র বিষয়ের ওপর—আর তা হলো ‘পরিহিত কাপড়ের ওপর দিয়ে স্পর্শ করা’ (الْمَسُّ مِنْ وَرَاءِ الْحَائِلِ)।

সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.), হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রা.), তাবেয়ী ইমাম ইবরাহীম নাখয়ী (রহ.) এবং হানাফী মাযহাবের ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর চূড়ান্ত ফতোয়া অনুযায়ী— সরাসরি চামড়ায় চামড়ায় স্পর্শ না হয়ে যদি মাঝখানে কাপড়ের আবরণ (حَائِل) থাকে, তবে সেখানে চাপ দেওয়ার কারণে অঙ্গের আকার বা নরম ভাব অনুভূত হওয়া ধর্তব্য নয়; বরং একমাত্র মাপকাঠি হলো হাতের তালুতে শরীরের স্বাভাবিক তাপ বা উষ্ণতা (حَرَارَةُ الْبَدَنِ) পৌঁছানো!

হানাফী মাযহাবের সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাবসমূহের মূল আরবি ইবারত ও দলীলসমূহ লক্ষ্য করুন:

১. শায়খুল ইসলাম বুরহানুদ্দীন মারগীনানী (রহ.) বিশ্ববিখ্যাত ফিকহ গ্রন্থ ‘আল-হেদায়া’-তে উল্লেখ করেছেন:

وَمَنْ مَسَّ امْرَأَةً بِشَهْوَةٍ حَرُمَتْ عَلَيْهِ أُمُّهَا وَابْنَتُهَا ... ثُمَّ إِنْ مَسَّهَا مِنْ وَرَاءِ ثَوْبٍ صَفِيقٍ لَا تَصِلُ حَرَارَةُ بَدَنِهَا إِلَى يَدِهِ لَا تَثْبُتُ الْحُرْمَةُ، وَإِنْ كَانَ رَقِيقًا تَصِلُ الْحَرَارَةُ إِلَى يَدِهِ تَثْبُتُ

অনুবাদ: "যে ব্যক্তি কোনো নারীকে কামভাবের সাথে স্পর্শ করল, তার ওপর ওই নারীর মা এবং মেয়ে হারাম হয়ে যাবে... অতঃপর সে যদি ওই নারীকে এমন মোটা কাপড়ের ওপর দিয়ে স্পর্শ করে, যার কারণে নারীর শরীরের উষ্ণতা (তাপ) তার হাতে পৌঁছায় না, তবে হুরমতে মুসাহারাত সাব্যস্ত হবে না। আর যদি কাপড় এতটা পাতলা হয় যে শরীরের উষ্ণতা তার হাতে পৌঁছায়, তবে হুরমতে মুসাহারাত সাব্যস্ত হয়ে যাবে।"

— (আল-হেদায়া মাআ ফাতহিল কাদীর: ৩/২২০, ফাসলুন ফীল মুহাররামাত)

২. ‘ফতোয়ায়ে আলমগীরী’ (হিন্দিয়া) গ্রন্থে এই মাসআলাটি আরও স্পষ্টভাবে এসেছে:

ثُمَّ الْمَسُّ إِنَّمَا يُوجِبُ حُرْمَةَ الْمُصَاهَرَةِ إِذَا لَمْ يَكُنْ بَيْنَهُمَا ثَوْبٌ، أَمَّا إِذَا كَانَ بَيْنَهُمَا ثَوْبٌ فَإِنْ كَانَ صَفِيقًا لَا يَجِدُ الْمَاسُّ حَرَارَةَ الْمَمْسُوسِ لَا تَثْبُتُ حُرْمَةُ الْمُصَاهَرَةِ وَإِنِ انْتَشَرَتْ آلَتُهُ بِذَلِكَ، وَإِنْ كَانَ رَقِيقًا تَصِلُ حَرَارَةُ الْمَمْسُوسِ إِلَى يَدِهِ تَثْبُتُ، كَذَا فِي الذَّخِيرَةِ. وَكَذَا لَوْ مَسَّتْ هِيَ بِشَهْوَةٍ فَتَعَلَّقَ الْحُكْمُ بِمَسِّهَا

অনুবাদ: "স্পর্শ কেবল তখনই হুরমতে মুসাহারাত ওয়াজিব করে যখন উভয়ের মাঝে কোনো কাপড় থাকে না। কিন্তু যদি উভয়ের মাঝে কাপড় থাকে—তবে কাপড়টি যদি এমন পুরু/মোটা হয় যে স্পর্শকারী স্পর্শকৃত অঙ্গের উষ্ণতা (তাপ) অনুভব করে না, তাহলে হুরমতে মুসাহারাত সাব্যস্ত হবে না, যদিও এর কারণে পুরুষের লিঙ্গোত্থান ঘটে (বা মযী বের হয়)! আর যদি কাপড়টি এমন পাতলা হয় যে অঙ্গের উষ্ণতা তার হাতে পৌঁছায়, তবে হুরমতে মুসাহারাত সাব্যস্ত হবে; এমনটিই রয়েছে ‘আয-যাখীরাহ’ গ্রন্থে। আর অনুরূপভাবে নারীও যদি কামভাবের সাথে পুরুষকে স্পর্শ করে, তবে নারীর স্পর্শের ক্ষেত্রেও হুবহু একই বিধান প্রযোজ্য হবে।"

— (ফতোয়ায়ে আলমগীরী বা হিন্দিয়া: ১/২৭৫; তাবঈনুল হাকায়েক লিল-যায়লায়ী: ২/১০৬)

৩. খাতামুল মুহাক্কিকীন আল্লামা ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) ‘রদ্দুল মুহতার’ (ফতোয়ায়ে শামী)-তে লিখেছেন:

(قَوْلُهُ: بِحَائِلٍ لَا يَمْنَعُ الْحَرَارَةَ) فَلَوْ كَانَ يَمْنَعُهَا لَا تَثْبُتُ الْحُرْمَةُ ... وَإِنْ أَحَسَّ بِحَجْمِ الْعُضْوِ عِنْدَ الْغَمْزِ

অনুবাদ: "যদি মাঝখানের আবরণ (কাপড়) শরীরের তাপ পৌঁছাতে বাধা দেয়, তবে হুরমতে মুসাহারাত সাব্যস্ত হবে না... যদিও চাপ দেওয়ার (গাময) কারণে অঙ্গের আকার বা গঠন অনুভূত হয়।"

— (রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার [ফতোয়ায়ে শামী]: ৩/৩২, মাতনুদ দুররিল মুখতারসহ)

৪. ২নং প্রশ্নের উত্তর: উক্ত নারীর মেয়েকে বিবাহ করার বিধান কী? (দুটি সুনির্দিষ্ট সুরত)

উপরোক্ত অকাট্য ফিকহী দলীলের আলোকে আপনার ১নং ও ২নং প্রশ্নের চূড়ান্ত ফয়সালাটি নিচের দুটি অবস্থার ওপর নির্ভরশীল:

প্রথম অবস্থা: যদি কাপড় মোটা হয়ে থাকে (যাতে শরীরের তাপ হাতে লাগেনি)

যদি ওই নারীর বুকের ওপর একাধিক কাপড় (যেমন: বোরকা, ওড়না, জামা বা অন্তর্বাস) কিংবা এমন মোটা কাপড় ছিল যার কারণে পুরুষটির হাতের তালুতে স্তনের চামড়ার সরাসরি তাপ বা উষ্ণতা অনুভূত হয়নি; এবং একইসাথে পুরুষটির পরনেও এমন মোটা কাপড় (যেমন: প্যান্ট, পায়জামা বা একাধিক কাপড়) ছিল যার কারণে নারীর হাতের তালুতে পুরুষের লজ্জাস্থানের সরাসরি তাপ বা উষ্ণতা পৌঁছায়নি (কেবল চাপ দেওয়ার কারণে অঙ্গের শক্ত বা নরম ভাব অনুভূত হয়েছে এবং মযী বের হয়েছে)—
ফয়সালা: তবে হানাফী মাযহাব অনুযায়ী এক্ষেত্রে ‘হুরমতে মুসাহারাত’ সাব্যস্ত হয়নি। আর হুরমতে মুসাহারাত সাব্যস্ত না হওয়ার কারণে ওই পুরুষের জন্য উক্ত নারীর মেয়েকে বিবাহ করা হারাম হবে না; বরং বিবাহ করা সম্পূর্ণ জায়েজ ও সহীহ হবে।

দ্বিতীয় অবস্থা: যদি কাপড় পাতলা হয়ে থাকে (যাতে শরীরের তাপ হাতে লেগেছে)

কিন্তু যদি উভয় স্পর্শের মধ্যে যেকোনো একটি স্পর্শের ক্ষেত্রেও (হয়তো পুরুষটি যখন নারীর স্তন স্পর্শ করেছে তখন নারীর কাপড় পাতলা এক স্তরের ছিল, অথবা নারীটি যখন পুরুষের লজ্জাস্থান স্পর্শ ও চাপ দিয়েছে তখন পুরুষের পরনে পাতলা লুঙ্গি বা পাতলা ট্রাউজার ছিল) কাপড় এতটা পাতলা হয়ে থাকে যে, কাপড়ের ওপর দিয়েই হাতের তালুতে অপরজনের অঙ্গের চামড়ার স্বাভাবিক উষ্ণতা বা গরম ভাব (حَرَارَةُ الْبَدَنِ) স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়েছে—
ফয়সালা: তবে হানাফী মাযহাবের অকাট্য ফতোয়া অনুযায়ী সাথে সাথে ‘হুরমতে মুসাহারাত’ সাব্যস্ত হয়ে গেছে। আর হুরমতে মুসাহারাত সাব্যস্ত হয়ে গেলে কুরআনুল কারীমের আয়াত (وَأُمَّهَاتُ نِسَائِكُمْ وَرَبَائِبُكُمُ اللَّاتِي فِي حُجُورِكُم - সূরা নিসা: ২৩) এবং হানাফী ফিকহের বিধান অনুযায়ী, ওই পুরুষের জন্য উক্ত নারীর মেয়েকে বিবাহ করা চিরতরে হারাম (অবৈধ) হয়ে যাবে।

৫. তওবা ও শরয়ী সতর্কবার্তা

হুরমতে মুসাহারাত সাব্যস্ত হোক বা না হোক—গাইরে মাহরাম নারী-পুরুষের এভাবে পরস্পরের স্পর্শকাতর অঙ্গে হাত দেওয়া, চাপ দেওয়া এবং মযী নির্গত করার এই কাজটি ইসলামী শরীয়তে অত্যন্ত জঘন্য কবিরা গুনাহ এবং ‘যিনাল ইয়াদ’ (হাতের ব্যভিচার)। সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) ইরশাদ করেছেন:

وَالْيَدَانِ تَزْنِيَانِ فَزِنَاهُمَا الْبَطْشُ

"দুই হাতও ব্যভিচার করে, আর হাতের ব্যভিচার হলো (নিষিদ্ধ অঙ্গ) স্পর্শ করা ও ধরা।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৬৫৭)

সুতরাং, সংশ্লিষ্ট পুরুষ ও নারী উভয়কেই আল্লাহ তাআলার দরবারে লজ্জিত হয়ে খাঁটি অন্তরে তওবা (তওবাতুন নাসুহা) ও ইস্তিগফার করতে হবে এবং ভবিষ্যতে ওই নারীর সাথে পর্দা ও সম্পূর্ণ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।

এক নজরে উভয় প্রশ্নের চূড়ান্ত সারসংক্ষেপ

  1. লোকজনের উপস্থিতি, সেখানে সহবাস অসম্ভব হওয়া কিংবা মনী বের না হয়ে শুধু ‘মযী’ বের হওয়া—এগুলোর কোনোটিই হুরমতে মুসাহারাত সাব্যস্ত হওয়ার পথে বাধা নয়; বরং মযী বের হওয়া কামভাবের (শাহওয়াতের) অকাট্য প্রমাণ।
  2. ১নং প্রশ্নের উত্তর: উভয়ের পরনের কাপড় যদি এমন মোটা হয়ে থাকে যে স্পর্শ করার সময় কারও হাতেই অপরজনের শরীরের তাপ (উষ্ণতা) লাগেনি, তবে হুরমতে মুসাহারাত সাব্যস্ত হয়নি। কিন্তু যেকোনো একজনের কাপড়ও যদি এতটা পাতলা হয়ে থাকে যে হাতে শরীরের তাপ অনুভূত হয়েছে, তবে হুরমতে মুসাহারাত সাব্যস্ত হয়ে গেছে।
  3. ২নং প্রশ্নের উত্তর: কাপড় মোটা হওয়ার কারণে যদি হুরমতে মুসাহারাত সাব্যস্ত না হয়ে থাকে, তবে ওই নারীর মেয়েকে বিবাহ করা জায়েজ হবে। আর যদি পাতলা কাপড়ের মধ্য দিয়ে শরীরের উষ্ণতা অনুভূত হওয়ার কারণে হুরমতে মুসাহারাত সাব্যস্ত হয়ে থাকে, তবে ওই নারীর মেয়েকে বিবাহ করা চিরতরে হারাম হবে। (সন্দেহ থাকলে তাকওয়ার দাবি হলো এমন স্থানে বিবাহ করা থেকে বিরত থাকা)।

প্রাতিষ্ঠানিক দায়মুক্তি (Disclaimer): প্রশ্নকারীর প্রদত্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কুরআন, সুন্নাহ ও হানাফী ফিকহের আলোকে এই শরয়ী সমাধান প্রদান করা হয়েছে। এটি একান্তই ধর্মীয় দিকনির্দেশনা ও পরকালীন আমলের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত; কোনো রাষ্ট্রীয় আদালত বা আইনি বিরোধের দলিল হিসেবে ব্যবহারযোগ্য নয়।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে শয়তানের ধোঁকা ও হারাম সংস্পর্শ থেকে বেঁচে থাকার এবং শরীয়তের সীমারেখা মেনে চলার তৌফিক দান করুন। (আমীন) আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।