প্রশ্ন: আমার নাম আব্দুল্লাহ। বয়স ৩২। আমি একজন নওমুসলিম। ৮/৯ বছর আগে একজন মুসলিম মেয়েকে বিয়ে করে মুসলমান হই। আমাদের একটি ছেলে আছে, তার বয়স ৭ বছর। আমার বাবা-মা উভয়ই মারা গেছেন। আমার কোনো ভাই নেই, এক বোন আছে, তার সাথে কোনো যোগাযোগ হয় না। আমার স্ত্রীর পরিবারই আমার পরিবার, তারা ছাড়া আমার কেউ নেই। বিয়ের বছর দুয়েক পর থেকে আমাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে টুকটাক ঝগড়া লেগেই থাকতো। সর্বশেষ আমার স্ত্রী ঝগড়া করে বাবার বাসায় চলে যাওয়ার পর আমি মাফ চাইলে, তারা আমাকে শর্ত দেয় চিল্লা দিয়ে আসতে, খরচাদি তারাই দিবে, যেহেতু আমি বেকার। কথামতো আমি চিল্লাতে যাই, কিন্তু এক মাসের মাথায় একদিন আমার স্ত্রীর সাথে ফোনে কথা বলার সময় কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে রাগে তাকে বলে ফেলি— "তোকে আমি তালাক দিলাম। আজ থেকে তুই আমার বউ না। এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক।" আমি যেহেতু হিন্দু থেকে মুসলিম হয়েছি, তাই আমার তেমন দ্বীন শেখা হয়নি। অজ্ঞতা আর রাগে এমন বলে ফেলেছি। কিন্তু এখন জানতে পারলাম সত্যি সত্যি তালাক হয়ে গেছে। এখন তো আমার মারা যাওয়ার অবস্থা। বাচ্চার ভবিষ্যৎ চিন্তা, তাছাড়া তারা ছাড়া আমার যাওয়ার কোনো আশ্রয়ও নাই। আমি কোথায় যাবো, কার কাছে যাবো? মনে হচ্ছে মরে যাই। এমতাবস্থায় আমার জন্য কি সহজ শরয়ী কোনো সমাধান নাই, যেন আমরা আগের মতো সংসার করতে পারি এবং আমার বাচ্চাটার জীবনটাও নষ্ট না হয়?
ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রিয় দ্বীনি ভাই আব্দুল্লাহ (আনোয়ার হোসেন), আপনার জীবনকাহিনী এবং বর্তমানের চরম অসহায়ত্বের বর্ণনা পড়ে আমরা অত্যন্ত ব্যথিত ও সমব্যথী। শিরক ও কুফরের অন্ধকার ছেড়ে আপনি যে মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (صلى الله عليه وسلم)-এর দ্বীনে আশ্রয় নিয়েছেন, সেজন্য আল্লাহর দরবারে আপনার মর্যাদা অত্যন্ত উঁচু। মনে রাখবেন, দুনিয়াতে আপনার মা-বাবা বা রক্তের ভাই না থাকলেও স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আপনার অভিভাবক এবং পৃথিবীর প্রতিটি মুসলমান আপনার ঈমানী ভাই।
তবে প্রিয় ভাই, ইসলামী শরীয়তের বিধানসমূহ (বিশেষ করে হালাল ও হারামের সীমারেখা) এতটাই অকাট্য যে, কোনো মানুষের চরম বিপদ, দারিদ্র্য বা আবেগের কারণে মুফতিগণ নিজেদের পক্ষ থেকে আল্লাহর আইন পরিবর্তন করে হারামকে হালাল ফতোয়া দেওয়ার অধিকার রাখেন না। পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবায়ে কেরামের ইজমা এবং হানাফী মাযহাবের আইম্মায়ে মুজতাহিদীনের অকাট্য ফিকহী মূলনীতির আলোকে আপনার ঘটনার প্রকৃত শরয়ী হুকুম এবং এই ভয়াবহ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আপনার বাস্তবিক ও দ্বীনি করণীয় নিচে অত্যন্ত দরদের সাথে তুলে ধরা হলো:
আপনি ফোনে আপনার স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে অত্যন্ত সুস্পষ্ট শব্দে বলেছেন: “তোকে আমি তালাক দিলাম। আজ থেকে তুই আমার বউ না। এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক।”
ইসলামী শরীয়তে একজন স্বাধীন মুসলিম স্বামীর হাতে তার স্ত্রীর ওপর সর্বোচ্চ ৩টি তালাকের অধিকার থাকে। যখন কেউ সরাসরি বা ফোনে স্ত্রীকে লক্ষ্য করে একসাথে তিনবার সুস্পষ্ট তালাকের শব্দ (‘তালাকে সরীহ’) উচ্চারণ করে, তখন খুলাফায়ে রাশেদীন, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন এবং ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)—চার মাযহাবের সকল ইমামের ঐকমত্যে (ইজমা) স্ত্রীর ওপর তিনটি তালাকই (তালাকে মুগাল্লাযা বা চূড়ান্ত তালাক) পতিত হয়ে যায়। এর ফলে সাথে সাথেই আপনাদের বিবাহ বন্ধন চূড়ান্তভাবে ভেঙে গেছে এবং বর্তমানে সাধারণভাবে নতুন করে বিয়ে বা রুজু করে আগের মতো সংসার করার কোনো শরয়ী অবকাশ আর বাকি নেই।
পবিত্র কুরআন, হাদিস ও ইজমার অকাট্য দলীল:
মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে তালাকের চূড়ান্ত সীমা নির্ধারণ করে ইরশাদ করেছেন:
অর্থ: "(ফিরিয়ে নেওয়ার যোগ্য) তালাক দুইবার। অতঃপর হয়তো বিধিমতো রাখবে, নতুবা সদয়ভাবে মুক্ত করে দেবে... অতঃপর সে যদি তাকে (তৃতীয়) তালাক দেয়, তবে সে নারী তার জন্য আর হালাল হবে না, যে পর্যন্ত না সে অন্য কোনো স্বামীর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়... আর এগুলো হলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা, যা তিনি জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন।"
— (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২২৯-২৩০)সহীহ বুখারী ও সুনানে আবী দাউদে উওয়াইমির আল-আজলানী (রা.) এবং ফাতিমা বিনতে কায়েস (রা.)-এর হাদিসসহ অসংখ্য আসারে প্রমাণিত যে, এক মজলিসে প্রদত্ত তিন তালাক দ্বারা বৈবাহিক সম্পর্ক চিরতরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ইমাম শামসুদ্দীন সারাখসী হানাফী (রহ.) তাঁর ‘আল-মাবসূত’ গ্রন্থে এবং ইমাম কাসানী হানাফী (রহ.) ‘বাদায়েউস সানায়ে’-তে উল্লেখ করেছেন:
অনুবাদ: "যে ব্যক্তি তার স্ত্রীকে একই মজলিসে এক বাক্যে অথবা পৃথক পৃথক বাক্যে (যেমন: এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক বলে) তিন তালাক প্রদান করে, আমাদের (হানাফী মাযহাবের) নিকট এবং সাধারণভাবে সকল সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন ও চার মাযহাবের ইমামগণের নিকট তিনটি তালাকই পতিত হয়ে যায়।"
— (আল-মাবসূত লিস-সারাখসী: ৬/৩; বাদায়েউস সানায়ে: ৩/৯৪; আল-হেদায়া: ২/৩৫৫)প্রিয় ভাই, আপনি উল্লেখ করেছেন যে আপনি হিন্দু থেকে মুসলিম হয়েছেন (৮-৯ বছর পূর্বে) এবং আপনার তেমন দ্বীন শেখা হয়নি; তাই অজ্ঞতা ও রাগের মাথায় কথাটি বলে ফেলেছেন। এ বিষয়ে ফিকহে হানাফীর বিধানটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বুঝে নেওয়া প্রয়োজন:
হানাফী মাযহাবের শ্রেষ্ঠ ফতোয়া গ্রন্থ ‘রদ্দুল মুহতার’ (ফতোয়ায়ে শামী) এবং ‘ফতোয়ায়ে আলমগীরী’-তে এই মূলনীতিটি দ্ব্যর্থহীনভাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে:
অনুবাদ: "দারুল ইসলামে (মুসলিম দেশে) শরয়ী হুকুম না জানাটা কোনো ওজর (অজুহাত) হিসেবে গণ্য হয় না... আর যদি কোনো ব্যক্তি বলে: 'আমি জানতাম না যে আমার বলা এই কথা দ্বারা তালাক পতিত হয়ে যাবে (বা স্ত্রী হারাম হয়ে যাবে)'—তবুও কাজীর আদালতে এবং আল্লাহর কাছে (দিয়ানাতান) উভয় ক্ষেত্রেই তালাক পতিত হয়ে যাবে, যতক্ষণ সে জানে যে ‘তালাক’ শব্দটি বিবাহ বিচ্ছেদের জন্যই নির্ধারিত।"
— (রদ্দুল মুহতার বা ফতোয়ায়ে শামী: ৩/২৪৮ ও ৪/২৩১; ফতোয়ায়ে আলমগীরী বা হিন্দিয়া: ১/৩৫৩; আল-বাহরুর রায়েক: ৩/২৬৫)আপনি বলেছেন, "এখন তো আমার মারা যাওয়ার অবস্থা... আমি কোথায় যাবো, কার কাছে যাবো? মনে হচ্ছে মরে যাই।"
প্রিয় ভাই, বুকে হাত রেখে ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করুন—আপনি আপনার মা-বাবা, পূর্বপুরুষের ধর্ম ও সমাজ ত্যাগ করে কেন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন? শুধুমাত্র জান্নাত পাওয়ার জন্য এবং জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্যই তো, তাই না? আজ একটি ভুলের কারণে বা দুনিয়ার আশ্রয় হারানোর ভয়ে যদি আপনি আত্মহত্যার মতো মহাপাপের চিন্তা করেন কিংবা হারাম পথে (তিন তালাকের পরও অবৈধভাবে) সংসার করার চিন্তা করেন, তবে তো আপনার এই ৮-৯ বছরের ঈমানের কুরবানি শয়তান নষ্ট করে ফেলবে!
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে অত্যন্ত মায়ার সাথে মুমিনদেরকে আত্মহত্যা ও হতাশা থেকে নিষেধ করে ইরশাদ করেছেন:
অর্থ: "আর তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।"
— (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ২৯)এবং তালাকের আয়াতসমূহের ঠিক শুরুতেই আল্লাহ তাআলা ওয়াদা করেছেন যে, যে ব্যক্তি তালাকের ব্যাপারে আল্লাহর সীমারেখা মেনে চলবে এবং তাকওয়া অবলম্বন করবে, তার কোনো আশ্রয় না থাকলেও স্বয়ং আল্লাহ তার আশ্রয় ও রিজিকের ব্যবস্থা করে দেবেন:
অর্থ: "আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে (শরীয়তের সীমারেখা মেনে চলে), আল্লাহ তার জন্য (বিপদ থেকে) উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিযিক দান করেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না। আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট।"
— (সূরা আত-তালাক, আয়াত: ২-৩)সাহাবী হযরত সালমান ফারসী (রা.) ও হযরত সুহাইব রুমী (রা.) যখন নওমুসলিম হয়ে মদিনায় এসেছিলেন, তখন তাদের মা-বাবা, ঘরবাড়ি, টাকা-পয়সা বা আত্মীয়স্বজন বলতে কেউই ছিল না; মসজিদে নববীর বারান্দাই (আসহাবে সুফফা) ছিল তাদের ঠিকানা। কিন্তু তারা আল্লাহর হুকুমের ওপর সবর করেছিলেন বলে আল্লাহ তাদের দুনিয়া ও আখেরাতের বাদশাহী দান করেছিলেন।
এই কঠিন মুহূর্তে আপনাকে আবেগতাড়িত না হয়ে নিচের পদক্ষেপগুলো অত্যন্ত ধৈর্য ও হিকমতের সাথে গ্রহণ করতে হবে:
প্রাতিষ্ঠানিক দায়মুক্তি (Disclaimer): প্রশ্নকারীর প্রদত্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কুরআন, সুন্নাহ ও হানাফী ফিকহের আলোকে এই শরয়ী সমাধান প্রদান করা হয়েছে। এটি একান্তই ধর্মীয় দিকনির্দেশনা ও পরকালীন আমলের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত; কোনো রাষ্ট্রীয় আদালত বা আইনি বিরোধের দলিল হিসেবে ব্যবহারযোগ্য নয়।
আল্লাহ তাআলা আপনার অন্তরে প্রশান্তি ও সবর দান করুন, আপনার জন্য উত্তম আশ্রয় ও হালাল রিজিকের ফয়সালা করুন এবং আপনার সন্তানের ভবিষ্যৎ সুন্দর করুন। (আমীন) আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।
WhatsApp us