প্রশ্ন: সম্মানিত হুজুর, আমার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা জানার ছিল। আমার স্ত্রীর আগে অন্য একজনের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল। সেই বিয়ের প্রায় তিন বছর পর আমাকে জানানো হয় যে তার আগের বিয়ে শেষ হয়ে গেছে। এই কথা বিশ্বাস করে আমি তাকে বিয়ে করি। আমাদের বিয়ের পর প্রায় সাড়ে আট বছর সংসার হয়েছে। কিছুদিন আগে আমরা তার আগের বিয়ের তালাকের কাগজপত্র খুঁজতে গিয়ে জানতে পারি তার আগের স্বামী নাকি তালাকের কোনো কাগজপত্র দেয়নি। আমার স্ত্রীর দাদা মারা যাওয়ার কারণে কাগজপত্রের বিষয়টি পরিষ্কারভাবে জানা যাচ্ছিল না। পরে পরিবারের পক্ষ থেকে আমাদের বলা হয়, কাগজপত্রের মাধ্যমে বিষয়টি শেষ করে নিতে। এরপর আমরা কাগজপত্রের মাধ্যমে তালাকের বিষয়টি সম্পন্ন করি এবং তালাক গ্রহণ করার এক দিন পর আবার আমরা বিয়ে করি। এখন আমার প্রশ্ন হলো:
১. এক দিন পরে আবার আমরা বিয়ে করি—এখন আমার বিয়েটা কি সঠিক হয়েছে, নাকি তিন মাস ইদ্দত পালন করার পরে আবার বিয়ে করতে হবে?
২. আমরা না জেনে প্রায় সাড়ে আট বছর সংসার করেছি। এ ক্ষেত্রে আমাদের কোনো গুনাহ হয়েছে কি?
৩. এখন আগের বিয়ের তালাকের বিষয়টি সম্পন্ন হওয়ার পর, আমাদের কি নতুন করে নিকাহ পড়াতে হবে?
৪. আমাদের ঘরে সন্তান রয়েছে। এই অবস্থায় শরিয়ত অনুযায়ী আমাদের করণীয় কী?
ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
সম্মানিত ভাই আহমেদ, আপনার দীর্ঘ সাড়ে আট বছরের সংসার জীবন এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনি যে জটিল পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন, তা অত্যন্ত সংবেদনশীল। তবে সত্য জানার পর তা গোপন না করে শরীয়তের বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করার জন্য আপনার এই প্রচেষ্টা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবায়ে কেরামের ইজমা এবং হানাফী মাযহাবের আইম্মায়ে মুজতাহিদীনের ফিকহী মূলনীতির আলোকে আপনার ৪টি প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট ও দালিলিক সমাধান নিচে পর্যায়ক্রমে পেশ করা হলো:
উত্তরের গভীরে যাওয়ার আগে ইসলামী শরীয়তের একটি মৌলিক পার্থক্য বুঝে নেওয়া আবশ্যক। ইসলামে তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য সরকারি বা কাজী অফিসের লিখিত কাগজ থাকা শর্ত নয়; স্বামী মুখে তালাক উচ্চারণ করলেও শরীয়তের দৃষ্টিতে তালাক হয়ে যায়। তাই এখানে দুটি অবস্থা হতে পারে:
প্রথম স্বামী যদি পূর্বে তালাক না দিয়ে থাকেন এবং তার সাথে ওই নারীর পূর্বে দাম্পত্য মিলন (সহবাস বা খলওয়াতে সহীহা) হয়ে থাকে, তবে সম্প্রতি যখন প্রথম স্বামী তালাকনামায় স্বাক্ষর করে তালাক দিয়েছেন, ঠিক তখন থেকেই ওই নারীর ওপর প্রথম স্বামীর তালাকের ইদ্দত (পূর্ণ ৩টি হায়েজ বা মাসিক ঋতুস্রাব) পালন করা ফরজ হয়ে গেছে। প্রথম স্বামী ১০-১১ বছর ধরে আলাদা থাকলেও তালাক যেদিন হয়েছে, ইদ্দত সেদিন থেকেই শুরু হয়।
আর ইদ্দত চলাকালীন (মাত্র ১ দিন পর) কোনো নারীর জন্য অন্য কারো সাথে (এমনকি আপনার সাথেও) বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া কুরআনুল কারীমের সুস্পষ্ট আয়াত ও ইজমা অনুযায়ী নিষিদ্ধ এবং এই বিবাহটি ‘ফাসিদ’ (অবৈধ/অকার্যকর) হয়েছে। (তবে প্রথম স্বামীর সাথে বিয়ের পর যদি কখনোই তাদের দেখা-সাক্ষাৎ বা নির্জনবাস না হয়ে থাকে, কেবল সেক্ষেত্রেই তালাকের পর কোনো ইদ্দত নেই এবং ১ দিন পর বিয়ে সহীহ হয়—সূরা আহযাব: ৪৯)।
কুরআন ও হানাফী ফিকহের অকাট্য দলীল:
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইদ্দতের সময়কাল এবং ইদ্দত শেষ হওয়ার পূর্বে বিবাহ নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়ে ইরশাদ করেছেন:
অর্থ: "আর তালাকপ্রাপ্তা নারীরা তিন হায়েয (ঋতুস্রাব) পর্যন্ত নিজেদেরকে অপেক্ষায় রাখবে... এবং ইদ্দত তার নির্ধারিত মেয়াদে না পৌঁছানো পর্যন্ত তোমরা বিবাহ বন্ধনের সংকল্প করো না।"
— (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২২৮ ও ২৩৫)হানাফী মাযহাবের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ ‘আল-হেদায়া’, ‘ফতোয়ায়ে আলমগীরী’ এবং ‘রদ্দুল মুহতার’ (ফতোয়ায়ে শামী)-তে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে:
অনুবাদ: "তালাকের ক্ষেত্রে ইদ্দতের সূচনা হয় ঠিক তালাক প্রদানের পর থেকেই... আর অন্যের ইদ্দত পালনকারিণী নারীকে বিবাহ করা কোনো পুরুষের জন্য জায়েজ নয়; যদি কেউ বিবাহ করে ফেলে, তবে সেই বিবাহ ফাসিদ (অকার্যকর) হবে এবং তাদের উভয়ের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটানো ওয়াজিব হবে।"
— (আল-হেদায়া: ২/৩০৩ ও ২/৪২৯; ফতোয়ায়ে আলমগীরী: ১/২৮০; রদ্দুল মুহতার বা ফতোয়ায়ে শামী: ৩/১৩১)ইসলামী শরীয়ত অত্যন্ত ইনসাফপূর্ণ। আপনি এবং আপনার স্ত্রী যেহেতু পরিবারের মুরব্বিদের (দাদার) কথার ওপর বিশ্বাস করে খাঁটি মনে ভেবেছিলেন যে আগের বিবাহের বিচ্ছেদ হয়ে গেছে, এবং আপনারা শরয়ীভাবে ইজাব-কবুলের মাধ্যমেই সংসার শুরু করেছিলেন—তাই ইসলামী ফিকহের পরিভাষায় একে ‘শুবহাতুল ফেল’ বা ‘শুবহাতুল মহল’ (شبهة الفعل أو المحل / বাস্তব অবস্থা না জানার কারণে সৃষ্ট সন্দেহযুক্ত মিলন) বলা হয়।
স্বেচ্ছায় ও জেনেশুনে হারাম কাজ করলে গুনাহ হয়; কিন্তু বাস্তব ঘটনা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকার কারণে (অনিচ্ছাকৃত ভুলে) যে সাড়ে আট বছর সংসার করেছেন, তার জন্য আল্লাহ তাআলার দরবারে আপনাদের ওপর যিনা বা ব্যভিচারের কোনো গুনাহ লেখা হয়নি।
পবিত্র কুরআনে মুমিনদের দোয়া শেখাতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
অর্থ: "হে আমাদের রব! আমরা যদি ভুলে যাই অথবা অনিচ্ছাকৃত ভুল করে ফেলি, তবে আপনি আমাদেরকে পাকড়াও করবেন না।" (সহীহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে, আল্লাহ তাআলা এর জবাবে বলেছেন: ‘কাদ ফাআলতু’—আমি তা মঞ্জুর করলাম)।
— (সূরা আল-বাকারা: ২৮৬; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ১২৬)রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) ইরশাদ করেছেন:
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতের অনিচ্ছাকৃত ভুল, বিস্মৃতি এবং জোরপূর্বক করানো কাজকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।"
— (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং: ২০৪৩; সুনানে বায়হাকী: ৭/৩৫৬)তবে শুরুতে কাগজপত্র ভালোভাবে যাচাই না করার যে অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি হয়েছিল এবং তালাকের পর ইদ্দত না জেনে ১ দিন পর বিয়ে করার যে ভুল হয়েছে, সেজন্য আল্লাহ তাআলার কাছে সাধারণভাবে ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করে নেওয়া উত্তম।
আপনার সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার বিষয়টি হলো সন্তানদের ভবিষ্যৎ। আলহামদুলিল্লাহ, হানাফী মাযহাবের ফুকাহায়ে কেরামের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আপনি যেহেতু বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে বিশ্বাস করে শরয়ী আকদ (বিবাহ) করে তাকে ঘরে তুলেছেন এবং দীর্ঘ সাড়ে আট বছর আপনাদের দাম্পত্য জীবনে এই সন্তানদের জন্ম হয়েছে (যখন প্রথম স্বামী সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ও অনুপস্থিত ছিল)—তাই এই মিলনটি ‘ওয়াতি বিশ-শুবহাহ’ (وطء بشبهة) হিসেবে গণ্য। আর ফাসিদ বা শুবহাহযুক্ত বিবাহে জন্ম নেওয়া সন্তানের নসব (পিতৃত্ব) শতভাগ বৈধভাবে ওই দ্বিতীয় স্বামীর (অর্থাৎ আপনার) সাথেই সাব্যস্ত হয়। আপনার সন্তানেরা সম্পূর্ণ পবিত্র, বৈধ এবং আপনার ঔরসজাত শরয়ী সন্তান হিসেবে আপনার উত্তরাধিকারী (ওয়ারিশ) হবে।
হানাফী ফিকহের প্রামাণ্য গ্রন্থসমূহের মূল আরবি ইবারত লক্ষ্য করুন:
অনুবাদ: "সন্দেহবশত (বিবাহ বৈধ মনে করে) দাম্পত্য মিলনের দ্বারা সন্তানের নসব বা পিতৃত্ব সাব্যস্ত হয়ে যায়, যাতে সন্তানটি সামাজিকভাবে ধ্বংস বা পরিচয়হীন না হয়... আর কেউ যদি না জেনে অন্যের বিবাহিতা নারীকে (বিবাহমুক্ত মনে করে) বিবাহ করে এবং সহবাস করে, তবে অজ্ঞতাজনিত সন্দেহের কারণে তার ওপর কোনো শাস্তি বা ব্যভিচারের হুকুম আসবে না এবং সন্তান জন্ম নিলে তার পিতৃত্বও সাব্যস্ত হবে।"
— (আল-মাবসূত লিস-সারাখসী: ৫/১৩০; ফতোয়ায়ে আলমগীরী: ১/৫৪০; রদ্দুল মুহতার বা ফতোয়ায়ে শামী: ৩/৫১৬)বর্তমানে আপনাদের সুনির্দিষ্ট করণীয় (ধাপে ধাপে):
প্রাতিষ্ঠানিক দায়মুক্তি (Disclaimer): প্রশ্নকারীর প্রদত্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কুরআন, সুন্নাহ ও হানাফী ফিকহের আলোকে এই শরয়ী সমাধান প্রদান করা হয়েছে। এটি একান্তই ধর্মীয় দিকনির্দেশনা ও পরকালীন আমলের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত; কোনো রাষ্ট্রীয় আদালত বা আইনি বিরোধের দলিল হিসেবে ব্যবহারযোগ্য নয়।
আল্লাহ তাআলা আপনাদের সব জটিলতা সহজ করে দিন এবং আপনাদের পরিবার ও সন্তানদের ওপর রহমত ও বরকত দান করুন। (আমীন) আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।
WhatsApp us