ইসলামিক প্রশ্নোত্তর - বিয়ের পূর্বে 'তাকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করলে সে তালাক' বলার বিধান
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيم

ফতোয়া ও মাসআলা বিভাগ

প্রশ্নকারীর নাম: আব্দুল্লাহ

জিজ্ঞাসা: আসসালামু আলাইকুম মুহতারাম, আমার একটা মাসআলা জানার অনেক প্রয়োজন ছিল। আমি একটা হিন্দু মেয়েকে ভালোবাসতাম, তার সাথে আমার বিচ্ছেদ হয়ে যায়। এরপর আমি তওবা করে ফিরে আসি। ওই সময় আমি আবেগের বশবর্তী হয়ে একটা কথা বলে ফেলি, কথাটা এই— "তাকে ছাড়া অন্য কাউকে বিবাহ করলে সে তালাক।" এই কথাটা আমার বন্ধুরা শুনেছিল কিন্তু কোনো মেয়ে শোনেনি, সেই মেয়েটাও না। এখন আমি বিবাহ করেছি। আমার প্রশ্ন হলো:
১. আমাদের বিবাহ সম্পর্ক কি টিকে আছে?
২. আমি তো যে মেয়ের সাথে সম্পর্ক করেছিলাম সে তো হিন্দু ছিল (এতে কি হুকুমে কোনো পার্থক্য হবে)?
৩. আমি কোনো সংখ্যা উল্লেখ করিনি যে এক তালাক, দুই তালাক নাকি তিন তালাক।
৪. যদি পুনরায় বিবাহ করতে হয় তাহলে কি নতুন করে মোহর ধার্য করতে হবে?
৫. পূর্বের মোহর কি বাতিল হয়ে যাবে?
৬. আমি আমার বর্তমান স্ত্রীর সাথেই থাকতে চাই, এক্ষেত্রে করণীয় কী? বিস্তারিত বললে অনেক উপকৃত হতাম।

ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

সম্মানিত ভাই আব্দুল্লাহ, হারাম সম্পর্ক থেকে তওবা করে ফিরে আসা এবং নিজের বর্তমান দাম্পত্য জীবনকে হালাল ও পবিত্র রাখার জন্য আপনার এই ব্যাকুলতা নিঃসন্দেহে ঈমানের পরিচায়ক। আপনি যে জটিল পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন, ইসলামী ফিকহের পরিভাষায় তাকে ‘তালিকুত তালাক বিত্তাযওয়ীজ’ (تعليق الطلاق بالتزويج - বিবাহের শর্তে তালাক ঝুলিয়ে রাখা) বলা হয়।

কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীগণের আসার এবং হানাফী মাযহাবের ইমামগণের (আইম্মায়ে মুজতাহিদীন) অকাট্য ফিকহী সিদ্ধান্তের আলোকে আপনার ৬টি প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট, দালিলিক এবং অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক শরয়ী সমাধান নিচে ধারাবাহিকভাবে পেশ করা হলো:

১. প্রথম প্রশ্নের উত্তর: আপনাদের বিবাহ সম্পর্ক কি টিকে আছে?

হানাফী ফিকহের ফয়সালা: বিবাহের ইজাব-কবুল সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথেই ১টি ‘তালাকে বায়েন’ পতিত হয়েছে

ইসলামী শরীয়তের সাধারণ নিয়ম হলো, বিবাহের পূর্বে কোনো অপরিচিতা নারীকে সরাসরি তালাক দিলে তা পতিত হয় না। কিন্তু হানাফী মাযহাবের সর্বসম্মত মূলনীতি অনুযায়ী, কেউ যদি তালাককে ‘বিবাহ করার শর্তের’ (ملك النكاح) সাথে যুক্ত করে দেয়—যেমন আপনার বলা বাক্য: "তাকে ছাড়া অন্য কাউকে বিবাহ করলে সে তালাক"—তবে এই শর্তযুক্ত তালাকটি (তালিক) শরীয়তে কার্যকর হয়ে যায়।

ফলে, আপনি যখন আপনার বর্তমান স্ত্রীকে বিবাহ করেছেন, তখন বিবাহের ইজাব-কবুল সম্পন্ন হওয়ার ঠিক পরমুহূর্তেই শর্ত পূরণ হওয়ার কারণে আপনার স্ত্রীর ওপর ১টি ‘তালাকে বায়েন’ (الطلاق البائن) পতিত হয়ে গেছে এবং আপনাদের প্রথম বিবাহের বন্ধনটি তাৎক্ষণিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ওই কথাটি কোনো মেয়ে না শুনলেও কেবল আপনার মুখ থেকে উচ্চারিত হওয়ার দ্বারাই শর্তটি কার্যকর হয়েছে।

হাদিস, সাহাবায়ে কেরামের আসার ও ফিকহী দলীল:

হাদীস শরীফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) শর্তসাপেক্ষ কথার ক্ষেত্রে মূলনীতি বর্ণনা করে ইরশাদ করেছেন:

الْمُسْلِمُونَ عِنْدَ شُرُوطِهِمْ

"মুসলমানগণ তাদের নির্ধারিত শর্তের ওপর অবিচল থাকবে (অর্থাৎ শর্ত পাওয়া গেলে হুকুম কার্যকর হবে)।"

— (সহীহ বুখারী, কিতাবুল ইজারাহ; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ৩৫৯৪)

বিখ্যাত তাবেয়ী ইমাম ইবরাহীম নাখয়ী (রহ.), ইমাম শা'বী (রহ.) এবং হানাফী মাযহাবের ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.) সহ জুমহুর ফুকাহায়ে কেরামের অকাট্য ফতোয়া হলো— বিবাহের শর্তে তালাক ঝুলিয়ে রাখলে বিবাহ হওয়ার সাথে সাথেই তালাক পতিত হয়:

وَإِذَا أَضَافَ الطَّلَاقَ إِلَى النِّكَاحِ وَقَعَ عَقِيبَ النِّكَاحِ، نَحْوُ أَنْ يَقُولَ لِامْرَأَةٍ: إِنْ تَزَوَّجْتُكِ فَأَنْتِ طَالِقٌ، أَوْ كُلُّ امْرَأَةٍ أَتَزَوَّجُهَا فَهِيَ طَالِقٌ

অনুবাদ: "যখন কেউ তালাককে বিবাহের সাথে সম্পৃক্ত (শর্তযুক্ত) করে, তখন বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথেই তালাক পতিত হয়ে যায়। যেমন কেউ কোনো নারীকে বলল: 'আমি যদি তোমাকে বিবাহ করি তবে তুমি তালাক', অথবা বলল: 'আমি যে নারীকেই বিবাহ করব সে তালাক' (তখন বিবাহ করার সাথে সাথেই তালাক কার্যকর হবে)।"

— (আল-হেদায়া: ২/৩৮৬, বাবুল ইয়ামীন ফিত তালাক; বাদায়েউস সানায়ে: ৩/১৩২; ফতোয়ায়ে আলমগীরী বা হিন্দিয়া: ১/৪২০)

২. দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর: পূর্বের মেয়েটি হিন্দু হওয়ায় হুকুমে কোনো পার্থক্য হবে কি?

না, পূর্বের ওই মেয়েটি হিন্দু (অমুসলিম) হওয়ার কারণে এই হুকুমে কোনো পার্থক্য হবে না। যদিও কুরআনুল কারীমের অকাট্য নির্দেশ (সূরা আল-বাকারা: ২২১) অনুযায়ী কোনো মুসলিম পুরুষের জন্য মূর্তিপূজারী বা হিন্দু নারীকে বিবাহ করা সম্পূর্ণ হারাম এবং বাতিল; কিন্তু আপনার বাক্যে ওই মেয়েটি ছিল কেবল একটি ‘ব্যতিক্রমী শর্ত’ (استثناء)।

উসুলুল ফিকহ ও আরবি ব্যাকরণের নিয়ম অনুযায়ী, আপনি মূল হুকুমটি লাগিয়েছেন "অন্য কাউকে বিবাহ করলে"-এর ওপর। যেহেতু আপনার বর্তমান স্ত্রী ওই মেয়েটি নন (বরং অন্য একজন মুসলিম নারী), তাই আপনার শর্তটি শতভাগ পাওয়া গেছে এবং তালাক কার্যকর হয়েছে।

لِأَنَّ الشَّرْطَ قَدْ تَحَقَّقَ بِتَزَوُّجِ غَيْرِهَا فَيَنْزِلُ الْجَزَاءُ
— (তাবঈনুল হাকায়েক: ২/২২৮; রদ্দুল মুহতার বা ফতোয়ায়ে শামী: ৩/৩৪৬)

৩. তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর: সংখ্যা উল্লেখ না করায় কয় তালাক হয়েছে এবং শপথটি কি শেষ হয়ে গেছে?

অত্যন্ত বড় সুসংবাদ: মাত্র ১টি তালাক পতিত হয়েছে এবং আপনার শপথের মেয়াদ চিরতরে শেষ (ভেঙে) গেছে!

ভাই আব্দুল্লাহ, আপনার জন্য এখানে শরীয়তের দুটি বিশাল সহজতা ও সুসংবাদ রয়েছে:

  1. মাত্র ১টি তালাক হয়েছে: আপনি যেহেতু এক, দুই বা তিন—কোনো সংখ্যা উল্লেখ না করে শুধু বলেছেন "সে তালাক" (এবং কথাটি বলার মুহূর্তে মনে মনে তিন তালাকের সুনির্দিষ্ট নিয়তও করেননি), তাই হানাফী ফিকহ অনুযায়ী এর দ্বারা শুধুমাত্র ১টি (একটি) তালাকই পতিত হয়েছে। আর যেহেতু এই তালাকটি বিবাহের সাথে সাথেই (সহবাস বা নির্জনবাসের পূর্বেই) পতিত হয়েছে, তাই এটি ‘এক তালাকে বায়েন’ (طلقة واحدة بائنة) হিসেবে গণ্য হয়েছে।
  2. শপথটি একবারেই শেষ হয়ে গেছে (انحلال اليمين): আপনি আপনার বাক্যে "যখনই বিয়ে করব" বা "যতবার বিয়ে করব" (كلما)—এমন কোনো পুনরাবৃত্তিমূলক শব্দ ব্যবহার করেননি; বরং সাধারণভাবে বলেছেন: "তাকে ছাড়া অন্য কাউকে বিবাহ করলে সে তালাক।" হানাফী মাযহাবের অকাট্য বিধান হলো, এই সাধারণ শর্তযুক্ত শপথটি মাত্র একবার বিবাহ করার দ্বারাই পূর্ণ হয়ে চিরতরে শেষ (বাতিল) হয়ে গেছে! সুতরাং, এখন যদি আপনি আপনার এই স্ত্রীকে নতুন করে আবার বিবাহ (তাজদীদে নিকাহ) করেন, তবে পুনরায় আর কোনো তালাক পতিত হবে না!

হানাফী মাযহাবের প্রামাণ্য গ্রন্থসমূহের মূল আরবি ইবারত লক্ষ্য করুন:

وَكُلُّ طَلَاقٍ وَقَعَ قَبْلَ الدُّخُولِ فَهُوَ بَائِنٌ لَا تَعْقُبُهُ الرَّجْعَةُ ... وَإِذَا قَالَ: إِنْ تَزَوَّجْتُ امْرَأَةً فَهِيَ طَالِقٌ، فَتَزَوَّجَ امْرَأَةً طَلُقَتْ وَانْحَلَّتِ الْيَمِينُ، فَلَوْ تَزَوَّجَهَا ثَانِيًا أَوْ تَزَوَّجَ غَيْرَهَا لَمْ تَطْلُقْ؛ لِأَنَّ أَدَاةَ الشَّرْطِ لَا تَقْتَضِي التَّكْرَارَ

অনুবাদ: "সহবাস বা খলওয়াতে সহীহার (নির্জনবাসের) পূর্বে পতিত হওয়া প্রতিটি তালাকই ‘বায়েন’ (বিচ্ছিন্নকারী) হয়... আর যদি কেউ বলে: 'আমি কোনো নারীকে বিবাহ করলে সে তালাক'—অতঃপর সে কোনো নারীকে বিবাহ করে, তবে ওই নারী এক তালাক হয়ে যাবে এবং এর সাথে সাথেই তার শপথটি ভেঙে (শেষ হয়ে) যাবে। অতঃপর সে যদি ওই নারীকেই দ্বিতীয়বার (নতুন করে) বিবাহ করে অথবা অন্য কোনো নারীকে বিবাহ করে, তবে আর কোনো তালাক পতিত হবে না; কেননা সাধারণ শর্তবাচক শব্দ পুনরাবৃত্তি (বারবার হওয়া) দাবি করে না।"

— (আল-হেদায়া: ২/৩৮৮; ফতোয়ায়ে আলমগীরী: ১/৪১৫; রদ্দুল মুহতার বা ফতোয়ায়ে শামী: ৩/৩৫২)

৪ ও ৫. চতুর্থ ও পঞ্চম প্রশ্নের উত্তর: পূর্বের মোহরের হুকুম এবং নতুন বিবাহে মোহর ধার্য করা

পূর্বের মোহর ও নতুন মোহরের শরয়ী হিসাব (অত্যন্ত সূক্ষ্ম মাসআলা):

এখানে পূর্বের মোহরের বিধানটি নির্ভর করছে বিয়ের পর আপনার স্ত্রীর সাথে আপনার শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে কি না—তার ওপর:

  • পূর্বের মোহরের বিধান: যেহেতু আপনাদের প্রথম বিবাহের ইজাব-কবুল সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথেই (যেকোনো নির্জনবাস বা সহবাসের পূর্বেই) তালাকটি পতিত হয়ে বিবাহ ভেঙে গেছে, তাই কুরআনুল কারীমের সূরা আল-বাকারার ২৩৭ নং আয়াত অনুযায়ী মৌলিকভাবে প্রথম বিবাহের কারণে আপনার ওপর পূর্বের ধার্যকৃত মোহরের অর্ধেক (নিসফু মাহর) আবশ্যক হয়েছিল।
    কিন্তু, আপনারা যেহেতু এই মাসআলাটি জানতেন না এবং প্রথম বিবাহ বহাল আছে মনে করেই (বিবাহের শুবহাহ বা সন্দেহের ভিত্তিতে) যদি ইতিমধ্যে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে সহবাস (শারীরিক সম্পর্ক) করে থাকেন—তবে ফিকহে হানাফীর বিধান অনুযায়ী ওই সহবাসের কারণে পূর্বের ধার্যকৃত পূর্ণ মোহরই (১০০% দেনমোহর) আদায় করা আপনার ওপর ওয়াজিব হয়ে গেছে। আর যদি বিয়ের পর এখনো আপনাদের মাঝে কোনো সহবাস না হয়ে থাকে, তবে পূর্বের মোহরের অর্ধেক দেওয়া ওয়াজিব (স্ত্রী স্বেচ্ছায় মাফ করে দিলে মাফ হয়ে যাবে)।
  • নতুন বিবাহের মোহর: হ্যাঁ, এখন পুনরায় বিবাহ (তাজদীদে নিকাহ) করতে হলে অবশ্যই নতুন করে একটি দেনমোহর ধার্য করতে হবে। তবে শর্ত নয় যে নতুন মোহর অনেক বেশি হতে হবে; আপনারা উভয়ে সম্মত হয়ে শরীয়তের সর্বনিম্ন মোহর (দশ দিরহাম বা সমমূল্যের রুপা, যা বর্তমান বাজারমূল্যে আনুমানিক ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকার মতো) অথবা যেকোনো পরিমাণ মোহর নির্ধারণ করে নতুন বিবাহ সম্পন্ন করতে পারেন। এমনকি আপনারা যদি চান যে, পূর্বের কাবিননামায় যে টাকা লেখা ছিল, সেটিকেই নতুন বিয়ের মোহর হিসেবে গণ্য করবেন—তবে তাও করতে পারবেন।
وَمَنْ طَلَّقَ امْرَأَتَهُ قَبْلَ الدُّخُولِ لَزِمَهُ نِصْفُ الْمَهْرِ ... فَلَوْ وَطِئَهَا بَعْدَ الْبَيْنُونَةِ بِشُبْهَةٍ يَجِبُ كَمَالُ الْمَهْرِ، وَإِذَا جَدَّدَ النِّكَاحَ فَلَا بُدَّ مِنْ مَهْرٍ جَدِيدٍ
— (ফতোয়ায়ে আলমগীরী: ১/৩০৪; আল-বাহরুর রায়েক: ৩/১৫৪; রদ্দুল মুহতার: ৩/১০২ ও ৩/১৩২)

৬. ষষ্ঠ প্রশ্নের উত্তর: বর্তমান স্ত্রীর সাথেই ঘর-সংসার করতে এখন সুনির্দিষ্ট করণীয় কী?

প্রিয় ভাই আব্দুল্লাহ, যেহেতু মাত্র ১টি ‘তালাকে বায়েন’ পতিত হয়েছে (৩ তালাক হয়নি), তাই আপনার স্ত্রীকে ফিরে পাওয়ার পথ সম্পূর্ণ খোলা এবং অত্যন্ত সহজ! শরীয়তে ১ বা ২ তালাকে বায়েন হলে কোনো হিল্লা বা অন্য কিছুর প্রয়োজন হয় না; বরং স্বামী-স্ত্রী রাজি থাকলে সাথে সাথেই নতুন করে বিবাহ (তাজদীদে নিকাহ) করে নেওয়া যায়।

আপনাকে আজই যা করতে হবে (ধাপে ধাপে):

  1. অবিলম্বে নতুন করে ইজাব-কবুল (তাজদীদে নিকাহ) করুন: নতুন বিবাহ না পড়া পর্যন্ত স্ত্রীর সাথে একান্ত মেলামেশা থেকে বিরত থাকুন। আজই বা যত দ্রুত সম্ভব ঘরোয়াভাবে মাত্র দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম পুরুষ সাক্ষীর (যেমন আপনার ঘনিষ্ঠ দুজন বন্ধু বা পরিবারের সদস্য) উপস্থিতিতে নতুন একটি দেনমোহর উল্লেখ করে মুখে স্পষ্টভাবে ইজাব ও কবুল পাঠ করে বিবাহ নবায়ন করে নিন। (যেমন: স্ত্রী সাক্ষীদের সামনে বলবেন—"আমি এত টাকা দেনমোহরের বিনিময়ে আপনার কাছে নিজেকে বিবাহ দিলাম", আর আপনি সাথে সাথে বলবেন—"আমি কবুল করলাম")। এর জন্য নতুন করে কাজী ডাকা বা কাবিননামা রেজিস্ট্রি করারও প্রয়োজন নেই; পূর্বের সরকারি কাবিননামাটিই আইনি দলিল হিসেবে বহাল থাকবে।
  2. ভবিষ্যতের হিসাব মনে রাখুন: নতুন করে এই বিবাহ সম্পন্ন করার পর আপনার স্ত্রী পুনরায় আপনার শতভাগ বৈধ ও হালাল স্ত্রী হয়ে যাবেন এবং আপনার পূর্বের শপথের কারণে আর কোনো তালাক পতিত হবে না। তবে মনে রাখবেন, ১টি তালাক খরচ হয়ে যাওয়ায় ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য আপনার হাতে আর মাত্র ২টি তালাকের অধিকার অবশিষ্ট থাকবে।
  3. তওবা ও ইস্তিগফার: বিয়ের আগে আবেগের বশে তালাকের এমন ঝুঁকিপূর্ণ কথা বলার জন্য এবং না জেনে বিয়ের পর একত্রে থাকার জন্য আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করুন। না জেনে হওয়ার কারণে আল্লাহ তাআলা নিশ্চয়ই আপনাদের ক্ষমা করবেন।
وَإِذَا كَانَ الطَّلَاقُ بَائِنًا دُونَ الثَّلَاثِ فَلَهُ أَنْ يَتَزَوَّجَهَا فِي الْعِدَّةِ وَبَعْدَ انْقِضَائِهَا

"যখন তালাকে বায়েন তিন তালাকের কম (১ বা ২ তালাক) হয়, তখন স্বামীর জন্য ইদ্দত চলাকালীন কিংবা ইদ্দত শেষ হওয়ার পর যেকোনো সময় ওই স্ত্রীকে নতুন করে বিবাহ করা সম্পূর্ণ জায়েজ।"

— (আল-হেদায়া: ২/৪০৭, বাবুর রজআহ; ফতোয়ায়ে আলমগীরী: ১/৪৭২)

এক নজরে আপনার ৬টি প্রশ্নের চূড়ান্ত সারসংক্ষেপ

  1. বিয়ের পূর্বে বলা শর্তযুক্ত কথার কারণে বিবাহ হওয়ার সাথে সাথেই ১টি ‘তালাকে বায়েন’ পতিত হয়ে প্রথম আকদটি ভেঙে গেছে।
  2. পূর্বের মেয়েটি হিন্দু হওয়ার কারণে এই শরয়ী বিধানে কোনো পরিবর্তন হবে না।
  3. কোনো সংখ্যা উল্লেখ না করায় মাত্র ১টি তালাক পতিত হয়েছে এবং ১ বার তালাক পতিত হওয়ার সাথে সাথেই আপনার পূর্বের শপথটি চিরতরে শেষ (বাতিল) হয়ে গেছে।
  4. এখন বর্তমান স্ত্রীর সাথে সংসার করতে হলে শুধুমাত্র দুজন সাক্ষীর সামনে নতুন মোহরানা ধার্য করে মৌখিকভাবে নতুন করে ইজাব-কবুল (বিবাহ নবায়ন) করে নিতে হবে।
  5. বিয়ের পর না জেনে সহবাস হয়ে থাকলে পূর্বের মোহর বহাল রয়েছে (আর সহবাস না হয়ে থাকলে অর্ধেক মোহর ওয়াজিব হয়েছে)। তবে স্ত্রী স্বেচ্ছায় মাফ করতে চাইলে মাফ করতে পারবেন।
  6. আজই দুজন সাক্ষীর সামনে মুখে ইজাব-কবুল পড়ে বিবাহ নবায়ন করে নিন। এরপর আপনারা আজীবন পবিত্র ও হালালভাবে ঘর-সংসার করতে পারবেন ইনশাআল্লাহ।

আল্লাহ তাআলা আপনার তওবা কবুল করুন এবং আপনার নতুন দাম্পত্য জীবনে অফুরন্ত শান্তি, রহমত ও বরকত দান করুন। (আমীন) আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।