প্রশ্ন: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ। আমি আমার স্বামীর কাছে পাওনা সম্পূর্ণ দেনমোহর নিজের ইচ্ছায় মুখে মুখে মাফ করে দিয়েছি। মাফ করার সময় কোনো সাক্ষী উপস্থিত ছিল না এবং কোনো লিখিত কাগজও করা হয়নি। এখন আমি জানতে চাই, ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী আমার দেনমোহর কি মাফ হয়ে গেছে? সাক্ষী ছাড়া শুধু মুখে বললে কি তা কার্যকর হয়? কুরআন-হাদিস ও ফিকহের দলিলসহ জানালে উপকৃত হব। জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
সম্মানিতা বোন সানজিদা রহমান, ইসলামী শরীয়তের বিধান জানার প্রতি আপনার এই আগ্রহ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। দেনমোহর বা মোহরানা হলো বিবাহের মাধ্যমে স্ত্রীর অর্জিত একটি একচ্ছত্র আর্থিক অধিকার (হক্কুল ইবাদ)। পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবায়ে কেরামের ইজমা এবং হানাফী মাযহাবের অকাট্য ফিকহী মূলনীতির আলোকে আপনার প্রশ্নের সুস্পষ্ট ফয়সালা হলো— হ্যাঁ, আপনি যেহেতু প্রাপ্তবয়স্কা ও সুস্থমস্তিষ্ক অবস্থায় কোনো প্রকার চাপ ছাড়া সম্পূর্ণ নিজ ইচ্ছায় মুখে উচ্চারণ করে স্বামীর দেনমোহর মাফ করে দিয়েছেন, তাই শরীয়তের দৃষ্টিতে তা ১০০% মাফ হয়ে গেছে। এজন্য কোনো সাক্ষীর উপস্থিতি বা লিখিত দলিল থাকা শরীয়তের দৃষ্টিতে মোটেও শর্ত নয়।
নিচে কুরআন, হাদিস, সাহাবায়ে কেরামের আমল এবং হানাফী ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহের আরবি ইবারতসহ বিস্তারিত দলীল পেশ করা হলো:
ইসলামী শরীয়তে স্ত্রীর দেনমোহর আদায় করা স্বামীর ওপর ফরজ। কিন্তু স্ত্রী যদি খুশি মনে, কোনো ধরনের জোরজবরদস্তি বা মানসিক চাপ ছাড়া নিজের এই প্রাপ্য অধিকারটির সম্পূর্ণ বা আংশিক স্বামীকে মাফ করে দেন, তবে স্বামীর জন্য তা ভোগ করা সম্পূর্ণ হালাল ও পবিত্র। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে সরাসরি এই বিধানটি নাযিল করেছেন:
অর্থ: "আর তোমরা নারীদেরকে তাদের মোহরানা স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রদান করো; অতঃপর তারা যদি খুশি মনে তা থেকে কিছু অংশ তোমাদেরকে ছেড়ে দেয় (মাফ করে দেয়), তবে তোমরা তা তৃপ্তি ও স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে ভোগ করো।"
— (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৪)সাহাবা ও তাবেয়ীগণের তাফসীর:
হানাফী মাযহাবের প্রখ্যাত ফকীহ ও মুফাসসির ইমাম আবু বকর জাসসাস (রহ.) তাঁর বিখ্যাত 'আহকামুল কুরআন' গ্রন্থে এবং হাফেজ ইবনে কাসীর (রহ.) তাঁর তাফসীরে উল্লেখ করেছেন যে, সাহাবী হযরত ইবনে আব্বাস (রা.), তাবেয়ী হযরত ইকরিমা (রহ.), মুজাহিদ (রহ.) এবং শা'বী (রহ.) সহ সকল সালফে সালেহীন এই আয়াতের ব্যাখ্যায় একমত পোষণ করেছেন যে, স্ত্রী স্বেচ্ছায় মোহরানার কিছু অংশ বা সম্পূর্ণ অংশ মাফ করলে স্বামীর জিম্মা থেকে তা সম্পূর্ণরূপে মাফ হয়ে যায়।
ইসলামী ফিকহের পরিভাষায় স্বামীর ওপর থাকা অনাদায়ী দেনমোহর একটি ‘দাইন’ (الدين বা ঋণ)। আর ঋণ বা পাওনা টাকা মাফ করে দেওয়াকে ফিকহের ভাষায় বলা হয় ‘আল-ইবরা’ (الإبراء عن الدين - দায়মুক্তি প্রদান)।
হানাফী মাযহাবের সকল ইমাম ও মুজতাহিদগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত (ইজমা) হলো— ‘ইবরা’ বা দেনমোহর মাফ করার জন্য কোনো সাক্ষী (إشهاد) কিংবা লিখিত স্ট্যাম্প/কাগজ (كتابة) থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। স্ত্রী একা ঘরে বা ফোনে অথবা যেকোনো স্থানে শুধু মুখে যদি স্পষ্টভাবে বলেন যে, "আমি আমার দেনমোহর মাফ করে দিলাম"—তাহলে সাথে সাথেই আল্লাহর কাছে (ديانةً) সেই দেনমোহর মাফ হয়ে যায় এবং স্বামীর কাঁধ থেকে ঋণের বোঝা নেমে যায়।
হানাফী মাযহাবের প্রামাণ্য ফিকহ ও ফতোয়া গ্রন্থসমূহের মূল আরবি ইবারত লক্ষ্য করুন:
অনুবাদ: "স্ত্রীর জন্য তার সম্পূর্ণ দেনমোহর অথবা তার কিছু অংশ মাফ করে দেওয়া সহীহ (বৈধ)... আর দেনমোহর যদি স্বামীর জিম্মায় ঋণ হিসেবে বাকি থাকে এবং স্ত্রী তা থেকে স্বামীকে দায়মুক্ত (মাফ) করে দেয়, তবে তা শুধুমাত্র স্ত্রীর মৌখিক ঘোষণার দ্বারাই কার্যকর হয়ে যাবে এবং স্বামীর কবুল বা গ্রহণ করার ওপরও তা নির্ভর করবে না (তবে স্বামী চাইলে তা প্রত্যাখ্যান করতে পারে)।"
— (ফতোয়ায়ে আলমগীরী বা হিন্দিয়া: ১/৩১৮; আল-বাহরুর রায়েক: ৩/১৬২; রদ্দুল মুহতার বা ফতোয়ায়ে শামী: ৩/১১৩)ইমাম কাসানী হানাফী (রহ.) তাঁর জগদ্বিখ্যাত গ্রন্থ 'বাদায়েউস সানায়ে'-তে লিখেছেন:
অনুবাদ: "স্ত্রী যদি প্রাপ্তবয়স্কা ও সুস্থমস্তিষ্কসম্পন্না হন, তবে অভিভাবকদের অনুমতি বা উপস্থিতি ছাড়াই তিনি তার স্বামীকে দেনমোহর হেবা (উপহার) করতে পারেন বা মাফ করে দিতে পারেন—এ বিষয়ে উম্মতের ইজমা (ঐকমত্য) রয়েছে।"
— (বাদায়েউস সানায়ে: ২/২৯৫, কিতাবুন নিকাহ)অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, সমাজে বা কাজী অফিসে কেন লিখিত বা সাক্ষী রাখার কথা বলা হয়? ফিকহুল ইসলামীর দৃষ্টিতে প্রতিটি লেনদেনের দুটি দিক থাকে: ১. দিয়ানাতান (ديانةً) বা আল্লাহর কাছে পরকালীন বিধান, ২. কাজাআন (قضاءً) বা দুনিয়ার আদালতের আইনি প্রমাণ।
ইসলামী ফিকহের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অকাট্য মূলনীতি (কাওয়ায়েদে ফিকহিয়্যাহ) জেনে রাখা প্রয়োজন— স্ত্রী একবার খুশি মনে দেনমোহর মাফ করে দেওয়ার পর ভবিষ্যতে যদি কখনো মত পরিবর্তন করেন বা রাগের মাথায় বলেন যে, "আমি আমার দেনমোহর ফিরিয়ে নিলাম, আমাকে দিতে হবে"—তবুও তিনি আর সেই দেনমোহর দাবি করতে পারবেন না। কারণ, মাফ করার সাথে সাথেই সেই ঋণ চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
ফিকহী কায়েদা: "যা একবার রহিত বা মওকুফ হয়ে যায়, তা আর কখনো ফিরে আসে না; যেমন অস্তিত্বহীন বস্তু পুনরায় ফিরিয়ে আনা যায় না।"
— (আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, আল্লামা ইবনে নুজাইম হানাফী: পৃ. ৯৯; মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যাহ, ধারা: ৫১ ও ১৫৬২)তবে, আমাদের সমাজে অনেক সময় দেখা যায় বাসর রাতে বা সংসার জীবনে স্বামী কিংবা শ্বশুরবাড়ির লোকেরা স্ত্রীকে মানসিক চাপে ফেলে, লজ্জা দিয়ে বা ভয় দেখিয়ে জোরপূর্বক মুখে বলিয়ে নেয় যে "দেনমোহর মাফ করে দাও"। যদি এমন চাপে পড়ে শুধু মুখ রক্ষার জন্য স্ত্রী মুখে মাফ করেন কিন্তু অন্তরে রাজি না থাকেন (طيب النفس না থাকে), তবে শরীয়তে তা মাফ হয় না। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে যেহেতু আপনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে "আমি নিজের ইচ্ছায় মাফ করেছি"—তাই আপনার এই মাফ করাটা শতভাগ সহীহ ও কার্যকর হয়েছে এবং এর জন্য আপনি আল্লাহর কাছে বিপুল সওয়াব ও প্রতিদান পাবেন ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ তাআলা আপনাদের দাম্পত্য জীবনকে সুখময়, পবিত্র ও বরকতময় করুন। (আমীন) আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।
WhatsApp us