প্রশ্ন: আসসালামু আলাইকুম, হুজুর। আমি একটি নিকাহ-সংক্রান্ত মাসআলায় খুব দুশ্চিন্তায় আছি। একদিন কলেজে যাওয়ার পথে হাঁটার সময় একজন লোককে দেখে বিয়ে বা ইজাবের মতো কিছু বলেছিলাম কি না, তা নিয়ে আমার সন্দেহ হচ্ছে। কখনো মনে হয় আমি মুখে “বিয়ে করলাম” বলেছিলাম, আবার কখনো মনে হয় কথাটি শুধু মনে এসেছিল, মুখে বলিনি। আমার মুখ নাড়ানোর কথা মনে আছে এবং হালকা একটি শব্দ হয়েছিল বলেও মনে হয়, কিন্তু ঠিক কী শব্দ বলেছিলাম, তা মনে নেই। লোকটি “কবুল করলাম” বলেছিল বলে আমার মনে আছে এবং মনে হয় আমি নিজের কানে শুনেছি। কিন্তু পুরো কথোপকথন ও ঘটনার সবকিছু স্পষ্টভাবে মনে করতে পারছি না। আমার উদ্দেশ্য নিয়েও আমি নিশ্চিত নই। লোকটির নাম, ঠিকানা, চেহারা বা ধর্ম সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। নিকাহের জন্য প্রয়োজনীয় শর্তগুলো পূরণ হয়েছিল কি না, সেটাও আমার জানা নেই। আমি আমার ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করতে চাই। এখন ভয় হচ্ছে, যদি ওই ঘটনার কারণে অন্য কারও সঙ্গে আমার নিকাহ হয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে আমার কী করণীয় হবে? দয়া করে জানাবেন, আমার কি নিকাহ হয়েছে বলে গণ্য হবে, নাকি শুধু সন্দেহের কারণে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না? জাযাকাল্লাহু খাইরান।
ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
সম্মানিতা বোন নুসরাত, আপনার সম্পূর্ণ প্রশ্নটি আমরা অত্যন্ত মনোযোগ ও সহানুভূতির সাথে পড়েছি। প্রথমেই আপনাকে এক শ ভাগ নিশ্চিত করে সুসংবাদ দিচ্ছি যে— শরীয়তের দৃষ্টিতে আপনার সাথে ওই অপরিচিত ব্যক্তির কোনো বিবাহ (নিকাহ) হয়নি, হওয়ার বিন্দুমাত্র কোনো সম্ভাবনাও নেই। আপনি সম্পূর্ণ অবিবাহিত এবং মুক্ত। আপনি যে দুশ্চিন্তায় ভুগছেন, ইসলামী ফিকহ ও মনোবিজ্ঞানের ভাষায় তাকে ‘আল-ওয়াসওয়াসুল কাহরী’ (الوسواس القهري / OCD বা শুচিবায়ু ও অমূলক সন্দেহ রোগ) বলা হয়। শয়তান মুমিন বান্দাকে অহেতুক পেরেশান করার জন্য মনের ভেতর এমন কাল্পনিক ভয়ের সৃষ্টি করে।
আপনার মনের সমস্ত ভয় ও সন্দেহ চিরতরে দূর করার জন্য কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবায়ে কেরামের ইজমা এবং হানাফী মাযহাবের অকাট্য ফিকহী দলীলসমূহ নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
ইসলামী শরীয়তের একটি সর্বজনস্বীকৃত ও ইজমায়ী মূলনীতি হলো, মানুষের মূল অবস্থা (الأصل) হলো সে বিবাহমুক্ত। যতক্ষণ না শতভাগ নিশ্চিতভাবে শরীয়তের সকল শর্ত মেনে ইজাব ও কবুল প্রমাণিত হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কেবল "বলেছিলাম কি না", "ঠোঁট নেড়েছিল কি না", "সে কবুল বলেছিল বলে মনে হয়"—এমন নিছক সন্দেহ (شك) বা কল্পনার (وهم) ওপর ভিত্তি করে পৃথিবীর কোনো মাযহাবেই বিবাহ সংঘটিত হয় না।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
"নিশ্চয়ই ধারণা বা সন্দেহ সত্যের মোকাবেলায় কোনোই কাজে আসে না।"
— (সূরা আন-নাজম, আয়াত: ২৮)হানাফী ফিকহের বিখ্যাত গ্রন্থ 'আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের' এবং 'মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যাহ'-তে সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে:
"নিশ্চিত বিষয় সন্দেহের দ্বারা দূর হয় না... এবং যেকোনো নতুন আরোপিত বিষয়ের (যেমন: বিবাহ বা লেনদেন চুক্তির) মূল ভিত্তি হলো তা সংঘটিত না হওয়া (যতক্ষণ না তা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়)।"
— (আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, ইবনে নুজাইম হানাফী: পৃ. ৪৭-৫৩; মাজাল্লাতুল আহকাম, ধারা: ৪ ও ৯)যেহেতু আপনি নিজেই নিশ্চিত নন যে আপনি আদৌ কোনো শব্দ উচ্চারণ করেছিলেন কি না বা কী শব্দ বলেছিলেন, তাই ফিকহের এই অকাট্য মূলনীতি অনুযায়ী আপনার কোনো ইজাবই (প্রস্তাব) সংঘটিত হয়নি।
আপনার মানসিক প্রশান্তির জন্য তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেওয়া হয় যে, আপনি সত্যিই বিয়ের কথা বলেছিলেন এবং ওই লোকটিও "কবুল" বলেছিল—তবুও শরীয়তের দৃষ্টিতে এই বিবাহ সম্পূর্ণ বাতিল (باطل محض) এবং অস্তিত্বহীন! কারণ, ইসলামী শরীয়তে নিকাহ কোনো ছেলেখেলা নয়; এটি সংঘটিত হওয়ার জন্য ৪টি অপরিহার্য শর্ত রয়েছে, যার একটিও এখানে পাওয়া যায়নি:
"মুসলমানদের বিবাহ দুজন স্বাধীন, সুস্থমস্তিষ্ক, প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দুজন নারী সাক্ষীর উপস্থিতি ছাড়া সংঘটিত হয় না... এবং উভয় সাক্ষীর জন্য বর ও কনে উভয়ের কথা একসাথে নিজ কানে শোনা অপরিহার্য শর্ত।"
— (আল-হেদায়া: ২/৩০৬; বাদায়েউস সানায়ে: ২/২৫২; ফতোয়ায়ে শামী: ৩/২১)আপনি রাস্তায় হাঁটার সময় যেহেতু কোনো সাক্ষী উপস্থিত থেকে আপনাদের দুজনের কথা শোনেনি, তাই এখানে বিবাহ হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
সম্মানিতা বোন, আপনার প্রশ্নের ধরন দেখে এটি শতভাগ স্পষ্ট যে, আপনি শয়তানের পক্ষ থেকে আসা তীব্র ওয়াসওয়াসা বা শুচিবায়ু রোগে আক্রান্ত। শয়তান চায় এ ধরনের উদ্ভট ও অসম্ভব চিন্তা মাথায় ঢুকিয়ে আপনার স্বাভাবিক জীবন ও ভবিষ্যৎ বিবাহকে বাধাগ্রস্ত করতে।
হানাফী মাযহাবের ফুকাহায়ে কেরাম ও সালাফে সালেহীন স্পষ্ট ফতোয়া দিয়েছেন যে, ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য শরীয়তের হুকুম হলো—সে তার মনের এই সন্দেহের দিকে ভুলেও ভ্রুক্ষেপ করবে না এবং একে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করবে।
"ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত ব্যক্তির ওপর ওয়াজিব হলো এই কুচিন্তাকে মূলোৎপাটন করা এবং সেদিকে একেবারেই ভ্রুক্ষেপ না করা।"
— (আল-বাহরুর রায়েক: ১/১৭২; রদ্দুল মুহতার: ১/১৫১)যখনই মাথায় এই চিন্তা আসবে যে "আমার কি বিয়ে হয়ে গিয়েছিল?", সাথে সাথে মনে মনে বলবেন: «آمَنْتُ بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ» (আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের ওপর ঈমান আনলাম) এবং «أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ» পড়ে চিন্তাটি ঝেড়ে ফেলবেন। কখনোই ওই ঘটনার স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করবেন না।
আল্লাহ তাআলা আপনার অন্তর থেকে শয়তানের সমস্ত ওয়াসওয়াসা দূর করে দিন এবং আপনার ভবিষ্যৎ দাম্পত্য জীবনকে সুখময় ও বরকতময় করুন। (আমীন) আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।
WhatsApp us