প্রশ্ন: রিসেলার ব্যবসা নিয়ে আপনারা যে ফতোয়া দিয়েছেন তা এই ফতোয়ার সাথে তো মিলে না যেটা বিন্নুরি টাউন (করাচী, পাকিস্তান - ফতোয়া নং: 144108201303) থেকে দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে— কোনো সংস্থা পণ্যের মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণ করার পর রিসেলার ৩০ টাকা যুক্ত করে ১৩০ টাকায় প্রচার করে এবং কোম্পানি সরাসরি ক্রেতার কাছে পণ্য পাঠিয়ে ১৩০ টাকা উসুল করে রিসেলারকে ৩০ টাকা পাঠিয়ে দেয়। বিন্নুরি টাউনের ফতোয়ায় এর দুটি পদ্ধতি উল্লেখ করা হয়েছে: (ক) কোম্পানি থেকে পণ্য কিনে নিজের কাছে আনার আগেই বিক্রি করে দেওয়া—যা জায়েজ নেই। (খ) কোম্পানি এবং ক্রেতার মধ্যে কমিশন এজেন্ট হিসেবে কাজ করা—যা ৭টি শর্ত সাপেক্ষে বৈধ এবং তারা লিখেছেন: "উপরোল্লিখিত অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে সম্পাদিত লেনদেন চুক্তি সাধারণত এমনই হয়ে থাকে।" [সূত্র: দুররে মুখতার ও হাশিয়ায়ে ইবনে আবেদীন ৬/৬৩]। এ বিষয়ে আপনাদের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা জানতে চাই।
ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
সম্মানিত ভাই সাদেক খান, দ্বীনি ইলমের প্রতি আপনার এই গভীর অনুসন্ধিৎসা এবং বিশ্ববিখ্যাত ফতোয়া প্রতিষ্ঠান ‘জামিয়াতুল উলূমিল ইসলামিয়া আল্লামা বিন্নুরি টাউন, করাচী’-এর ফতোয়া সামনে এনে বিষয়টি যাচাই করার প্রচেষ্টাকে আমরা আন্তরিকভাবে সাধুবাদ জানাই।
তবে অত্যন্ত আনন্দের বিষয় হলো—আপনার পূর্বের প্রশ্নে দেওয়া আমাদের ফতোয়া এবং আপনার উদ্ধৃত জামিয়া বিন্নুরি টাউনের ফতোয়ার মধ্যে বিন্দুমাত্র কোনো বিরোধ বা অমিল নেই; বরং দুটি ফতোয়াই হুবহু একই সিদ্ধান্ত এবং একই ফিকহী দলীলের কথা বলছে! সম্ভবত বিন্নুরি টাউনের ফতোয়ার ভাষাগত কাঠামোর কারণে আপনার বুঝতে সামান্য অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে। নিচে বিন্নুরি টাউনের মূল ফতোয়া, সাহাবায়ে কেরামের আসার এবং হানাফী মাযহাবের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ ‘ফতোয়ায়ে শামী’ (৬/৬৩)-এর মূল আরবি ইবারতসহ বিষয়টি পানির মতো পরিষ্কার করে দেওয়া হলো:
আপনি বিন্নুরি টাউনের যে অনুবাদটি পেশ করেছেন, তার মাঝখানের এই দুটি লাইন পুনরায় মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করুন:
"দ্বিতীয় পদ্ধতিতে (খ) অর্থাৎ গ্রাহককে একটি নির্দিষ্ট ওয়েবসাইট থেকে কেনার জন্য উৎসাহিত করা এবং তাকে প্রস্তুত করার মাধ্যমে কমিশন নেওয়া নিম্নোল্লিখিত শর্ত সাপেক্ষে বৈধ হবে। উপরোল্লিখিত অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে সম্পাদিত লেনদেন চুক্তি সাধারণত এমনই হয়ে থাকে।"
লক্ষ্য করুন! জামিয়া বিন্নুরি টাউন প্রথমে প্রশ্নে রিসেলিং অ্যাপসের (Meesho, GlowRoad ইত্যাদিতে ১০০ টাকার পণ্যে ৩০ টাকা যোগ করে ১৩০ টাকায় বিক্রির) বিবরণ দিয়েছে। এরপর তারা ফিকহী মূলনীতি বোঝানোর জন্য দুটি সম্ভাব্য সুরত (ক ও খ) উল্লেখ করে চূড়ান্ত রায়ে স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে যে— এই অ্যাপ্লিকেশনগুলোর লেনদেন সাধারণত দ্বিতীয় পদ্ধতিতে (অর্থাৎ ‘খ’ নম্বর—কমিশন এজেন্ট বা সিমসার হিসেবে) হয়ে থাকে এবং তা ৭টি সাধারণ শরয়ী শর্ত সাপেক্ষে সম্পূর্ণ বৈধ!
আর আপনার প্রথম প্রশ্নের জবাবে আমরাও ঠিক এই কথাটিই বলেছিলাম যে—আপনার ভাই যে কোম্পানিতে কাজ করেন, সেখানকার রিসেলাররা মূলত ‘ব্রোকার’ (سمسار) বা ‘কমিশন এজেন্ট’ (وكيل بالأجرة) হিসেবে কাজ করছেন, তাই তা হালাল!
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, কোম্পানি দাম নির্ধারণ করল ১০০ টাকা, আর রিসেলার নিজের ইচ্ছামতো ৩০ টাকা যোগ করে ১৩০ টাকায় কাস্টমার ধরল—এভাবে অতিরিক্ত টাকাটা কমিশন হিসেবে নেওয়া কি জায়েজ? হ্যাঁ, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন এবং হানাফী মাযহাবের ফতোয়া অনুযায়ী এটি ‘সিমসার’ (দালালি/ব্রোকারেজ) হিসেবে সম্পূর্ণ জায়েজ।
সাহাবী হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) ও তাবেয়ীগণের ফতোয়া:
ইমাম বুখারী (রহ.) তাঁর সহীহ বুখারীতে উল্লেখ করেন, রঈসুল মুফাসসিরীন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন: "যদি কেউ কাউকে বলে যে, এই কাপড়টি বিক্রি করো, অতঃপর অমুক নির্দিষ্ট মূল্যের (যেমন ১০০ টাকার) ওপরে যা অতিরিক্ত বিক্রি করতে পারবে, তা তোমার (কমিশন)—এতে কোনো অসুবিধা নেই (সম্পূর্ণ জায়েজ)।" প্রখ্যাত তাবেয়ী ইমাম ইবনে সিরীন (রহ.) বলেন: "যদি বলে এটি এত দামে বিক্রি করো, এর ওপরে যা লাভ হবে তা তোমার অথবা তোমার ও আমার মাঝে ভাগ হবে—তবে এতে কোনো সমস্যা নেই।"
— (সহীহ বুখারী, কিতাবুল ইজারাহ, বাবু আজরিস সামসারাহ: ২/৭৯৫; মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক: ৮/২৩৫)আপনার দেওয়া বিন্নুরি টাউনের ফতোয়ার একদম নিচে সূত্র দেওয়া হয়েছে: [দুররে মুখতার ও হাশিয়ায়ে ইবনে আবেদীন ৬/৬৩]। আসুন দেখে নিই, আল্লামা ইবনে আবিদীন শামী হানাফী (রহ.) ওই ৬ষ্ঠ খণ্ডের ৬৩ পৃষ্ঠায় কী লিখেছেন:
অনুবাদ: "(দালাল বা কমিশন এজেন্টের পারিশ্রমিক প্রসঙ্গ): ‘আল-হাওয়ী’ গ্রন্থে রয়েছে, ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে সালামা (রহ.)-কে সিমসার বা কমিশন এজেন্টের পারিশ্রমিক সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন: আমি আশা করি এতে কোনো অসুবিধা নেই। যদিও মূল কিয়াস অনুযায়ী (পারিশ্রমিক বা কাজের মেয়াদ অনির্দিষ্ট হওয়ার কারণে) তা ফাসিদ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু মানুষের ব্যাপক প্রচলন (তাআমুল/উরফ) এবং জনসাধারণের প্রয়োজনের খাতিরে ফুকাহায়ে কেরাম একে জায়েজ সাব্যস্ত করেছেন।"
— (রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার [ফতোয়ায়ে শামী]: ৬/৬৩, কিতাবুল ইজারাহ)অতএব প্রমাণিত হলো, বিন্নুরি টাউন ফতোয়ায়ে শামীর এই ৬/৬৩ পৃষ্ঠার দলীল দিয়েই রিসেলারদের ওই ৩০ টাকা মুনাফা নেওয়াকে ‘উজরাতুস সিমসার’ (কমিশন এজেন্টের বৈধ পারিশ্রমিক) হিসেবে হালাল ফতোয়া দিয়েছে!
বিন্নুরি টাউন এবং আমাদের ফতোয়া বিভাগের অবস্থান অত্যন্ত সুস্পষ্ট। রিসেলিং বা ড্রপশিপিংয়ে দুটি সুরত হতে পারে:
প্রিয় ভাই সাদেক খান, আপনার প্রথম প্রশ্নটি ছিল আপনার ভাইয়ের চাকরি নিয়ে—যিনি মূল কোম্পানিতে পণ্যের ছবি তোলা, প্যাকেজিং করা, স্টক করা এবং পার্সেল পাঠানোর কাজ করেন।
বিন্নুরি টাউনের ফতোয়া এবং ফতোয়ায়ে শামীর আলোকে এটি শতভাগ প্রমাণিত যে, উক্ত কোম্পানির ব্যবসায়িক মডেলটি (পদ্ধতি ‘খ’ অনুযায়ী) মৌলিকভাবে বৈধ। আর তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেওয়া হয় যে, কোম্পানির ১০০০ জন রিসেলারের মধ্যে ২-৪ জন রিসেলার ব্যক্তিগতভাবে প্রচারণার সময় কোনো শরয়ী শর্ত লঙ্ঘন করছে (যেমন: পণ্যের মিথ্যা প্রশংসা করছে বা মিউজিক দিয়ে ভিডিও বানাচ্ছে), তার গুনাহের দায়ভার ওই নির্দিষ্ট রিসেলারের ওপরই বর্তাবে; আপনার ভাইয়ের ওপর বা মূল কোম্পানির হালাল পণ্যের ওপর নয়। পবিত্র কুরআনের অকাট্য মূলনীতি হলো:
"কেউ অন্য কারো পাপের বোঝা বহন করবে না।"
— (সূরা আল-আনআম, আয়াত: ১৬৪)আপনার ভাই কোনো নাজায়েজ কাজে শরিক নন; তিনি বৈধ পণ্যের স্টকিং ও প্যাকেজিং করছেন, যা ফিকহে হানাফীর দৃষ্টিতে নিখাদ ‘ইজারাহ সহীহাহ’ (বৈধ শ্রমচুক্তি)।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে ও আপনার পরিবারকে ইলমে নাফে ও হালাল রিজিকের ওপর অবিচল রাখুন। (আমীন) আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।
WhatsApp us