ইসলামিক প্রশ্নোত্তর - সন্দেহজনক লেনদেনের টাকা ব্যবসায় খাটানো ও লভ্যাংশের বিধান
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيم

ফতোয়া ও মাসআলা বিভাগ

প্রশ্নকারী: MD HABIBUR RAHMAN

জিজ্ঞাসা: এক লোক আমার কাছে এমএফএস (MFS)-এর মাধ্যমে টাকা পাঠিয়েছে। এখন ওই লেনদেনটি সন্দেহজনক হওয়ায় আমি অফিসে জানাই। অফিস থেকে বলা হয়েছে আয়ের প্রমাণ দেখালে এবং তাদের জানিয়ে টাকা দিতে, নয়তোবা আমি বিপদে পড়ব। ওই লোক আসবে বলে আর আসে না। এখন আমার করণীয় কী? এবং ওই টাকা দোকানে খেটে লাভ হচ্ছে—এখন সে যদি কোনোদিন আসে, তাকে কি লভ্যাংশসহ দিতে হবে নাকি তার শুধু পাওনা টাকাটাই দিতে হবে?

ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

সম্মানিত ভাই মো. হাবিবুর রহমান, আপনার ব্যবসায়িক সচেতনতা, সততা এবং হালাল-হারাম যাচাই করার এই মানসিকতা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। বর্তমান যুগে মোবাইল ব্যাংকিং (MFS যেমন: বিকাশ, নগদ, রকেট ইত্যাদি) প্রতারণা বা হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে। এমন পরিস্থিতিতে আপনি অফিসকে জানিয়ে যে সতর্কতা অবলম্বন করেছেন, তা ইসলামী শরীয়ত এবং রাষ্ট্রীয় আইন—উভয় দৃষ্টিতেই শতভাগ সঠিক হয়েছে। কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা এবং হানাফী মাযহাবের নির্ভরযোগ্য ফিকহের আলোকে আপনার প্রশ্নগুলোর বিস্তারিত ও দালিলিক সমাধান নিচে প্রদান করা হলো:

১. সন্দেহজনক লেনদেনের ক্ষেত্রে আপনার প্রাথমিক করণীয়

ইসলামী শরীয়তের অন্যতম প্রধান মূলনীতি হলো, কোনো মুসলমান নিজেকে জেনেশুনে বিপদে ফেলবে না এবং অন্যের ক্ষতির কারণও হবে না। রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) ইরশাদ করেছেন:

لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ

"ইসলামে নিজের ক্ষতি করাও জায়েজ নেই এবং অন্যের ক্ষতি করাও জায়েজ নেই।"

— (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং: ২৩৪০; মুয়াত্তা ইমাম মালেক)

যেহেতু লেনদেনটি সন্দেহজনক এবং এমএফএস (MFS) হেড অফিস আপনাকে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে যে, বৈধ আয়ের প্রমাণ ও তাদের ক্লিয়ারেন্স ছাড়া টাকা দিলে আপনি আইনি বিপদে পড়বেন, তাই উপযুক্ত প্রমাণ ও অফিসের অনুমতি ছাড়া ওই ব্যক্তিকে টাকা দেওয়া আপনার জন্য জায়েজ হবে না। প্রতারক চক্র অনেক সময় অন্যের টাকা হ্যাক করে এজেন্টের মাধ্যমে ক্যাশ-আউট করে নেয়, এবং পরে আসল মালিক মামলা করলে এজেন্ট বিপদে পড়েন। তাই অফিসের শর্ত পূরণ না করা পর্যন্ত টাকাটি আপনার কাছেই সংরক্ষিত থাকবে।

২. ওই ব্যক্তি প্রমাণসহ ফিরে আসলে তাকে কি লভ্যাংশসহ দিতে হবে, নাকি শুধু আসল টাকা?

হানাফী মাযহাবের অকাট্য ফয়সালা: সে কেবল আসল টাকাটাই পাবে, লভ্যাংশ পাবে না

ওই ব্যক্তি যদি ভবিষ্যতে কখনো বৈধ প্রমাণ নিয়ে উপস্থিত হয় এবং অফিস ক্লিয়ারেন্স দেয়, তবে তাকে শুধুমাত্র তার পাঠানো 'আসল টাকা' (Principal Amount) ফেরত দিতে হবে; এক টাকাও অতিরিক্ত বা লভ্যাংশ তাকে দিতে হবে না।

দলীল ও ফিকহী বিশ্লেষণ:

ওই ব্যক্তি আপনার সাথে কোনো ব্যবসায়িক চুক্তি (যেমন: মুদারাবা বা অংশীদারি ব্যবসা) করেনি। তদুপরি, এই টাকাটি আপনার দোকানে খাটার সময় যদি আপনার ব্যবসায় কোনো লোকসান হতো বা টাকাটা চুরি হয়ে যেত, তবে ওই ব্যক্তি কিন্তু সেই লোকসানের ভাগ নিত না; বরং আপনাকে আপনার পকেট থেকে তার পুরো আসল টাকাই ফেরত দিতে হতো (অর্থাৎ এই টাকার সম্পূর্ণ ঝুঁকি বা 'দামান' আপনার ওপরই ছিল)।

ইসলামী অর্থনীতির অকাট্য মূলনীতি হলো, যে ব্যক্তি ব্যবসায়িক ঝুঁকি বহন করে না, সে লভ্যাংশেরও অধিকারী হয় না। রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) ইরশাদ করেছেন:

الْخَرَاجُ بِالضَّمَانِ

"মুনাফা বা লভ্যাংশ অর্জনের অধিকার কেবল তারই, যে লোকসানের ঝুঁকি (দামান) গ্রহণ করে।"

— (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ৩৫০৮; জামে তিরমিযী, হাদিস নং: ১২৮৫)

হানাফী মাযহাবের সকল ইমামের (ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ রহ.) ইজমা বা ঐকমত্য হলো—অন্যের টাকা নিজ ব্যবসায় খাটালে মূল টাকার মালিক কখনোই লভ্যাংশ দাবি করতে পারবে না; কারণ এটি তার জন্য 'রিবহু মা লাম ইউদমান' (ঝুঁকিহীন মুনাফা বা সুদের সাদৃশ্য) হয়ে যাবে।

وَلَا يَكُونُ الرِّبْحُ لِمَالِكِ الْأَصْلِ بِالْإِجْمَاعِ؛ لِأَنَّهُ رِبْحُ مَا لَمْ يُضْمَنْ، وَقَدْ نَهَى رَسُولُ اللَّهِ ﷺ عَنْ رِبْحِ مَا لَمْ يُضْمَنْ

"সকল ইমামের ঐকমত্যে অর্জিত মুনাফা মূল টাকার মালিকের হবে না; কারণ তা ঝুঁকিহীন মুনাফা, আর রাসূলুল্লাহ (সা.) ঝুঁকিহীন মুনাফা ভোগ করতে নিষেধ করেছেন।"

— (আল-মাবসূত লিস-সারাখসী: ১১/৭৭; বাদায়েউস সানায়ে: ৭/১৪৮)

৩. দোকানে খাটিয়ে যে লভ্যাংশ হচ্ছে, তা আপনার জন্য হালাল হবে কি?

এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সূক্ষ্ম ফিকহী মাসআলা রয়েছে, যা আপনার জেনে রাখা জরুরি:

  • এমএফএস (MFS) ওয়ালেটের প্রকৃতি ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মত: মোবাইল ব্যাংকিংয়ে কেউ যখন এজেন্ট বা মার্চেন্ট একাউন্টে ডিজিটাল ব্যালেন্স (ই-মানি) পাঠায়, তখন তা আলাদা কোনো লকারে বা পুটলিতে থাকে না; বরং সিস্টেমের নিয়মেই তা এজেন্টের মূল ব্যালেন্সের সাথে মিশে যায় এবং প্রতিদিনের রিচার্জ বা লেনদেনে ঘুরতে থাকে। এখানে এজেন্টের মূল দায়িত্ব হলো সমপরিমাণ ক্যাশ টাকা পরিশোধের গ্যারান্টি বা দায়ভার (ضمان) গ্রহণ করা। যেহেতু আপনি সমপরিমাণ আসল টাকা ফেরত দেওয়ার পূর্ণ ঝুঁকি বহন করছেন এবং নিজের শ্রম দিচ্ছেন, তাই ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর ফতোয়া এবং আধুনিক লেনদেনের 'উরফ' (প্রচলিত রীতি) অনুযায়ী এই লভ্যাংশ আপনার জন্য বৈধ হবে।
  • তাকওয়া ও ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর সতর্কতামূলক মত: তবে ফিকহে হানাফীর মূল ফতোয়া (ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মুহাম্মাদ রহ.-এর মত) অনুযায়ী, কারো আমানতের টাকা তার সুস্পষ্ট অনুমতি ছাড়া ব্যবসায় খাটালে সেই টাকার অনুপাতে যেটুকু লাভ আসে, তা ভোগ করা মাকরূহ এবং তাকওয়ার পরিপন্থী। তাঁদের মতে, আসল টাকা মালিককে ফেরত দিতে হবে আর শুধুমাত্র ওই টাকার অংশ থেকে যেটুকু লাভ এসেছে, তা গরিব-মিসকিনকে সদকা করে দিতে হবে।
وَإِذَا تَصَرَّفَ الْمُودَعُ أَوِ الْغَاصِبُ فِي الْمَالِ فَرَبِحَ، فَعِنْدَ أَبِي حَنِيفَةَ وَمُحَمَّدٍ يَتَصَدَّقُ بِالرِّبْحِ، وَقَالَ أَبُو يُوسُفَ: يَطِيبُ لَهُ الرِّبْحُ لِأَنَّهُ ضَمِنَ الْأَصْلَ
— (আল-হেদায়া: ৪/৩০০; রদ্দুল মুহতার বা ফতোয়ায়ে শামী: ৬/১৮৯)

আমাদের পরামর্শ: যেহেতু এমএফএস একাউন্টে টাকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবসার ব্যালেন্সের সাথে মিশে যায়, তাই আপনি গুনাহগার হবেন না। তবে তাকওয়া ও অধিকতর পবিত্রতার দাবি হলো—আপনার দোকানে ওই টাকার আনুপাতিক হারে আনুমানিক যে সামান্য লভ্যাংশ হয়েছে বলে মনে হয়, তা নিজের কাজে ব্যবহার না করে কোনো গরিবকে দান (সদকা) করে দেবেন এবং ওই ব্যক্তির আসল টাকা পরিমাণ ক্যাশ আলাদা করে বা প্রস্তুত রাখবেন।

৪. লোকটি যদি আর কখনোই না আসে, তবে আসল টাকার কী করবেন?

যেহেতু লেনদেনটি সন্দেহজনক ছিল এবং অফিস প্রমাণ চাওয়ায় লোকটি ভয়ে আর আসছে না, তাই প্রবল ধারণা (ظن غالب) হলো এটি কোনো প্রতারণার টাকা। এক্ষেত্রে আপনার করণীয় হলো:

  1. প্রথমে এমএফএস (MFS) কোম্পানির সাথে যোগাযোগ করে জানুন যে, এই টাকার বিপরীতে কোনো ভুক্তভোগী (যার থেকে টাকা হ্যাক বা প্রতারণা করা হয়েছে) অভিযোগ করেছে কি না, অথবা কোম্পানি টাকাটি 'রিভার্স' (Reverse/ফেরত) নেবে কি না। কোম্পানি যদি প্রমাণের ভিত্তিতে আসল ভুক্তভোগীকে টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করে, তবে কোম্পানির মাধ্যমে তা দিয়ে দেবেন।
  2. যদি কোম্পানিও টাকাটি না নেয় এবং দীর্ঘদিন অপেক্ষা করার পরও ওই লোক বা টাকার প্রকৃত মালিকের কোনো সন্ধান পাওয়ার আশা সম্পূর্ণরূপে শেষ হয়ে যায় (اليأس عن صاحبه), তবে ইসলামী ফিকহে এই টাকাকে 'মাল মাজহুলুল মালিক' (مجهول المالك - অজ্ঞাত মালিকের সম্পদ) বা 'লুকাতাহ' বলা হয়।
  3. হানাফী মাযহাবের বিধান অনুযায়ী, মালিক পাওয়ার আশা সম্পূর্ণ শেষ হয়ে গেলে ওই আসল টাকাটুকু প্রকৃত মালিকের সওয়াবের নিয়তে কোনো গরিব-মিসকিনকে সদকা করে দিতে হবে। তবে শর্ত হলো, সদকা করার পরও যদি কোনোদিন প্রকৃত মালিক বৈধ প্রমাণ ও অফিসের ক্লিয়ারেন্স নিয়ে হাজির হয়, তখন তাকে আপনার নিজ থেকে ওই আসল টাকা পরিশোধ করতে হবে (তখন আপনার করা সদকার সওয়াব আপনি নিজেই পেয়ে যাবেন)।
وَإِذَا أَيِسَ مِنْ صَاحِبِهِ تَصَدَّقَ بِهِ، فَإِنْ جَاءَ صَاحِبُهُ خَيَّرَهُ بَيْنَ إِمْضَاءِ الصَّدَقَةِ وَبَيْنَ ضَمَانِ الْمَالِ

"যখন মালিকের সন্ধান পাওয়া থেকে সম্পূর্ণ নিরাশ হয়ে যাবে, তখন তা সদকা করে দেবে। অতঃপর যদি কখনো মালিক চলে আসে, তবে তাকে ইখতিয়ার দেবে—হয়তো সে সদকা অনুমোদন করবে, নতুবা (দোকানদার) তাকে মূল টাকা পরিশোধ করে দেবে।"

— (আল-হেদায়া: ২/৪১৬, কিতাবুল লুকাতাহ; ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া: ২/২৮৯)

এক নজরে আপনার জন্য চূড়ান্ত নির্দেশনা

  1. অফিসের ক্লিয়ারেন্স ও বৈধ প্রমাণ ছাড়া ওই ব্যক্তিকে ভুলেও টাকা দেবেন না।
  2. ওই ব্যক্তি কখনো প্রমাণসহ আসলে তাকে শুধুমাত্র তার আসল পাওনা টাকাটাই দেবেন; দোকানের কোনো লভ্যাংশ তাকে দিতে হবে না।
  3. তাকওয়ার খাতিরে ওই টাকার সমপরিমাণ ক্যাশ মূলধন থেকে আলাদা করে রেখে দেওয়া উত্তম, যাতে তা ব্যবসায় না খাটে। আর ইতিমধ্যে খাটার কারণে আনুমানিক যেটুকু লাভ হয়েছে, তা গরিবকে সদকা করে দিলে আপনার ব্যবসা শতভাগ সন্দেহমুক্ত থাকবে।
  4. দীর্ঘদিন পর যদি প্রমাণিত হয় যে কেউই আর এই টাকা দাবি করছে না এবং অফিসও তা ফেরত নিচ্ছে না, তবে আসল টাকাটি প্রকৃত মালিকের নিয়তে গরিবদের দান করে দেবেন।

আল্লাহ তাআলা আপনার হালাল ব্যবসায় বরকত দান করুন এবং সব ধরনের বিপদাপদ থেকে হেফাজত করুন। (আমীন) আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।