ইসলামিক প্রশ্নোত্তর - দুধ পানের পরিমাণ ও বিবাহের বিধান
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيم

ফতোয়া ও মাসআলা বিভাগ

প্রশ্নকারী: ইরফান

প্রশ্ন: এক নারীর দুবছরের মধ্যে দুধ পান করা হয়েছে এটা নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু কতটুকু পরিমাণ এটা জানা নেই। পরিমাণ কতটুকু হবে এ নিয়ে মতভেদ আছে! ১) তাহলে কারটা মানবো? তাহলে কি তার মেয়ে বিয়ে করা জায়েজ হবে? ২) কার দলিল শক্তিশালী? ৩) যদি ওই মেয়েকে বিয়ে করা হারাম হয়, তবে কি বাকি জীবনের জন্য শাফেয়ী মাহজাব গ্রহণ করে বিয়ে করতে পারবো? ৪) আমি ওই মেয়েকে পছন্দ করি, কি সিদ্ধান্ত নেব তা নিয়ে খুবই হীনমন্যতায় ভুগছি! কোনটা তাকওয়ার নিকটবর্তী? ৫) যদি হারাম হয়, তবে নিজের মনকে কিভাবে সান্ত্বনা দেব?

ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

প্রিয় ভাই ইরফান, আমরা আপনার মনের অবস্থা এবং মানসিক টানাপোড়েন গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারছি। যখন শয়তান এবং নিজের প্রবৃত্তি (নফস) কোনো জিনিসের প্রতি আসক্ত হয়ে যায়, তখন মানুষ দ্বীনের ভেতরে ফাঁকফোকর খোঁজার চেষ্টা করে। কিন্তু একজন সাচ্চা মুমিনের পরিচয় হলো, যখন আল্লাহর বিধান সামনে আসে, তখন সে নিজের সমস্ত পছন্দ ও খায়েশকে আল্লাহর হুকুমের সামনে কুরবানি করে দেয়। হানাফী ফিকহ, কুরআন, সুন্নাহ এবং তাকওয়ার মানদণ্ডে আপনার প্রতিটি প্রশ্নের অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও দালিলিক উত্তর নিচে প্রদান করা হলো:

১ ও ২. দুধ পানের পরিমাণ এবং কার দলিল শক্তিশালী?

যেহেতু ২ বছরের (চন্দ্র মাস) মধ্যে দুধ পান করার বিষয়টি নিশ্চিত, তাই হানাফী মাযহাব অনুযায়ী দুধের পরিমাণ যাই হোক না কেন—এক ফোঁটা হোক বা এক ঢোক হোক, তার দ্বারা 'হুরমতে রাযাআত' (দুধপানের কারণে হারাম হওয়া) সাব্যস্ত হয়ে গেছে। সুতরাং, ওই নারীর মেয়েটি আপনার দুধ-বোন এবং তাকে বিবাহ করা আপনার জন্য সম্পূর্ণ হারাম।

قَلِيلُ الرَّضَاعِ وَكَثِيرُهُ سَوَاءٌ إذَا حَصَلَ فِي مُدَّةِ الرَّضَاعِ

হানাফী ফিকহের বিখ্যাত গ্রন্থ 'আল-হেদায়া'-তে বলা হয়েছে: "দুধপানের নির্দিষ্ট মেয়াদের (২ বছর) মধ্যে দুধ পান করলে, তা কম হোক বা বেশি হোক—উভয়ের হুকুম সমান (অর্থাৎ বিবাহ হারাম)।"

— (আল-হেদায়া: ২/৩৫৩)

হানাফী মাযহাবের দলীল কেন সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী?

ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর মতে ৫ বার পেট ভরে দুধ পান করা শর্ত। কিন্তু ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এবং ইমাম মালেক (রহ.)-এর মতে এক ফোঁটা দুধ পান করলেও হারাম হয়ে যায়। এর কারণ হলো, হানাফী মাযহাবের দলীল সরাসরি পবিত্র কুরআনের 'আম' (সাধারণ) আয়াত থেকে গৃহীত:

وَأُمَّهَاتُكُمُ اللَّاتِي أَرْضَعْنَكُمْ وَأَخَوَاتُكُم مِّنَ الرَّضَاعَةِ

"...এবং তোমাদের ওই মাতাগণ যারা তোমাদেরকে দুধ পান করিয়েছে এবং তোমাদের দুধ-বোনদেরকে (তোমাদের ওপর হারাম করা হয়েছে)।"

— (সূরা আন-নিসা: ২৩)

এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা কোনো পরিমাণের কথা উল্লেখ করেননি। সামান্য দুধ পান করালেও তাকে 'দুধ পান করানো' বলা হয়। তদুপরি, বুখারী শরীফের মুতাওয়াতির পর্যায়ের হাদিস: "الرَّضَاعَةُ تُحَرِّمُ مَا تُحَرِّمُ الْوِلَادَةُ" (জন্মগত কারণে যারা হারাম হয়, দুধপানের কারণেও তারা হারাম হয়)—এখানেও কোনো পরিমাণের কথা নেই। তাই উসুলুল ফিকহের নিয়মানুযায়ী, কুরআনের সাধারণ নির্দেশকে কোনো একক বর্ণনার (খবরে ওয়াহেদ) দ্বারা নির্দিষ্ট (খাস) করা যায় না। এ কারণেই হানাফী মাযহাবের মতটি সবচেয়ে বেশি অকাট্য ও শক্তিশালী।

৩. নিজের খায়েশ মেটানোর জন্য শাফেয়ী মাযহাব গ্রহণ করার হুকুম

তাত্তাব্বুউর রুখাস (تتبع الرخص) বা নিজের নফসের অনুসরণ

যে ব্যক্তি জন্মগতভাবে হানাফী মাযহাব অনুসরণ করে আসছেন, তিনি যদি হঠাৎ করে শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট মেয়েকে (যাকে হানাফী মাযহাবে হারাম বলা হয়েছে) বিয়ে করার খায়েশ বা প্রবৃত্তি মেটানোর উদ্দেশ্যে শাফেয়ী মাযহাব গ্রহণ করেন, তবে ইসলামী শরীয়তে এটি সম্পূর্ণ হারাম এবং ফিসক (মারাত্মক গুনাহ)। ফিকহের পরিভাষায় একে 'তাত্তাব্বুউর রুখাস' (বিভিন্ন মাযহাব থেকে শুধু নিজের সুবিধামতো ফতোয়া বেছে নেওয়া) বলা হয়।

تَتَبُّعُ الرُّخَصِ اتِّبَاعٌ لِلْهَوَى وَهُوَ حَرَامٌ

"মাযহাবগুলোর সহজ বা সুবিধাজনক মতগুলো খুঁজে বের করে আমল করা মূলত নফসের অনুসরণ, যা হারাম।"

— (রদ্দুল মুহতার: ১/৭৫; শারহুল মুহাযযাব)

দ্বীন হলো আল্লাহর আনুগত্যের নাম, নিজের মন যা চায় তা করার নাম দ্বীন নয়। তাই এই অজুহাতে মাযহাব পরিবর্তন করা আপনার জন্য নাজায়েজ হবে।

৪. তাকওয়ার দাবি কী?

তাকওয়া হলো সন্দেহযুক্ত বিষয় বর্জন করা

তাকওয়া মানে কেবল নামাজ-রোজা নয়; তাকওয়া মানে হলো যে কাজে গুনাহ হওয়ার বিন্দুমাত্র সন্দেহ আছে, আল্লাহর ভয়ে তা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া।

دَعْ مَا يَرِيبُكَ إِلَى مَا لاَ يَرِيبُكَ

রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) বলেন: "যা তোমাকে সন্দেহে ফেলে তা বর্জন করে ওই বিষয়ের দিকে যাও, যা তোমাকে সন্দেহে ফেলে না।"

— (জামে তিরমিযী, হাদিস নং: ২৫১৮)

হানাফী মাযহাব অনুযায়ী এই মেয়েটির সাথে আপনার বিবাহ যিনা (ব্যভিচার)-এর সমতুল্য হবে। যেখানে এত বড় একটি মারাত্মক হারাম হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, সেখানে তাকওয়ার অকাট্য দাবি হলো—এই মেয়ের আশা চিরতরে মন থেকে মুছে ফেলা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাকে ছেড়ে দেওয়া।

৫. মনকে কীভাবে সান্ত্বনা দেবেন?

ভাই ইরফান, ভালোবাসা অন্ধ হলেও, একজন মুমিনের ঈমান কখনো অন্ধ হয় না। আপনি ভাবছেন এই মেয়েটি না পেলে আপনার জীবন বৃথা, কিন্তু আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে আপনার এই মানসিক অবস্থার চমৎকার সান্ত্বনা দিয়েছেন:

وَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ ۖ وَعَسَىٰ أَن تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ ۗ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ

"হতে পারে কোনো বিষয় তোমরা অপছন্দ করছ, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর হতে পারে কোনো বিষয় তোমরা পছন্দ করছ, অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহই জানেন, আর তোমরা জানো না।" (সূরা আল-বাকারা: ২১৬)

রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) একটি অভাবনীয় পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন:

إِنَّكَ لَنْ تَدَعَ شَيْئًا لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ إِلَّا بَدَّلَكَ اللَّهُ بِهِ مَا هُوَ خَيْرٌ لَكَ مِنْهُ

"নিশ্চয়ই তুমি যখন শুধুমাত্র মহামহিম আল্লাহর ভয়ে (হারাম জেনে) কোনো কিছু ছেড়ে দেবে, আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তোমাকে তার চেয়ে বহুগুণ উত্তম কিছু দান করবেন।"

— (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং: ২০৭৩৯)

সারসংক্ষেপ ও আপনার জন্য চূড়ান্ত ফয়সালা

  1. হানাফী মাযহাব অনুযায়ী এক ফোঁটা দুধ পান করলেও বিবাহ হারাম হয়ে যায়। তাই ওই মেয়ে আপনার জন্য হারাম।
  2. কুরআনের সাধারণ আয়াতের ভিত্তিতে হানাফী মাযহাবের দলীল অকাট্য।
  3. নিজের প্রবৃত্তি মেটানোর জন্য এই পরিস্থিতিতে শাফেয়ী মাযহাবে যাওয়ার কোনো শরয়ী অনুমতি নেই।
  4. তাকওয়া হলো আল্লাহর ভয়ে এই সম্পর্ক থেকে নিজেকে চিরতরে গুটিয়ে নেওয়া।
  5. আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করুন। আল্লাহর ভয়ে এই হারামকে বর্জন করলে, আল্লাহ আপনাকে এর চেয়েও উত্তম, রূপবতী এবং নেককার জীবনসঙ্গিনী দান করবেন ইনশাআল্লাহ।

আল্লাহ তাআলা আপনার অন্তরে প্রশান্তি দান করুন এবং ঈমানের ওপর অটল রাখুন। (আমীন)