প্রশ্ন: আসসালামু আলাইকুম। আমি একটি অত্যন্ত জটিল পারিবারিক সমস্যায় ভুগছি। প্রায় ১৫ বছর আগে, শয়তানের প্ররোচনায় আমি আমার আপন নানির উরুতে লিঙ্গ ঘর্ষণ করি এবং এর ফলে আমার বীর্যপাত হয়। কোনো অবস্থাতেই ভেতরে প্রবেশ করেনি। এই মাসআলা না জেনেই পরবর্তীতে আমি আমার নানির ছেলের মেয়েকে (আপন মামাতো বোনকে) বিবাহ করি। আমাদের বিবাহের ৩ বছর পার হয়েছে এবং ১টি সন্তানও রয়েছে। সম্প্রতি আমি জানতে পেরেছি যে, এমন আচরণের কারণে নাকি হুরমতে মুসাহারাত সাব্যস্ত হয় এবং নাতনিকে বিয়ে করা হারাম হয়ে যায়। আমি জানতে চাই— অন্য কোনো মাযহাবের ভিত্তিতে বা হানাফী ফিকহের কোনো বিশেষ অবকাশের আলোকে আমাদের এই সংসারটি টিকিয়ে রাখার কোনো বৈধ পথ আছে কি?
ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
সম্মানিত ভাই রায়হান, আপনার মানসিক পেরেশানি এবং চরম উৎকণ্ঠার বিষয়টি আমরা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারছি। শয়তান অতীত ভুলের ভয় দেখিয়ে মানুষের বর্তমান সুন্দর জীবনকে ধ্বংস করতে চায়। আলহামদুলিল্লাহ, ইসলামী শরীয়ত এবং হানাফী ফিকহ অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ ও বিজ্ঞানভিত্তিক। আপনাকে প্রথমেই একটি সুসংবাদ দিচ্ছি যে, আপনার বর্তমান সংসার ভাঙার কোনোই প্রয়োজন নেই এবং আপনার বিবাহটি হানাফী মাযহাব অনুযায়ীও সম্পূর্ণ শতভাগ সহীহ (বৈধ) রয়েছে। অন্য কোনো মাযহাবে যাওয়ারও প্রয়োজন নেই। নিচে কুরআন, সুন্নাহ ও হানাফী ফিকহের অকাট্য মূলনীতির আলোকে আপনার পেরেশানিমুক্ত হওয়ার দালিলিক সমাধান প্রদান করা হলো:
হানাফী মাযহাবের সাধারণ মূলনীতি হলো, কোনো মাহরাম বা গাইরে মাহরাম নারীকে কামভাবের (شهوة) সাথে স্পর্শ করলে 'হুরমতে মুসাহারাত' সাব্যস্ত হয়। কিন্তু এর একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম (Exception) রয়েছে, যা আপনার ক্ষেত্রে সরাসরি প্রযোজ্য।
সেই ব্যতিক্রমটি হলো— যদি স্পর্শ বা ঘর্ষণের কারণে বীর্যপাত (إنزال) হয়ে যায়, তবে হানাফী ফিকহ অনুযায়ী হুরমতে মুসাহারাত কখনোই সাব্যস্ত হয় না। কারণ, বীর্যপাতের মাধ্যমে কামভাব ওই স্পর্শের পরিবর্তে বীর্যস্খলনের মাধ্যমে শেষ হয়ে যায়।
প্রখ্যাত হানাফী ফতোয়া গ্রন্থ 'ফতোয়ায়ে আলমগীরী' (হিন্দিয়া)-তে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা হয়েছে: "আর যদি সে নারীকে কামভাবের সাথে স্পর্শ করে এবং এর ফলে তার বীর্যপাত হয়ে যায়, তবে হুরমতে মুসাহারাত সাব্যস্ত হবে না। ফতোয়ায়ে কাজীখান গ্রন্থেও এমনটিই রয়েছে।"
— (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া বা আলমগীরী: ১/২৭৪)হানাফী মাযহাবের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ফতোয়া গ্রন্থ 'রদ্দুল মুহতার' (ফতোয়ায়ে শামী)-তে আল্লামা ইবনে আবিদীন (রহ.) বিষয়টি অত্যন্ত চমৎকারভাবে পরিষ্কার করেছেন:
"স্পর্শ করা বা দৃষ্টি দেওয়ার সময় যদি বীর্যপাত হয়ে যায়, তবে তার দ্বারা হুরমতে মুসাহারাত সাব্যস্ত হয় না। কারণ, বীর্যপাতের মাধ্যমে কামভাব নিঃশেষ হয়ে যায়, তা আর বৃদ্ধি পায় না।"
— (রদ্দুল মুহতার বা ফতোয়ায়ে শামী: ৩/৩৩)যেহেতু আপনার বর্ণনানুযায়ী ঘর্ষণের ফলে আপনার বীর্যপাত হয়েছিল এবং কোনো অবস্থাতেই ভেতরে প্রবেশ করেনি (دخول হয়নি), তাই শরীয়তের দৃষ্টিতে আপনার ওই কাজের দ্বারা হুরমতে মুসাহারাত সাব্যস্ত হয়নি। ফলে আপনার নানির নাতনি (আপনার মামাতো বোন) আপনার জন্য হারাম হয়নি।
আপনার মানসিক প্রশান্তির জন্য আরও জানিয়ে রাখছি যে, ইমাম শাফেয়ী (রহ.) এবং ইমাম মালেক (রহ.)-এর মাযহাব অনুযায়ী অবৈধ স্পর্শ বা ব্যভিচারের (যিনা) মাধ্যমে হুরমতে মুসাহারাত একেবারেই সাব্যস্ত হয় না। তাদের মূলনীতি হলো: "الزنا لا يحرم الحلال" (হারাম কাজ কখনো হালাল সম্পর্ককে হারাম করতে পারে না)। সুতরাং, চার মাযহাবের কোনো মাযহাব মতেই আপনার বিবাহ বাতিল হয়নি।
আপনার বর্তমান বিবাহ এবং সংসার ১০০% শরীয়তসম্মত ও হালাল। আপনার সন্তান সম্পূর্ণ বৈধ এবং আপনাদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে বিন্দুমাত্র কোনো সমস্যা নেই। আপনি সমস্ত দুশ্চিন্তা ও কুচিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে নিশ্চিন্তে স্ত্রীর সাথে বসবাস করুন।
তবে আপনার প্রতি শরীয়তের কড়া নির্দেশ হলো: ১৫ বছর আগে নানির সাথে আপনার ওই আচরণটি ছিল অত্যন্ত জঘন্য এবং মারাত্মক একটি কবিরা গুনাহ (হারাম কাজ)। অজ্ঞতাবশত হলেও আল্লাহর কাছে এর জন্য আপনাকে কায়মনোবাক্যে, চোখের পানি ফেলে 'তওবাতুন নাসুহা' (খাঁটি তওবা) করতে হবে। আল্লাহ অত্যন্ত দয়ালু এবং ক্ষমাশীল, তিনি নিশ্চয়ই আপনার তওবা কবুল করবেন।
সতর্কতা: অতীত এই ভুলের কথা সম্পূর্ণ গোপন (সতর) রাখবেন। ভুলেও আপনার স্ত্রী, পরিবার বা অন্য কারও কাছে এই ঘটনা প্রকাশ করবেন না। এটি প্রকাশ করলে পারিবারিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে, যা ইসলামে নিষিদ্ধ।
আল্লাহ তাআলা আপনার তওবা কবুল করুন এবং আপনাদের দাম্পত্য জীবনে রহমত ও বরকত দান করুন। (আমীন) আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।
WhatsApp us