ইসলামিক প্রশ্নোত্তর - অসুস্থ অবস্থায় তালাক ও ভুলে যাওয়ার বিধান
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيم

ফতোয়া ও মাসআলা বিভাগ

প্রশ্নকারী: Mohammed shaed miah

প্রশ্ন: আমার বাবা প্রায় ৭০ বছরের অধিক বয়স। তিনি একজন স্ট্রোক এবং হার্টের রোগী। তিনি আমার মাকে ২ দিনে প্রায় ১০ বার তালাক দিয়েছেন। এখন তিনি বলতেছেন আমি কী বলেছি বলতে পারতেছি না। এখন তিনি কি আগের মতই মায়ের সাথে থাকতে পারবেন? এখন কিন্তু আলাদা থাকতেছেন। আমরা অনেক বুঝিয়েছি কিন্তু আমার মা তিনি আর আমার বাবার সাথে কোনোভাবেই থাকতে চান না। এখন কী করতে পারি, জানালে অনেক উপকারী হবে।

ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

সম্মানিত ভাই মোহাম্মদ সায়েদ মিয়া, বয়োজ্যেষ্ঠ পিতা-মাতার শেষ বয়সে এমন একটি পারিবারিক সংকট অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তবে ইসলামী শরীয়ত মানুষের আবেগ নয়, বরং অকাট্য বিধানের ওপর পরিচালিত হয়। হানাফী ফিকহ, কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আপনার বাবার অসুস্থতা, তালাকের কার্যকারিতা এবং আপনার মায়ের বর্তমান অবস্থানের শরয়ী সমাধান নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. ১০ বার তালাক উচ্চারণের বিধান

তিন তালাক বা তালাকে মুগাল্লাযা কার্যকর হয়ে গেছে

ইসলামী শরীয়তে স্বাধীন পুরুষের হাতে সর্বোচ্চ তিনটি তালাকের অধিকার রয়েছে। কেউ যদি রাগের মাথায় ২ দিনে ১০ বার বা ১০০ বারও তালাক উচ্চারণ করে, তবে শরীয়তের বিধান অনুযায়ী তার ওপর সর্বোচ্চ ৩টি তালাক (তালাকে মুগাল্লাযা বা চূড়ান্ত তালাক) পতিত হয়ে যায়। এর ফলে স্ত্রী তার জন্য সম্পূর্ণ হারাম হয়ে যায়।

فَإِن طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِن بَعْدُ حَتَّىٰ تَنكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ ۗ

"অতঃপর যদি সে তাকে (তৃতীয়) তালাক দেয়, তবে সে নারী তার জন্য আর হালাল থাকবে না, যে পর্যন্ত না সে অন্য স্বামীকে বিবাহ করে।"

— (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৩০)

২. স্ট্রোকের রোগী এবং ভুলে যাওয়ার মাসআলা

আপনার বাবা যেহেতু স্ট্রোকের রোগী, তাই ফিকহী দৃষ্টিকোণ থেকে তার মানসিক ভারসাম্য (عقل) যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। হানাফী ফিকহের মূলনীতি হলো:

كُلُّ طَلَاقٍ جَائِزٌ إِلَّا طَلَاقَ الْمَعْتُوهِ وَالْمَجْنُونِ

"পাগল (মাজনুন) এবং বুদ্ধিভ্রষ্ট (মাতুহ) ব্যক্তি ছাড়া অন্য সকলের তালাক কার্যকর।" (জামে তিরমিযী: ১১৯১)

এখন প্রশ্ন হলো, আপনার বাবা কি ওই ১০ বার তালাক দেওয়ার সময় সম্পূর্ণরূপে জ্ঞানশূন্য (Insane/Delirious) ছিলেন যে তিনি কাকে কী বলছেন তা কিছুই বুঝতে পারছিলেন না? নাকি তিনি রাগের মাথায় সজ্ঞানেই তালাক দিয়েছেন, কিন্তু এখন অনুতপ্ত হয়ে বলছেন "আমি কী বলেছি মনে নেই"?

  • যদি সজ্ঞানে দিয়ে থাকেন: তালাক দেওয়ার সময় যদি তার হিতাহিত জ্ঞান থাকে যে তিনি তার স্ত্রীকেই তালাক দিচ্ছেন, তবে পরবর্তীতে তা ভুলে গেলেও বা অস্বীকার করলেও তালাক শতভাগ কার্যকর হয়ে গেছে। (রদ্দুল মুহতার: ৩/২৪৪)
  • যদি জ্ঞানশূন্য হয়ে থাকেন: স্ট্রোকের কারণে যদি তার মস্তিষ্ক এমন বিকৃত হয়ে থাকে যে, তিনি আকাশ-পাতাল বা দিন-রাতের পার্থক্য বোঝেন না এবং ওই সময় সম্পূর্ণ প্রলাপ বকছিলেন, তবেই কেবল তার তালাক অকার্যকর হবে।

৩. আপনার মায়ের আলাদা থাকার হুকুম

যেহেতু বাহ্যিকভাবে আপনার বাবা ১০ বার তালাক উচ্চারণ করেছেন, তাই শরীয়তের দৃষ্টিতে আপনার মা এখন আর আপনার বাবার বৈধ স্ত্রী নন। আপনার মা যে আপনার বাবার সাথে আর কোনোভাবেই থাকতে চাচ্ছেন না, ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী আপনার মায়ের এই সিদ্ধান্তটিই ১০০% সঠিক এবং তাকওয়াপূর্ণ।

৩ তালাক হয়ে যাওয়ার পর স্বামী-স্ত্রীর একত্রে থাকা, এক ঘরে বসবাস করা বা মেলামেশা করা সম্পূর্ণ হারাম এবং যিনা (ব্যভিচার) সমতুল্য অপরাধ। আপনার মা শরীয়তের বিধানকে সম্মান করেই নিজেকে ওই হারাম সম্পর্ক থেকে দূরে রেখেছেন, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

আপনার পরিবারের জন্য চূড়ান্ত ফয়সালা ও করণীয়

যেহেতু আপনার বাবা একাধিকবার তালাক উচ্চারণ করেছেন এবং পরবর্তীতে "ভুলে গেছি" দাবি করছেন, তাই ইসলামী ফিকহের বিধান অনুযায়ী তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন হয়ে গেছে।

সন্তান হিসেবে এখন আপনাদের করণীয় হলো:
১. মাকে কোনোভাবেই বাবার কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য জোর বা জোরাজুরি করবেন না। এটি করলে আপনারা একটি হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগকারী হিসেবে গুনাহগার হবেন।
২. বয়স্ক বাবা এবং মা উভয়কেই আপনারা সন্তানেরা সমানভাবে দেখাশোনা করবেন, সম্মান করবেন এবং চিকিৎসা চালাবেন। কিন্তু তাদের দুজনকে সম্পূর্ণ আলাদা ঘরে বা আলাদা বাসস্থানে রাখবেন, যাতে তাদের মাঝে কোনোভাবেই দেখা-সাক্ষাৎ বা মেলামেশা না হয়।
৩. যদি আপনাদের মনে বাবার মানসিক ভারসাম্য নিয়ে বিন্দু পরিমাণ সন্দেহ থাকে, তবে এলাকার একজন বিজ্ঞ মুফতি সাহেবের কাছে সশরীরে গিয়ে বাবার অবস্থা বর্ণনা করে নিশ্চিত হয়ে নিতে পারেন। তবে বাহ্যিক বর্ণনানুযায়ী তালাক চূড়ান্ত হয়ে গেছে।

আল্লাহ তাআলা আপনাদের এই পারিবারিক সংকট দূর করুন এবং সকলকে শরীয়তের ওপর অটল থাকার তৌফিক দিন। (আমীন)