ইসলামিক প্রশ্নোত্তর - ড্রপশিপিং ও রিসেলিং ব্যবসার শরয়ী বিধান
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيم

ফতোয়া ও মাসআলা বিভাগ

প্রশ্নকারী: মুহা. তাহমিদ
স্থান: শ্রীপুর, গাজীপুর

প্রশ্ন: আমি greenish trade ltd ও Globalway নামক দুটি রিসেলিং ইকমার্স ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ব্যবসা করি। Globalway-তে একাউন্ট খুলতে ১৪০০ টাকা ফি দিতে হয় (তারা বলে এটা কাজ শেখানোর ক্লাস ফি)। ব্যবসার নিয়ম হলো: তারা ওয়েবসাইটের পণ্যের মূল্য ও বিবরণ দেয়। আমি তা নিয়ে ফেইসবুকে মার্কেটিং করি। কাস্টমার অর্ডার কনফার্ম করলে আমি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তা ডেলিভারি করাই। কাস্টমার পণ্য বুঝে পেলে কোম্পানি আমাকে লভ্যাংশ দেয়। কিন্তু সমস্যা হলো, কাস্টমার পণ্য রিটার্ন করলে কোম্পানি আমার কাছ থেকে ডেলিভারি চার্জ কেটে নেয় (Greenish full চার্জ নেয়, Globalway ১০০ টাকা নেয়)। এখানে আমার জটিলতা মনে হয়: ১. আমার পণ্যের কবজা হয় না। ২. অন্যের পণ্য রিটার্ন হলে আমার ডেলিভারি চার্জ দিতে হয়। এই পদ্ধতিতে ব্যবসা করতে শরয়ী কী কী জটিলতা আছে এবং তার পদ্ধতিগত কী পরিবর্তন করলে হালালভাবে ব্যবসা করা যাবে তা বিস্তারিত জানাবেন।

ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

সম্মানিত ভাই মুহা. তাহমিদ, হালাল উপার্জনের প্রতি আপনার এই সচেতনতা এবং ইসলামী ফিকহের সূক্ষ্ম বিষয়গুলো (কবজা ও চুক্তির বৈধতা) নিয়ে আপনার জানাশোনা সত্যিই প্রশংসনীয়। আধুনিক ই-কমার্সে 'ড্রপশিপিং' (Dropshipping) বা রিসেলিং একটি জনপ্রিয় মডেল হলেও, আপনার বর্ণিত পদ্ধতিটিতে শরীয়তের বেশ কয়েকটি মৌলিক মূলনীতির লঙ্ঘন রয়েছে। হানাফী ফিকহ, কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এই পদ্ধতির জটিলতা এবং হালাল বিকল্পগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. প্রথম সমস্যা: কবজা (Possession) ছাড়া পণ্য বিক্রি করা

ইসলামী ফিকহের অকাট্য বিধান হলো, কোনো পণ্য কিনে তা নিজের কবজায় বা হস্তগত (Possession) করার আগে অন্যের কাছে বিক্রি করা সম্পূর্ণ নাজায়েজ (ফাসিদ)।

عَنْ حَكِيمِ بْنِ حِزَامٍ، قَالَ: أَتَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقُلْتُ: يَأْتِينِي الرَّجُلُ يَسْأَلُنِي مِنَ الْبَيْعِ مَا لَيْسَ عِنْدِي، أَبْتَاعُ لَهُ مِنَ السُّوقِ ثُمَّ أَبِيعُهُ؟ قَالَ: «لَا تَبِعْ مَا لَيْسَ عِنْدَكَ»

হযরত হাকীম ইবনে হিযাম (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم)-এর নিকট এসে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! লোকেরা আমার কাছে এসে এমন পণ্য কিনতে চায় যা আমার কাছে নেই। আমি কি বাজার থেকে কিনে এনে তাদের কাছে বিক্রি করব? নবীজী (সা.) বললেন: "যা তোমার কাছে নেই (তোমার মালিকানায় ও কবজায় নেই), তা তুমি বিক্রি করো না।"

— (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ৩৫০৩; জামে তিরমিযী: ১২৩২)

আপনি যখন ফেসবুকে কাস্টমারের কাছে পণ্যটি বিক্রি করছেন (অর্ডার নিচ্ছেন), তখন আপনি ওই পণ্যের মালিকও নন এবং তা আপনার কবজায়ও নেই। সুতরাং, আপনার জন্য এই ক্রয়-বিক্রয় চুক্তিটি শরীয়তসম্মত হচ্ছে না।

২. দ্বিতীয় সমস্যা: অন্যের পণ্যের ডেলিভারি চার্জ জরিমানা দেওয়া

শরয়ী শর্তের লঙ্ঘন (শর্তে ফাসিদ)

যদি ধরে নেওয়া হয় যে, আপনি কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি বা ব্রোকার (وكيل/سمسار) হিসেবে কাজ করছেন, তবে ইসলামী ফিকহের নিয়ম অনুযায়ী এজেন্ট বা ওকিল হলো 'আমীন' (الوكيل أمين - বিশ্বস্ত আমানতদার)। এজেন্ট কোনো ক্ষতিপূরণ বা ব্যবসায়িক লোকসানের দায়ভার বহন করে না, যদি না সে ইচ্ছাকৃত কোনো অবহেলা (تعدٍّ) করে থাকে। কাস্টমার পণ্য রিসিভ না করলে তা কোম্পানির ব্যবসায়িক ঝুঁকি। এর ডেলিভারি চার্জ আপনার ঘাড়ে চাপানো সম্পূর্ণ জুলুম এবং ইসলামী চুক্তিতে 'শর্তে ফাসিদ' (অবৈধ শর্ত)।

অপরদিকে, যদি বলা হয় আপনি নিজেই বিক্রেতা (Seller), তবে যেহেতু আপনার কবজাই হয়নি, তাই শরীয়ত মোতাবেক আপনি পণ্যটির ব্যবসায়ের ঝুঁকি (ضمان) গ্রহণ করতে পারেন না।

৩. একাউন্ট খোলার ফি (১৪০০ টাকা) প্রসঙ্গে

Globalway যে ১৪০০ টাকা 'ক্লাস ফি' হিসেবে নিচ্ছে, যদি তারা সত্যিই আপনাকে বাস্তবসম্মত ডিজিটাল মার্কেটিং বা ব্যবসার কার্যকর প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে, তবে শিক্ষাদানের পারিশ্রমিক (الإجارة) হিসেবে এই ফি নেওয়া বৈধ। কিন্তু যদি এই ফি নেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হয় তাদের সিস্টেমে ঢোকার জন্য টাকা হাতিয়ে নেওয়া (যা অধিকাংশ MLM বা স্ক্যাম সাইটে দেখা যায়) এবং ক্লাসের নামে শুধু লোক দেখানো ভিডিও দেওয়া হয়, তবে এটি ধোঁকা এবং এই ফি দেওয়া-নেওয়া জায়েজ হবে না।

৪. হালালভাবে ব্যবসা করার শরয়ী সমাধান (বিকল্প পদ্ধতি)

বর্তমান জটিলতা থেকে বাঁচতে এবং ব্যবসাকে ১০০% হালাল করতে আপনাকে নিচের যেকোনো একটি পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে:

  1. পদ্ধতি ১ - ওকালাহ বা ব্রোকারি (সবচেয়ে সহজ): আপনার এবং কোম্পানির চুক্তিতে পরিবর্তন আনতে হবে। আপনি নিজে বিক্রেতা হবেন না; বরং আপনি হবেন কোম্পানির 'মার্কেটিং এজেন্ট' (وكيل)। আপনি কাস্টমারকে বলবেন, "আমি এই কোম্পানির পক্ষ থেকে মার্কেটিং করছি, পণ্যটি তাদের, আমি অর্ডার নিচ্ছি।" বিক্রি সম্পন্ন হলে আপনি নির্দিষ্ট একটি কমিশন (Ujrah) পাবেন। তবে প্রধান শর্ত হলো: কাস্টমার পণ্য রিটার্ন করলে কোম্পানি আপনার থেকে কোনো ডেলিভারি চার্জ কাটতে পারবে না। যদি তারা এই শর্তে রাজি না হয়, তবে এই কোম্পানিগুলোর সাথে কাজ করা আপনার জন্য জায়েজ হবে না।

  2. পদ্ধতি ২ - কবজা হুকমী (Constructive Possession): আপনি যদি নিজেই বিক্রেতা থাকতে চান, তবে কাস্টমারের অর্ডার কনফার্ম হওয়ার পর, প্রথমে আপনাকে ওই পণ্যের পুরো টাকা কোম্পানিকে পরিশোধ করে পণ্যটি কিনে নিতে হবে। এরপর কোম্পানিকে বলবেন, "পণ্যটি আমার, আপনারা আমার পক্ষ থেকে (আমার ওকিল হয়ে) কাস্টমারের ঠিকানায় ডেলিভারি করে দিন।" যেহেতু আপনি আগেই কিনে পণ্যের ঝুঁকি গ্রহণ করেছেন, তাই কাস্টমার রিটার্ন করলে ডেলিভারি চার্জ আপনাকেই বহন করতে হবে (যা তখন সম্পূর্ণ হালাল ও যৌক্তিক)।

সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত ফতোয়া

আপনার বর্তমান ব্যবসার মডেলে কবজা ছাড়াই অন্যের পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে এবং অবৈধভাবে ডেলিভারি চার্জের লোকসান আপনার ওপর চাপানো হচ্ছে। এই দুটি কারণে বর্তমান পদ্ধতিতে আপনার জন্য এই ব্যবসাটি জায়েজ হচ্ছে না।

হালালভাবে ব্যবসা করতে হলে আপনাকে অবশ্যই কোম্পানির সাথে 'মার্কেটিং এজেন্ট' হিসেবে চুক্তি করতে হবে এবং রিটার্ন চার্জের অবৈধ জরিমানা থেকে মুক্ত হতে হবে। অথবা, কাস্টমারকে পণ্য পাঠানোর আগেই আপনাকে কোম্পানির কাছ থেকে পণ্যটি কিনে নিতে হবে।

আল্লাহ তাআলা আপনার হালাল রিযিকের পথকে সুগম করে দিন। (আমীন) আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।