প্রশ্ন: আসসালামু আলাইকুম হুজুর। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী আমার নিকাহ সহিহ হয়েছে কি না জানতে চাই। আমি কনে। নিকাহর সময় আমি এক জায়গায় ছিলাম, আর বর ও ৪ জন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম পুরুষ একই জায়গায় ছিলেন। চারজন সাক্ষীই সব কথা শুনেছেন। আমি আগে বরকে বলেছিলাম, “একজন লোককে বলো, যে আমাদের বিয়ে করিয়ে দেবে।” কিন্তু আমি ওই ব্যক্তিকে সরাসরি “তুমি আমার ওকিল” বলিনি। এরপর ওই ব্যক্তি আমার নাম, বাবার নাম, ঠিকানা ইত্যাদি বলে দেনমোহর নির্ধারণ করে আমার পক্ষ থেকে বিয়ের প্রস্তাব করেন। এরপর আমি ও বর “কবুল” বলি।
প্রশ্ন হলো: ১. আমার ওই কথার মাধ্যমে কি ওই ব্যক্তিকে আমার ওকিল হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছিল? ২. কনে আলাদা জায়গায় থাকলেও, তার ওকিল যদি বর ও সাক্ষীদের সামনে ইজাব করে এবং সবাই তা শুনে, তাহলে হানাফি মতে নিকাহ সহিহ হবে কি? ৩. আমাদের এই নির্দিষ্ট ঘটনার নিকাহ সহিহ হয়েছে কি না দয়া করে পরিষ্কারভাবে জানাবেন। জাযাকাল্লাহু খাইরান।
ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
সম্মানিতা বোন জান্নাত, আলহামদুলিল্লাহ, ইসলামী শরীয়তের বিধান মেনে পবিত্র দাম্পত্য জীবনে প্রবেশ করার জন্য আপনাকে মোবারকবাদ। আধুনিক সময়ে বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করে বিবাহ (যেমন- টেলিফোন বা অনলাইনে বিবাহ) সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে আপনার পদ্ধতিটি শরীয়তের দৃষ্টিতে সবচেয়ে সঠিক ও নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি। হানাফী ফিকহ এবং ইসলামী মূলনীতির আলোকে আপনার প্রশ্নগুলোর দলীলভিত্তিক ও সুস্পষ্ট উত্তর নিচে প্রদান করা হলো:
আপনি বরকে বলেছিলেন, "একজন লোককে বলো, যে আমাদের বিয়ে করিয়ে দেবে।" ইসলামী ফিকহে এটি মূলত পরোক্ষভাবে ওকিল (প্রতিনিধি) নিয়োগের একটি সুস্পষ্ট সম্মতি। তবে যদি ধরেও নেওয়া হয় যে, আপনি সরাসরি ওই ব্যক্তিকে "আপনি আমার ওকিল" বলেননি এবং তিনি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আপনার পক্ষ থেকে প্রস্তাব (ইজাব) করেছেন, তবুও হানাফী ফিকহ অনুযায়ী এটি সম্পূর্ণ বৈধ।
যিনি বিনা অনুমতিতে অন্যের পক্ষে চুক্তি করেন, ফিকহের ভাষায় তাকে 'ফুজুলি' (الفضولي) বলা হয়। ফুজুলির বিবাহের বিধান হলো, যার পক্ষে চুক্তি করা হয়েছে (অর্থাৎ আপনি), তিনি যদি পরবর্তীতে তাতে সম্মতি বা ইজাযত দেন, তবে সেই চুক্তি শতভাগ কার্যকর হয়ে যায়। ফিকহী মূলনীতি হলো:
"পরবর্তীতে প্রদানকৃত সম্মতি, পূর্ববর্তী অনুমতির (ওকালত) মতোই কার্যকর।"
— (মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যাহ, ধারা: ১৪৫৩; রদ্দুল মুহতার: ৩/৮৭)যেহেতু ওই ব্যক্তি প্রস্তাব দেওয়ার পর আপনি নিজে (এবং বর) তা শুনে 'কবুল' বলেছেন, তাই আপনার এই সম্মতির কারণে ওই ব্যক্তির কাজ শরীয়তের দৃষ্টিতে আপনার সরাসরি ওকিল হিসেবেই সাব্যস্ত হয়েছে।
ইসলামী শরীয়তে বিবাহের একটি অন্যতম প্রধান শর্ত হলো 'ইত্তেহাদুল মজলিস' (اتحاد المجلس) বা একই আসরে ইজাব ও কবুল সম্পন্ন হওয়া। টেলিফোন বা ভিডিও কলে যেহেতু বর ও কনে একই মজলিসে শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকেন না, তাই সরাসরি তাদের দুজনের মধ্যে বিবাহ সহীহ হয় না।
তবে, যদি কোনো এক পক্ষ ওকিল (প্রতিনিধি) নিয়োগ করে, তবে ওকিলের মজলিসকেই মূল ব্যক্তির মজলিস হিসেবে গণ্য করা হয়।
বিখ্যাত হানাফী গ্রন্থ 'আল-হেদায়া'-তে বলা হয়েছে: "নিকাহের ক্ষেত্রে ওকিল (প্রতিনিধি) নিয়োগ করা জায়েজ... কারণ মানুষের এর প্রয়োজন রয়েছে।"
— (আল-হেদায়া: ২/৩০৬)আপনার বর্ণনানুযায়ী, আপনার ওকিল (যিনি বিয়ে পড়িয়েছেন), বর এবং ৪ জন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম সাক্ষী শারীরিকভাবে একই স্থানে (একই মজলিসে) উপস্থিত ছিলেন। আপনার ওকিল সবার সামনে ইজাব (প্রস্তাব) করেছেন এবং বর একই আসরে বসে সাক্ষীদের সামনে কবুল করেছেন। শরীয়তের শর্ত অনুযায়ী এটিই হলো দূরবর্তী বিবাহের ১০০% সঠিক ও সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি।
আপনার উল্লেখিত বিবরণ অনুযায়ী, আপনার এই নিকাহ হানাফী মাযহাব অনুযায়ী সম্পূর্ণ সহীহ (বিশুদ্ধ) ও বৈধ হয়েছে। এতে বিন্দুমাত্র কোনো সন্দেহ বা ত্রুটি নেই। আপনার ওকিলের ইজাব এবং বরের কবুল সাক্ষীদের উপস্থিতিতে সম্পন্ন হওয়ার মাধ্যমেই মূলত আপনাদের বিবাহ সম্পন্ন হয়ে গেছে। আপনি দূর থেকে যে 'কবুল' বলেছেন, তা মূলত আপনার ওকিলের কাজের প্রতি আপনার সুনিশ্চিত 'সম্মতি বা ইজাযত' হিসেবে কাজ করেছে, যা বিয়েকে চূড়ান্ত করেছে।
আল্লাহ তাআলা আপনাদের দাম্পত্য জীবনে রহমত, বরকত ও সীমাহীন ভালোবাসা দান করুন। (আমীন)
WhatsApp us