প্রশ্ন: আমার বয়স ২০ বছর। আমার বাবা মৃত। তিনি উত্তরা ব্যাংকে চাকরি করতেন। মা-ও উত্তরা ব্যাংকে চাকরি করেন। আমি জানি এটা ইসলামের দৃষ্টিতে সমস্যাযুক্ত, যেহেতু ব্যাংক সুদভিত্তিক। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে যে, আমার মায়ের যে বয়স, এই বয়সে অন্য ইনকামের পথ পাওয়া খুবই কঠিন। পেলেও যে ইনকাম হবে তা দিয়ে আমাদের সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব। এক্ষেত্রে ফতোয়া কী? এই প্রশ্নটা আমি একদিন আস সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের অফিসে গিয়ে একজন মুফতি সাহেবকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। উনি বলেছিলেন যে, অ্যাকাউন্টের টাকা দিয়ে এক দোকান থেকে স্বর্ণ কিনে অন্য দোকানে বিক্রি করা বা জমি বিক্রি করা। এখন যাই বলুক, বাস্তবতা তো খুবই চ্যালেঞ্জিং। এসব কাজ করা তো খুবই চ্যালেঞ্জিং। এখন আসলে করণীয় কী?
ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রিয় ভাই আরাফ চৌধুরী, আপনার পরিবারের বর্তমান পরিস্থিতি এবং হালাল রিযিক অন্বেষণের প্রতি আপনার এই তীব্র ব্যাকুলতা আমাদের গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। পিতৃহীন একটি পরিবার চালানো কতটা কঠিন বাস্তবতা, তা আমরা অনুধাবন করতে পারছি। আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের সম্মানিত মুফতি সাহেব আপনাকে হয়তো টাকা হালাল করার একটি ব্যবসায়িক পদ্ধতি (হিলা) বাতলে দিয়েছিলেন, কিন্তু আপনার কথা সম্পূর্ণ যৌক্তিক যে—একজন বয়স্ক মায়ের পক্ষে চাকরি করার পাশাপাশি স্বর্ণ বা জমির ব্যবসা করা অবাস্তব এবং অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।
ইসলাম একটি বাস্তবসম্মত ও ভারসাম্যপূর্ণ দ্বীন। কুরআন, হাদিস এবং হানাফী ফিকহের মূলনীতির আলোকে আপনার মায়ের বর্তমান অবস্থা এবং আপনার করণীয় সম্পর্কে শরীয়তের বাস্তবসম্মত ও চূড়ান্ত ফয়সালা নিচে প্রদান করা হলো:
প্রচলিত ব্যাংকগুলো মূলত সুদের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। ইসলামে সুদ খাওয়া, দেওয়া, লেখা এবং এর সাক্ষী হওয়া—সবই সমান অপরাধ ও হারাম।
হযরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: "রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) সুদখোর, সুদদাতা, সুদের চুক্তিপত্র লেখক এবং সুদের সাক্ষীদ্বয়ের ওপর লানত (অভিশাপ) বর্ষণ করেছেন। তিনি বলেছেন, পাপের দিক থেকে এরা সকলেই সমান।"
— (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৫৯৮)তাই সাধারণ অবস্থায় সুদী ব্যাংকে চাকরি করা এবং সেখান থেকে প্রাপ্ত বেতন ভোগ করা জায়েজ নেই।
ইসলামী ফিকহের একটি বিখ্যাত মূলনীতি হলো:
"চরম বাধ্যবাধকতা বা জরুরত হারাম বিষয়কেও (সাময়িকভাবে) বৈধ করে দেয়।" (আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের, ইবনে নুজাইম হানাফী: ৭৩)
যেহেতু আপনার বাবা বেঁচে নেই এবং আপনার মায়ের বয়স বেশি হওয়ায় নতুন কোনো উপযুক্ত কাজ পাওয়া প্রায় অসম্ভব; এই মুহূর্তে যদি তিনি চাকরি ছেড়ে দেন, তবে আপনাদের খাদ্যাভাব, বাসস্থান হারানো বা পথে বসার মতো চরম সংকট তৈরি হবে। শরীয়তের দৃষ্টিতে এটি একটি 'জরুরতে শাদিদাহ' (কঠিন বাধ্যবাধকতা)। এমতাবস্থায়, যতক্ষণ না হালাল কোনো বিকল্প ব্যবস্থা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত শুধুমাত্র 'জীবন ধারণের ন্যূনতম প্রয়োজনে' আপনার মায়ের জন্য ওই চাকরিটি চালিয়ে যাওয়া এবং সেই বেতন দিয়ে সংসার চালানো সাময়িকভাবে জায়েজ ও গুনাহমুক্ত হিসেবে গণ্য হবে ইনশাআল্লাহ।
স্বর্ণ বা জমির ব্যবসা নয়, বরং ইসলামী ফিকহ ও বাস্তবতা অনুযায়ী আপনাদের করণীয় হলো নিম্নরূপ:
আরাফ ভাই, আপনার বয়স এখন ২০ বছর। আপনি এখন সাবালক এবং কর্মক্ষম একজন যুবক। শরীয়তের দৃষ্টিতে এখন পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া আপনার ওপর বর্তায়। আপনার মায়ের এই হারাম কাজ থেকে মুক্তির একমাত্র বাস্তবসম্মত উপায় হলো আপনি নিজে উপার্জন শুরু করা।
পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি, পার্টটাইম চাকরি, ফ্রিল্যান্সিং বা ছোট কোনো হালাল উদ্যোগের মাধ্যমে আপনি আয় করা শুরু করুন। আপনার আয় যেদিন থেকে পরিবারের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবে, ঠিক সেদিনই আপনার মায়ের জন্য ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দেওয়া ফরজ হয়ে যাবে। ততক্ষণ পর্যন্ত আপনাদের এই সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।
চরম নিরুপায় অবস্থা এবং বিকল্প না থাকার কারণে আপনার মায়ের জন্য বর্তমান চাকরি চালিয়ে যাওয়া সাময়িকভাবে জায়েজ। তবে এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। আপনাকে দ্রুত নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে হবে, যাতে আপনার মাকে সম্মানের সাথে এই চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া যায়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ওয়াদা করেছেন, "যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য কোনো না কোনো পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিযিক দেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।" (সূরা আত-তালাক: ২-৩)
আল্লাহ তাআলা আপনার পরিবারকে উত্তম হালাল রিযিক দান করুন এবং আপনাদের জন্য পথ সহজ করে দিন। (আমীন)
WhatsApp us