ইসলামিক প্রশ্নোত্তর - মেসেজ ও ফোনে তালাক এবং দ্বিতীয় বিবাহ
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيم

ফতোয়া ও মাসআলা বিভাগ

প্রশ্নকারী: ফজলে এলাহী

প্রশ্ন: আসসালামু আলাইকুম শাইখ। আমি একজন তালাকপ্রাপ্তা মহিলাকে বিয়ে করতে চাচ্ছি। মহিলার তালাকটি শরীয়াহ সম্মতভাবে হয়েছে কি না জানার জন্য প্রশ্নটি করতেছি। মহিলার স্বামী তাকে ৫/৬ বার মেসেজের মাধ্যমে লিখেছে যে "যাহ তোকে তালাক দিলাম" এবং ফোনকলে ও ৩/৪ বার বলেছে যে "তোকে তালাক দিলাম"। এই তালাকটি শরীয়াহ সম্মতভাবে হয়েছে কি না? আর যদি তালাক হয়ে যায় তবে মহিলাটি কিভাবে ইদ্দত পালন করবে? আর আমি কি মহিলাটিকে বিবাহ করতে পারবো কি না ইদ্দত পালনের পর?

ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

সম্মানিত ভাই ফজলে এলাহী, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট। শরীয়াহসম্মতভাবে জীবনযাপন করার যে আগ্রহ আপনি দেখিয়েছেন, আল্লাহ তাআলা তা কবুল করুন এবং আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। হানাফী ফিকহ, কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আপনার তিনটি প্রশ্নের পর্যায়ক্রমিক উত্তর নিচে প্রদান করা হলো:

১. মেসেজ ও ফোনকলের মাধ্যমে তালাকের হুকুম

ইসলামী শরীয়তে তালাকের ব্যাপারে সরাসরি সম্বোধন করে বলা এবং লিখে পাঠানো—উভয়টিই সমানভাবে কার্যকর। ফিকহের মূলনীতি হলো:

الْكِتَابَةُ كَالْخِطَابِ

"লেখাও সরাসরি সম্বোধন করে কথা বলার মতো (কার্যকর)।"

— (রদ্দুল মুহতার বা ফতোয়ায়ে শামী: ৩/২৪৬)

যেহেতু প্রথম স্বামী মেসেজে ৫/৬ বার এবং ফোনকলে ৩/৪ বার "তোকে তালাক দিলাম" (যাকে শরীয়তের পরিভাষায় 'তালাকে সরীহ' বা সুস্পষ্ট তালাক বলা হয়) বলেছে, তাই উচ্চারণের সাথে সাথেই শরীয়তের বিধান অনুযায়ী তিন তালাক পতিত হয়ে গেছে।

হানাফী মাযহাবের চূড়ান্ত ফতোয়া:

যখন স্বামী সুস্পষ্ট ভাষায় স্ত্রীকে তিন বা ততোধিক বার তালাক দেয়, তখন স্ত্রীর উপর 'তালাকে মুগাল্লাযা' (الطلاق المغلظة) বা চূড়ান্ত তালাক পতিত হয়। এর ফলে তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক সম্পূর্ণরূপে এবং চিরতরে হারাম হয়ে যায়।

وَإِنْ كَانَ طَلَّقَهَا ثَلَاثًا لَمْ تَحِلَّ لَهُ حَتَّى تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ

"আর যদি স্বামী তাকে তিন তালাক দেয়, তবে সে স্ত্রী তার জন্য আর হালাল থাকবে না, যতক্ষণ না সে অন্য কোনো স্বামীকে বিয়ে করে।"

— (আল-হেদায়া: ২/৪০৯; আল-কুরআন, সূরা আল-বাকারা: ২৩০)

সুতরাং, শরীয়াহসম্মতভাবে উক্ত মহিলার তালাক সম্পূর্ণভাবে কার্যকর হয়ে গেছে এবং তিনি এখন পূর্বের স্বামী থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত।

২. ইদ্দত পালনের বিধান

তালাকপ্রাপ্তা হওয়ার পর নারীকে অবশ্যই ইদ্দত পালন করতে হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইদ্দতের বিধান সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন:

وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنْفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ ۚ

"আর তালাকপ্রাপ্তা নারীরা তিন হায়েয (ঋতুস্রাব) পর্যন্ত নিজেদেরকে অপেক্ষায় রাখবে।"

— (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২২৮)

ইদ্দতের নিয়মসমূহ:

  • স্বাভাবিক অবস্থায়: যদি মহিলার নিয়মিত মাসিক (হায়েয) হয়, তবে তাকে সম্পূর্ণ ৩টি হায়েয (ঋতুস্রাব) অতিবাহিত হওয়া পর্যন্ত ইদ্দত পালন করতে হবে। যেদিন প্রথমবার তালাক দেওয়া হয়েছে, সেদিন থেকেই ইদ্দতের গণনা শুরু হবে।
  • গর্ভবতী হলে: তালাক দেওয়ার সময় মহিলা যদি গর্ভবতী থাকেন, তবে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া মাত্রই তার ইদ্দত শেষ হয়ে যাবে। (সূরা আত-তালাক: ৪)
  • মাসিক বন্ধ থাকলে: বয়স বা অন্য কোনো কারণে যদি মাসিক সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে, তবে তালাকের দিন থেকে চান্দ্র মাসের হিসেবে পূর্ণ ৩ মাস অতিবাহিত হলে ইদ্দত শেষ হবে।

ইদ্দত চলাকালীন সময়ে মহিলাকে বিনা প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়া, সাজগোজ করা এবং নতুন বিবাহের প্রস্তাব গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

৩. ইদ্দত শেষে আপনার উক্ত মহিলাকে বিবাহ করার হুকুম

ইসলামী শরীয়তে তালাকপ্রাপ্তা নারীকে বিবাহ করা কোনো দোষণীয় কাজ নয়, বরং এটি রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) এবং সাহাবায়ে কেরামের (রা.) সুন্নাহ। অনেক সাহাবী ও সালাফে সালেহীন তালাকপ্রাপ্তা ও বিধবা নারীদের অত্যন্ত সম্মানের সাথে বিবাহ করেছেন।

উপরোক্ত মহিলার ইদ্দত (৩ হায়েয বা নির্দিষ্ট সময়) পূর্ণ হওয়ার পর, আপনি অবশ্যই তাকে ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক নতুন মোহরানা নির্ধারণ করে এবং ২ জন সাক্ষীর উপস্থিতিতে বিবাহ করতে পারবেন। এতে শরীয়তের কোনো বাধা নেই, বরং একজন অসহায় নারীকে সম্মানজনক জীবন দেওয়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।

সারসংক্ষেপ

১. মেসেজ এবং ফোনকলের মাধ্যমে স্বামী একাধিকবার সুস্পষ্ট তালাক দেওয়ায়, শরীয়াহ মোতাবেক মহিলার ওপর 'তিন তালাক' পতিত হয়ে বৈবাহিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন হয়ে গেছে।

২. মহিলাকে তালাকের দিন থেকে পূর্ণ ৩ হায়েয (মাসিক) পর্যন্ত ইদ্দত পালন করতে হবে।

৩. মহিলার ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার পর আপনি তাকে বিবাহ করতে পারবেন; এটি সম্পূর্ণ জায়েজ এবং হালাল।

আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।