সূচিপত্র

দাওয়াত ও তাবলীগ সিরিজ – পর্ব ১

শূন্য থেকে অনন্তের পথে: আধুনিক মানবসত্তার সংকট এবং দাওয়াতের ইলাহী দর্শন

ভূমিকা: প্রাচুর্যের মাঝেও কেন এত হাহাকার?

আজকের আধুনিক মানুষ এক অদ্ভুত গোলকধাঁধায় আটকে আছে। আমাদের ঘরগুলো আগের চেয়ে বড় হয়েছে, কিন্তু পরিবারগুলো ছোট হয়ে গেছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে, কিন্তু মানুষের আয়ু আর মানসিক শান্তি দুটোই কমে গেছে। আমরা চাঁদে পৌঁছানোর পথ আবিষ্কার করেছি, কিন্তু পাশের বাড়ির প্রতিবেশীর হৃদয়ে পৌঁছানোর পথ ভুলে গেছি। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় আমরা এক ঝলমলে পৃথিবীতে বাস করছি, কিন্তু মানুষের ভেতরে তাকালে দেখা যায় এক অন্তহীন শূন্যতা, এক অদ্ভুত হাহাকার।

এই হাহাকারের কারণ কী? কারণ, স্রষ্টা মানুষকে কেবল মাটি দিয়ে সৃষ্টি করেননি; এর ভেতরে ফুঁকে দিয়েছেন তাঁর নিজস্ব রুহ বা আত্মা। মাটির তৈরি দেহের চাহিদা এই দুনিয়ার মাটি থেকে উৎপন্ন খাবার বা সম্পদে মিটে যায়। কিন্তু রুহ বা আত্মার খোরাক তো এই দুনিয়ার মাটিতে নেই, তার খোরাক আসে আসমান থেকে—আল্লাহর জিকির এবং তাঁর সাথে গভীর সম্পর্কের মাধ্যমে।

প্রথম অধ্যায়: অন্ধকারের গহ্বর এবং কোরআনের অমোঘ ঘোষণা

মানুষ যখন আল্লাহকে ভুলে যায়, তখন তার জীবনে কী নেমে আসে? আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে অত্যন্ত ভয়ংকর একটি চিত্র তুলে ধরেছেন:

وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَىٰ

অনুবাদ: "আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবন-জীবিকা হবে অত্যন্ত সংকীর্ণ, এবং আমি তাকে কিয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব।"
— (সূরা ত্বা-হা: ১২৪)

তাফসীরের গভীর দর্শন:

ইবনে কাসীর (রহ.) এবং ইমাম কুরতুবী (রহ.) এই আয়াতের তাফসীরে বলেছেন, এখানে "মায়িশাতান দানকা" বা 'সংকীর্ণ জীবন' বলতে কেবল অভাব-অনটন বোঝানো হয়নি। একজন মানুষের প্রাসাদের মতো বাড়ি থাকতে পারে, ব্যাংকে কোটি টাকা থাকতে পারে, কিন্তু তার হৃদয়ে কোনো প্রশান্তি থাকবে না। তার ভেতরে সবসময় এক অজানা ভয়, অস্থিরতা এবং বিষণ্ণতা কাজ করবে। সে সবকিছু পেয়েও মনে করবে তার কিছুই নেই।

আজকের আধুনিক যুগের দিকে তাকান—সবচেয়ে ধনী দেশগুলোতে আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি কেন? কারণ, তারা বস্তুবাদী জীবনের চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছে দেখেছে সেখানে কোনো শান্তি নেই। এই শান্তি একমাত্র তখনই ফিরে আসে, যখন মানুষ তার স্রষ্টার সামনে মাথা নত করে।

দ্বিতীয় অধ্যায়: ঈমানের বিপ্লব এবং প্রবল সামুদ্রিক ঝড়

তাবলীগের প্রথম কাজ হলো 'কালিমা' বা ঈমানের একিন। এটি কেবল কয়েকটি আরবি শব্দের সমষ্টি নয়, এটি মানুষের চিন্তার জগতে এক বিশাল বিপ্লব।

وَإِذَا غَشِيَهُم مَّوْجٌ كَالظُّلَلِ دَعَوُا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ فَلَمَّا نَجَّاهُمْ إِلَى الْبَرِّ فَمِنْهُم مُّقْتَصِدٌ

অনুবাদ: "যখন ঢেউ তাদেরকে শামিয়ানার মতো আচ্ছন্ন করে নেয়, তখন তারা আল্লাহকে একনিষ্ঠভাবে ডাকতে থাকে। অতঃপর তিনি যখন তাদেরকে উদ্ধার করে স্থলে পৌঁছে দেন, তখন তাদের কেউ কেউ সরল পথে থাকে (আর অনেকেই অকৃতজ্ঞ হয়)।"
— (সূরা লুকমান: ৩২)

হাদিসের ব্যাখ্যা ও প্রেক্ষাপট:

মক্কা বিজয়ের দিন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চরম শত্রু ইকরিমা ইবনে আবু জেহেল প্রাণের ভয়ে পালিয়ে সমুদ্রপথে হাবশায় (ইথিওপিয়া) রওনা হয়েছিলেন। মাঝ সমুদ্রে হঠাৎ প্রচণ্ড ঝড় শুরু হলো। বিশাল বিশাল ঢেউ নৌকার ওপর আছড়ে পড়তে লাগল। জাহাজের মাঝি চিৎকার করে বলল, "আজ তোমাদের দেব-দেবী, লাত-উজ্জা কেউ বাঁচাতে পারবে না। বাঁচতে চাইলে এক আল্লাহকে ডাকো!"

ইকরিমার মনে হঠাৎ বিদ্যুতের মতো খেলে গেল—যে আল্লাহ মাঝ সমুদ্রে, এই মৃত্যু উপত্যকায় আমাকে বাঁচাতে পারেন, মক্কার বুকেও তো সেই আল্লাহই রক্ষা করার মালিক! তিনি সাথে সাথে নিয়ত করলেন, "হে আল্লাহ! তুমি যদি আজ আমাকে এই ঝড় থেকে বাঁচাও, আমি মুহাম্মাদ (সা.)-এর হাতে হাত রেখে ইসলাম গ্রহণ করব।"

আধুনিক জীবনের সাথে সম্পর্ক:

আজকের দিনে আমরাও প্রত্যেকেই এই দুনিয়ার সমুদ্রে এক একটি ঝড়ের মুখোমুখি। কখনো অর্থনৈতিক মন্দার ঝড়, কখনো রোগের ঝড়, কখনো পারিবারিক ভাঙনের ঝড়। আমরা তখন ডাক্তার, উকিল, ব্যাংক বা মানুষের কাছে ধর্না দিই। কিন্তু ঈমান আমাদের শেখায়—সব আসবাব বা মাধ্যম মিথ্যা হয়ে যেতে পারে, কিন্তু যিনি আসবাবের স্রষ্টা (মুসাব্বিবুল আসবাব), তাঁর হুকুম ছাড়া গাছের একটি পাতাও নড়তে পারে না। অন্তরে এই বিশ্বাস গেঁথে দেওয়াই হলো কালিমার মেহনত।

তৃতীয় অধ্যায়: সেজদার মিরাজ বনাম আধুনিক যুগের চরম অস্থিরতা

আমরা যখন হতাশ হয়ে পড়ি, তখন কী করি? কিন্তু একজন মুমিন কী করে?

إِنَّ الْإِنسَانَ خُلِقَ هَلُوعًا - إِذَا مَسَّهُ الشَّرُّ جَزُوعًا - وَإِذَا مَسَّهُ الْخَيْرُ مَنُوعًا - إِلَّا الْمُصَلِّينَ

অনুবাদ: "নিশ্চয়ই মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে অতিশয় অস্থির চিত্তরূপে। যখন তাকে বিপদ স্পর্শ করে, তখন সে হা-হুতাশ করে। আর যখন কল্যাণ লাভ করে, তখন সে কৃপণ হয়ে যায়। তবে তারা ছাড়া, যারা নামাজ আদায়কারী।"
— (সূরা আল-মা'আরিজ: ۱۹-۲۲)

গভীর বিশ্লেষণ:

আল্লাহ তায়ালা মানুষের সাইকোলজি বা মনস্তত্ত্ব অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এই আয়াতে তুলে ধরেছেন। মানুষ স্বভাবগতভাবেই অস্থির। একটু বিপদ এলেই সে ভেঙে পড়ে (হালুয়া এবং জাযুয়া)। কিন্তু এই সাইকোলজিক্যাল ব্রেকডাউন থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় আল্লাহ নিজেই বলে দিয়েছেন—"ইল্লাল মুসল্লীন" (যারা নামাজ পড়ে)।

নামাজ কেবল কিছু শারীরিক ওঠাবসা নয়। সাহাবায়ে কেরামের নামাজ কেমন ছিল? একবার হযরত আলী (রা.)-এর পায়ে একটি তীর বিদ্ধ হয়েছিল। তীরটি এত গভীরে ছিল যে, সাধারণ অবস্থায় তা বের করা সম্ভব হচ্ছিল না। তিনি বললেন, "আমি যখন নামাজে দাঁড়াব, তখন তোমরা তীরটি টেনে বের করো।" নামাজে দাঁড়ানোর পর তীরটি টেনে বের করা হলো, রক্তে মাটি ভেসে গেল, কিন্তু তিনি টেরই পেলেন্বা না। কারণ তার রুহ তখন দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সরাসরি আল্লাহর আরশের সাথে যুক্ত হয়ে গিয়েছিল।

আজ আমরা এসি রুমে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ি, কিন্তু মশার কামড় দিলেও আমাদের ফোকাস নষ্ট হয়ে যায়। কারণ আমাদের সেজদায় শরীর মাটি স্পর্শ করে ঠিকই, কিন্তু হৃদয় আরশ পর্যন্ত পৌঁছায় না。

চতুর্থ অধ্যায়: ইয়ারমুকের প্রান্তর এবং স্বার্থপরতার অবসান (ইকরামুল মুসলিম)

আজ আমরা গ্লোবাল ভিলেজে বাস করছি। ইন্টারনেটের কল্যাণে পুরো বিশ্ব যুক্ত, কিন্তু আমরা মানসিকভাবে চরম বিচ্ছিন্ন। সামান্য একটু স্বার্থের জন্য আমরা আপন ভাইকে ঠকাই। আর এর বিপরীতে সাহাবায়ে কেরামদের চরিত্র কেমন ছিল?

অশ্রুসিক্ত একটি ইতিহাস:

হিজরি ১৫ সনের ইয়ারমুকের যুদ্ধ। যুদ্ধের ময়দানে আহত হয়ে পড়ে আছেন কয়েকজন সাহাবী। মৃত্যুযন্ত্রণা শুরু হয়েছে, প্রবল পিপাসায় ছটফট করছেন। এমন সময় হযরত হুজাইফা আল-আদাওয়ী (রা.) তাঁর চাচাতো ভাইয়ের জন্য এক পাত্র পানি নিয়ে ছুটে এলেন।

চাচাতো ভাইয়ের মুখের কাছে পানি ধরতেই পাশ থেকে আরেকজন আহত সাহাবী গোঙানির শব্দ করে উঠলেন, "পানি! একটু পানি!" পানি হাতে থাকা সাহাবী ইশারা করলেন, "আগে আমার ওই ভাইকে পানি দাও।"

হুজাইফা (রা.) দৌড়ে দ্বিতীয় সাহাবীর কাছে গেলেন। যেই না পানির পাত্র তার মুখের কাছে ধরলেন, পাশ থেকে তৃতীয় আরেকজন সাহাবী বলে উঠলেন, "ভাই, পানি!"

দ্বিতীয় সাহাবী বললেন, "আমার আগে আমার ওই ভাইয়ের বেশি তৃষ্ণা, তাকে দাও।"

হুজাইফা (রা.) দৌড়ে তৃতীয় জনের কাছে গেলেন, গিয়ে দেখলেন তিনি শহীদ হয়ে গেছেন। দৌড়ে দ্বিতীয় জনের কাছে এলেন, দেখলেন তিনিও শাহাদাত বরণ করেছেন। চাচাতো ভাইয়ের কাছে ফিরে এলেন, দেখলেন তিনিও হাসিমুখে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়েছেন।

সুবহানাল্লাহ! মৃত্যুর সেই কঠিন মুহূর্তেও একে অপরকে নিজের ওপর প্রাধান্য দেওয়ার নামই হলো 'ইকরামুল মুসলিম'। আর আজ আমরা একটু সম্পদের লোভে, একটু অহংকারের কারণে মুসলমান ভাইয়ের সম্মান ধুলায় লুটিয়ে দিচ্ছি।

পঞ্চম অধ্যায়: নিয়তের বিশুদ্ধতা ও ডুবন্ত জাহাজের রূপকথা (দাওয়াত ও ইখলাস)

কেন আমাদের দাওয়াতের কাজে বের হতে হবে? আমি তো নিজে ভালো আছি, নিজে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ছি, আমার কি দরকার অন্যের দরজায় যাওয়ার? এর উত্তর রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত ভয়ংকর একটি উদাহরণের মাধ্যমে দিয়েছেন।

হাদিসের গভীর দর্শন:

সহীহ বুখারীর একটি বিখ্যাত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, আল্লাহর হুকুম পালনকারী এবং সীমালঙ্ঘনকারীদের উদাহরণ হলো এমন একটি দলের মতো, যারা একটি জাহাজে লটারি করে জায়গা নিল। একদল জায়গা পেল জাহাজের ওপরের তলায়, আরেকদল নিচের তলায়।

নিচের তলার মানুষদের পানির প্রয়োজনে বারবার ওপরের তলায় যেতে হতো। এতে ওপরের তলার মানুষদের ঘুমের বা কাজের ব্যাঘাত ঘটত। তখন নিচের তলার মানুষগুলো চিন্তা করল, "আমরা যদি আমাদের তলায় (জাহাজের নিচে) একটি ফুটো করে সরাসরি সমুদ্র থেকে পানি নিয়ে নিই, তবে আর ওপরের তলার মানুষদের কষ্ট দেওয়া লাগবে না।"

রাসুল (সা.) বললেন, "ওপরের তলার মানুষগুলো যদি এই কথা ভেবে চুপ থাকে যে, 'তারা তাদের জায়গায় ফুটো করছে, করুক। আমাদের তো কোনো সমস্যা হচ্ছে না,' তাহলে যখন জাহাজ ফুটো হয়ে পানি ঢুকবে, তখন নিচের তলার মানুষ তো ডুববেই, সাথে ওপরের তলার ভালো মানুষগুলোও ডুবে মরবে। আর যদি ওপরের তলার মানুষ তাদের হাত চেপে ধরে বাধা দেয়, তবে সবাই রক্ষা পাবে।"

আমাদের চরম বাস্তবতা:

আজ সমাজে যখন প্রকাশ্যে অন্যায়, সুদ, ঘুষ, বেহায়াপনা আর মাদকের সয়লাব চলছে, তখন আমরা নিজেদের ঘরের দরজা বন্ধ করে তাহাজ্জুদ পড়ে ভাবছি আমরা তো ভালো আছি। কিন্তু না! এই সমাজের জাহাজ আজ তলা দিয়ে ফুটো হয়ে যাচ্ছে। আপনি যদি আজ ঘর থেকে বের হয়ে, অত্যন্ত বিনয় এবং দরদ নিয়ে এই অন্ধকারের পথে হাঁটা মানুষগুলোর হাত চেপে না ধরেন, তবে কিয়ামতের দিন আপনি কেবল নিজের আমল নিয়ে নাজাত পাবেন না। সমাজের এই পতনের দায়ভার আপনার কাঁধেও এসে পড়বে।

উপসংহার: অনন্ত জীবনের ডাক

সম্মানিত উপস্থিতি, একটু গভীরভাবে চিন্তা করুন! যে আয়ু আমাদের দেওয়া হয়েছে, তা বরফের মতো গলে যাচ্ছে। আমরা প্রত্যেকেই মৃত্যুর দিকে এক এক কদম করে এগিয়ে যাচ্ছি। যেদিন আমাদের কাফনের কাপড় পরিয়ে এই অন্ধকার কবরে নামিয়ে দেওয়া হবে, সেদিন এই দুনিয়ার সার্টিফিকেট, ব্যাংক ব্যালেন্স বা রাজনৈতিক পরিচয় কোনো কাজে আসবে না। সেদিন কেবল একটি জিনিসই কাজে আসবে—আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্ক এবং তাঁর নবীর সুন্নাতের ওপর আমাদের জীবনযাপন।

তাই আসুন, দুনিয়ার এই ক্ষণস্থায়ী মোহের জাল ছিন্ন করে আমরা আল্লাহর দিকে ফিরে যাই। নিজেদের জান ও মাল আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দিয়ে দ্বীনের এই দাওয়াতকে প্রতিটি মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার শপথ নিই। যারা অন্ধকারে হাবুডুবু খাচ্ছে, তাদের প্রতি ঘৃণা নয়, বরং এক বুক দরদ নিয়ে তাদের কাছে যাই। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই মহান মেহনতে কবুল করে নিন এবং আমাদের আত্মাকে তাঁর নূরে আলোকিত করুন। আমিন।

ঈমান ও ইয়াকিন: আসবাবের দুনিয়ায় মুসাব্বিবুল আসবাবের সন্ধান

দ্বীনের পথে দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনত - দ্বিতীয় পর্ব

১. ভূমিকা এবং ঈমান ও ইয়াকিনের পার্থক্য

সম্মানিত পাঠক! আজ আমরা মুসলমানরা সারা দুনিয়ায় লাঞ্ছিত এবং হতাশ। আমাদের সম্পদের অভাব নেই, লোকসংখ্যার অভাব নেই, মসজিদে মুসল্লিরও অভাব নেই। তাহলে সমস্যা কোথায়? এই সমস্যার সবচেয়ে বড় উত্তর নবীজি (صلى الله عليه وسلم) আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগেই দিয়ে গেছেন।

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «صَلَاحُ أَوَّلِ هَذِهِ الْأُمَّةِ بِالزَّهَادَةِ وَالْيَقِينِ، وَهَلَاكُ آخِرِهَا بِالْبُخْلِ وَالْأَمَلِ»
অনুবাদ: "এই উম্মতের প্রথম অংশের (সাহাবায়ে কেরামের) সংশোধন ও সফলতা অর্জিত হয়েছে ‘যুহদ’ (দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি) এবং ‘ইয়াকিন’ (আল্লাহর ওপর দৃঢ় বিশ্বাস)-এর মাধ্যমে। আর এই উম্মতের শেষ অংশের মানুষ ধ্বংস হবে ‘কৃপণতা’ এবং ‘দুনিয়ার দীর্ঘ আশা’ (অতিরিক্ত বস্তুবাদী চিন্তা)-এর কারণে।"
— বায়হাকী, শুআবুল ঈমান: ১০৪৫৪

নবীজি (صلى الله عليه وسلم) স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, সাহাবায়ে কেরামের সফলতার মূল হাতিয়ার কোনো বস্তু বা আসবাব ছিল না; বরং তাঁদের অন্তরে দুনিয়ার প্রতি নির্মোহতা এবং আল্লাহর ওয়াদার ওপর পাহাড়সম ইয়াকিন ছিল। আজ আমাদের অন্তর থেকে সেই 'ইয়াকিন' বিদায় নিয়েছে। আসুন, আমরা ঈমান ও ইয়াকিনের এই হারিয়ে যাওয়া রত্নটি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করি।

ঈমান (বিশ্বাস)

অদেখা বিষয়ের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করার নাম ঈমান। অর্থাৎ, আল্লাহ আছেন, আখেরাত আছে, জান্নাত-জাহান্নাম আছে—এটা মুখে স্বীকার করা এবং অন্তরে বিশ্বাস করার নামই ঈমান। এটি হলো গাছের 'বীজ'

ইয়াকিন (দৃঢ় বিশ্বাস)

ঈমান যখন অন্তরে এত গভীরভাবে বসে যায় যে, অদেখা জিনিসগুলো চোখের দেখার মতো চরম সত্য বলে মনে হয়, তখন তাকে ইয়াকিন বলে। ঈমান যদি হয় গাছের বীজ, তবে ইয়াকিন হলো সেই গাছের 'মিষ্টি ফল'

ইয়াকিন হাসিলের জন্য ইব্রাহিম (আ.)-এর আকুতি

হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ঈমানের কোনো কমতি ছিল না। কিন্তু তিনি ঈমান (ইলমুল ইয়াকিন) থেকে 'ইয়াকিন' (আইনুল ইয়াকিন)-এর সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছানোর জন্য আল্লাহর কাছে একটি চমৎকার আবদার করেছিলেন।

وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ أَرِنِي كَيْفَ تُحْيِي الْمَوْتَىٰ ۖ قَالَ أَوَلَمْ تُؤْمِن ۖ قَالَ بَلَىٰ وَلَٰكِن لِّيَطْمَئِنَّ قَلْبِي ۖ قَالَ فَخُذْ أَرْبَعَةً مِّنَ الطَّيْرِ فَصُرْهُنَّ إِلَيْكَ ثُمَّ اجْعَلْ عَلَىٰ كُلِّ جَبَلٍ مِّنْهُنَّ جُزْءًا ثُمَّ ادْعُهُنَّ يَأْتِينَكَ سَعْيًا ۚ وَاعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ
অনুবাদ: "আর স্মরণ করুন, যখন ইব্রাহিম বলল, ‘হে আমার রব! আমাকে দেখান, আপনি কীভাবে মৃতকে জীবিত করেন।’ আল্লাহ বললেন, ‘তুমি কি ঈমান আনোনি?’ ইব্রাহিম বললেন, ‘হ্যাঁ (অবশ্যই ঈমান এনেছি), তবে কেবল আমার অন্তরকে প্রশান্ত করার জন্য (আমি দেখতে চাই)।’ আল্লাহ বললেন, ‘তাহলে চারটি পাখি নাও এবং সেগুলোকে তোমার বশীভূত করো। তারপর সেগুলোর একেকটি অংশ একেক পাহাড়ের ওপর রেখে দাও। এরপর সেগুলোকে ডাকো, তারা দ্রুত ছুটে তোমার কাছে চলে আসবে। আর জেনে রাখো, নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’"
— সূরা আল-বাকারাহ: ২৬০

তাফসীর দর্শন: ইব্রাহিম (আ.)-এর অন্তরে আল্লাহ তায়ালার ক্ষমতার ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না। তাঁর প্রশ্নটি এ জন্য ছিল না যে, "আল্লাহ, আপনি কি এটা করতে পারেন?" বরং প্রশ্নটি ছিল, "আল্লাহ, আপনি এটা কীভাবে (কাইফা) করেন?" তিনি নিজ চোখে দেখে শয়তানের ওয়াসওয়াসার সব দরজা বন্ধ করে অন্তরে পরম প্রশান্তি বা 'ইতমিআন' আনতে চেয়েছিলেন। আল্লাহর হুকুমে যখন কিমা করা পাখির গোশত চার পাহাড় থেকে উড়ে এসে জীবন্ত হয়ে গেল, তখন তা ইয়াকিনের চরম দৃষ্টান্ত স্থাপন করল।

পাখির ঘটনা দিয়ে আল্লাহ আমাদের বুঝিয়েছেন, কিয়ামতের দিন যখন ইসরাফিল (আ.) শিঙ্গায় ফুঁক দেবেন, তখন দুনিয়ার মানুষের অবস্থাও ঠিক এই পাখিদের মতোই হবে।

وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَصَعِقَ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَمَن فِي الْأَرْضِ إِلَّا مَن شَاءَ اللَّهُ ۖ ثُمَّ نُفِخَ فِيهِ أُخْرَىٰ فَإِذَا هُمْ قِيَامٌ يَنظُرُونَ
অনুবাদ: "আর শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে, ফলে আসমান ও জমিনে যারা আছে সবাই বেহুঁশ হয়ে পড়বে (মারা যাবে); তবে আল্লাহ যাদেরকে ইচ্ছা করেন তারা ছাড়া। অতঃপর আবার (দ্বিতীয়বার) শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে, তখন সাথে সাথে তারা দাঁড়িয়ে যাবে এবং তাকাতে থাকবে।"
— সূরা আয-যুমার: ৬৮

যে মালিক পাখির কিমা করা গোশত জোড়া লাগাতে পারেন, তিনি শতাব্দীর পর শতাব্দী কবরে মিশে থাকা মানুষকেও এক ফুঁৎকারে জ্যান্ত করে তুলবেন—এটাই হলো ইয়াকিন! এ জন্যই আল্লাহ তায়ালা আখেরাতের ক্ষেত্রে 'ঈমান' শব্দের বদলে 'ইয়াকিন' শব্দটি ব্যবহার করেছেন:

وَالَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ وَبِالْآخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ
অনুবাদ: "আর আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে এবং আপনার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে, তার ওপর তারা 'ঈমান' আনে এবং আখেরাতের ওপর তারা 'ইয়াকিন' (দৃঢ় বিশ্বাস) রাখে।"
— সূরা আল-বাকারাহ: ৪

২. আসবাব বনাম মুসাব্বিবুল আসবাব

দুনিয়া চলে আসবাব (মাধ্যম) দিয়ে। কিন্তু মুমিনের নজর আসবাবের ওপর থাকে না, থাকে মুসাব্বিবুল আসবাব (যিনি সমস্ত কারণ বা মাধ্যমের সৃষ্টিকর্তা) আল্লাহ তায়ালার ওপর। আমাদের সবচেয়ে বড় রোগ হলো, আমরা মাধ্যমকে আসল মনে করি। আমরা মনে করি ওষুধ সুস্থ করেছে, চাকরি রিজিক দিচ্ছে। কিন্তু ইয়াকিন হলো—ওষুধ কেবল মাধ্যম, শিফা দেন আল্লাহ!

নমরুদ যখন ইব্রাহিম (আ.)-কে ভয়াবহ আগুনে নিক্ষেপ করার জন্য শূন্যে ভাসিয়ে দিল, জিব্রাইল (আ.) সাহায্য করতে এলে ইব্রাহিম (আ.) চরম ইয়াকিনের সাথে বলেছিলেন:

حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ
অনুবাদ: "আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক!"
— সূরা আল-ইমরান: ১৭৩

আগুনের নিজস্ব আসবাব বা স্বভাব হলো পোড়ানো। কিন্তু মুসাব্বিবুল আসবাব (আল্লাহ) যখন আগুনকে নিষেধ করলেন, তখন সেই আগুন নিজের স্বভাব ভুলে গিয়ে জান্নাতের বাগান হয়ে গেল।

قُلْنَا يَا نَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ
অনুবাদ: "আমি বললাম, হে আগুন! তুমি ইব্রাহিমের জন্য শীতল ও শান্তিদায়ক হয়ে যাও।"
— সূরা আল-আম্বিয়া: ৬৯

লক্ষ্য করুন, আল্লাহ শুধু 'শীতল' হতে বলেননি, সাথে 'শান্তিদায়ক' হতে বলেছেন। তা না হলে ইব্রাহিম (আ.) ঠান্ডায় জমে যেতেন। বস্তুর ভেতরে আল্লাহ ক্ষমতা দিয়েছেন, তিনি চাইলে এক সেকেন্ডে সেই ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে পারেন।

৩. মুসা (আ.) এবং সাহাবাদের ইয়াকিনের চূড়ান্ত পরীক্ষা

আসবাব আর ইয়াকিনের সবচেয়ে বড় পার্থক্য দেখা গেল লোহিত সাগরের সামনে। রাতের আঁধারে মুসা (আ.) বনী ইসরাইলকে নিয়ে এলেন। সামনে উত্তাল সাগর, পেছনে ফেরাউনের রক্তপিপাসু বাহিনী। বনী ইসরাইলের নজর ছিল কেবল পরিস্থিতির দিকে। তারা চরম হতাশ হয়ে আর্তনাদ করে উঠল:

فَلَمَّا تَرَاءَى الْجَمْعَانِ قَالَ أَصْحَابُ مُوسَىٰ إِنَّا لَمُدْرَكُونَ
অনুবাদ: "যখন উভয় দল পরস্পরকে দেখল, তখন মুসার সঙ্গীরা বলল, 'আমরা তো ধরা পড়ে গেলাম!'"
— সূরা আশ-শুআরা: ৬১

গোটা জাতি যখন হতাশায় নিমজ্জিত, মুসা (আ.)-এর নজর আসবাব বা সাগরের ঢেউয়ের দিকে ছিল না; তাঁর নজর ছিল আরশের মালিকের দিকে। তিনি বজ্রকণ্ঠে জবাব দিলেন:

قَالَ كَلَّا ۖ إِنَّ مَعِيَ رَبِّي سَيَهْدِينِ
অনুবাদ: "মুসা বললেন, 'কখনোই নয়! নিশ্চয়ই আমার রব আমার সাথে আছেন, তিনি অচিরেই আমাকে পথ দেখাবেন।'"
— সূরা আশ-শুআরা: ৬২
সাগরের বুকে ১২টি রাস্তা এবং প্রকৃতির আনুগত্য

মুসা (আ.)-এর এই চরম ইয়াকিনের ফলেই আল্লাহ ওহি পাঠালেন। পানির আসবাব বা স্বভাব হলো তরল থাকা এবং ডুবিয়ে মারা। কিন্তু আল্লাহর হুকুমে সেই তরল পানি ইটের চেয়েও শক্ত পাহাড় হয়ে গেল।

فَأَوْحَيْنَا إِلَىٰ مُوسَىٰ أَنِ اضْرِب بِّعَصَاكَ الْبَحْرَ ۖ فَانفَلَقَ فَكَانَ كُلُّ فِرْقٍ كَالطَّوْدِ الْعَظِيمِ - وَأَزْلَفْنَا ثَمَّ الْآخَرِينَ - وَأَنجَيْنَا مُوسَىٰ وَمَن مَّعَهُ أَجْمَعِينَ - ثُمَّ أَغْرَقْنَا الْآخَرِينَ
অনুবাদ: "অতঃপর আমি মুসার কাছে ওহি পাঠালাম, ‘তোমার লাঠি দিয়ে সাগরে আঘাত করো।’ ফলে তা দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল এবং প্রত্যেকটি ভাগ বিশাল পাহাড়ের মতো হয়ে দাঁড়াল। আর সেখানে আমি অপর দলকে কাছাকাছি নিয়ে এলাম। আমি মুসা ও তাঁর সঙ্গীদের সবাইকে বাঁচিয়ে নিলাম। অতঃপর অপর দলটিকে ডুবিয়ে দিলাম।"
— সূরা আশ-শুআরা: ৬৩-৬৬

তাফসীর দর্শন: তাফসীরে ইবনে কাসীর অনুযায়ী, বনী ইসরাইলের ১২টি গোত্রের জন্য সাগরের বুকে ১২টি শুকনা রাস্তা তৈরি হয়েছিল। যখন মুসা (আ.) এবং তাঁর কওম পার হয়ে গেলেন, আল্লাহ পানিকে তার আগের স্বভাবে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। চোখের পলকে বিশাল জলের পাহাড় ভেঙে পড়ল এবং ফেরাউন তার অহংকারসহ চিরতরে হারিয়ে গেল। এটাই হলো ইয়াকিনের বিজয়!

৪. বর্তমান যুগের সংকট এবং তাওয়াক্কুল

আজকের আধুনিক যুগে মানুষের সবচেয়ে বড় সংকট হলো রিজিক নিয়ে দুশ্চিন্তা, ভবিষ্যতের ভয় এবং চারপাশের নেতিবাচক খবরের কারণে সৃষ্ট হতাশা। আমরা রিজিকের হিসাব ক্যালকুলেটরে মেলাই। পকেটে টাকা না থাকলে কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। অথচ নবীজি (صلى الله عليه وسلم) এক বিস্ময়কর তাওয়াক্কুলের কথা বলেছেন:

لَوْ أَنَّكُمْ تَتَوَكَّلُونَ عَلَى اللَّهِ حَقَّ تَوَكُّلِهِ لَرَزَقَكُمْ كَمَا يَرْزُقُ الطَّيْرَ، تَغْدُو خِمَاصًا وَتَرُوحُ بِطَانًا
অনুবাদ: "তোমরা যদি আল্লাহর ওপর সেভাবে তাওয়াক্কুল বা ভরসা করতে যেমনটি করা উচিত, তবে আল্লাহ তোমাদের সেভাবে রিজিক দিতেন যেভাবে তিনি পাখিদের রিজিক দেন। তারা সকালে খালি পেটে বাসা থেকে বের হয় এবং সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে।"
— সুনান আত-তিরমিযী: ২৩৪৪

পাখির কোনো ব্যাংক ব্যালেন্স নেই, জমানো সম্পদ নেই, কিন্তু তার তাওয়াক্কুল আছে। আল্লাহ তায়ালা মানুষের এই পার্থিব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দেওয়ার জন্য অভাবনীয় এক গ্যারান্টি কোরআনে দিয়ে রেখেছেন:

وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا - وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ ۚ وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ ۚ إِنَّ اللَّهَ بَالِغُ أَمْرِهِ ۚ قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لِكُلِّ شَيْءٍ قَدْرًا
অনুবাদ: "আর যে আল্লাহকে ভয় করে (তাকওয়া অবলম্বন করে), আল্লাহ তার জন্য (বিপদ থেকে) উত্তরণের পথ বের করে দেন। এবং তিনি তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেবেন, যা সে ধারণাও করতে পারবে না। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল (ভরসা) করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর কাজ পূর্ণ করবেনই।"
— সূরা আত্ব-ত্বালাক: ২-৩

৫. কীভাবে ইয়াকিন তৈরি হবে? এবং এর চূড়ান্ত প্রতিদান

ইয়াকিন বাজার থেকে কিনে আনার জিনিস নয়। এটি অর্জন করার জন্য কোরআন সুন্নাহ নির্দেশিত কিছু মেহনত করতে হয়:

১. আল্লাহর বড়ত্বের আলোচনা ও দাওয়াত: যে বিষয় নিয়ে মানুষ বেশি কথা বলে, সেই বিষয়ের ইয়াকিন তার অন্তরে বসে যায়।

وَذَكِّرْ فَإِنَّ الذِّكْرَىٰ تَنفَعُ الْمُؤْمِنِينَ
অনুবাদ: "আর আপনি উপদেশ দিতে (দ্বীনের কথা বলতে) থাকুন, কারণ নিশ্চয়ই এই উপদেশ মুমিনদের উপকারে আসে।" (সূরা আয-যারিয়াত: ৫৫)

২. সৃষ্টিজগৎ নিয়ে তাদাব্বুর বা গভীর চিন্তা:

إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَآيَاتٍ لِّأُولِي الْأَلْبَابِ - الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَىٰ جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَٰذَا بَاطِلًا
অনুবাদ: "নিশ্চয়ই আসমান ও জমিনের সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের আবর্তনে বুদ্ধিমানদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আসমান ও জমিনের সৃষ্টি নিয়ে গভীর চিন্তা করে এবং বলে, 'হে আমাদের রব! আপনি এসব অনর্থক সৃষ্টি করেননি।'" (সূরা আল-ইমরান: ১৯০-১৯১)

৩. পরিবেশ পরিবর্তন করা (আল্লাহর রাস্তায় সফর): মানুষ পরিবেশের দাস। আসবাবের পরিবেশ ছেড়ে দ্বীনের মেহনতে আল্লাহর রাস্তায় বের হলে গায়েবি সাহায্যের ইয়াকিন আসে। হিজরত বা সফর না করার পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:

إِنَّ الَّذِينَ تَوَفَّاهُمُ الْمَلَائِكَةُ ظَالِمِي أَنفُسِهِمْ قَالُوا فِيمَ كُنتُمْ ۖ قَالُوا كُنَّا مُسْتَضْعَفِينَ فِي الْأَرْضِ ۚ قَالُوا أَلَمْ تَكُنْ أَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةً فَتُهَاجِرُوا فِيهَا ۚ فَأُولَٰئِكَ مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ ۖ وَسَاءَتْ مَصِيرًا
অনুবাদ: "নিশ্চয়ই যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছে, ফেরেশতারা তাদের জান কবজ করার সময় জিজ্ঞেস করবে... 'তোমরা কী অবস্থায় ছিলে?' তারা বলবে, 'দুনিয়াতে আমরা অসহায় ছিলাম।' ফেরেশতারা বলবে, ‘আল্লাহর জমিন কি প্রশস্ত ছিল না যে, তোমরা সেখানে হিজরত করতে?’ এদেরই ঠিকানা হলো জাহান্নাম।" (সূরা আন-নিসা: ৯৭)
ইয়াকিনের চূড়ান্ত প্রাপ্তি: হায়াতান তাইয়্যিবাহ

আর যদি আমরা এই মেহনত করে আমাদের অন্তরে ঈমান ও ইয়াকিন নিয়ে আসতে পারি, তবে আল্লাহ তায়ালা আমাদের দুনিয়া ও আখেরাতের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দেওয়ার ওয়াদা করেছেন।

مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً ۖ وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُم بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
অনুবাদ: "মুমিন হয়ে পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে-ই সৎকাজ করবে, আমি অবশ্যই তাকে 'হায়াতান তাইয়্যিবাহ' (পবিত্র, দুশ্চিন্তামুক্ত ও সুখময় জীবন) দান করব এবং তারা (দুনিয়াতে) যা করত তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার তাদেরকে (আখেরাতে) প্রদান করব।"
— সূরা আন-নাহল: ৯৭