বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

বিষয়ঃ জালিম

(নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ আয়াত-এর তরজমা ও তাফসীর)

আয়াতে কারীমাহ্

وَيَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا وَمَا لَيْسَ لَهُم بِهِ عِلْمٌ ۗ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِن نَّصِيرٍ

[الحج: 71]

সরল অনুবাদ

তারা ইবাদত করে আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুর যার সম্পর্কে তিনি কোন দলীল প্রেরণ করেননি এবং যার সম্বন্ধে তাদের কোন জ্ঞান নেই; [১] বস্তুতঃ যালেমদের কোন সাহায্যকারী নেই।
সূরার নাম — আল হাজ্জ্ব | আয়াত নম্বর — ৭১

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

[১] অর্থাৎ, তাদের নিকট না আছে কোন লিখিত দলীল, যার দ্বারা তারা কোন আসমানী কিতাব হতে প্রমাণ দেখাতে পারবে। আর না আছে তাদের জ্ঞানভিত্তিক কোন প্রমাণ (যুক্তি), যা আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদত করার বৈধতায় পেশ করতে পারবে।

আয়াতে কারীমাহ্

وَكَذَٰلِكَ نُوَلِّي بَعْضَ الظَّالِمِينَ بَعْضًا بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ

[الأنعام: 129]

সরল অনুবাদ

এরূপে আমি যালেমদের কৃতকর্মের ফলে তাদের এক দলকে অন্য দলের উপর প্রবল করে থাকি।[১]
সূরার নাম — আল আনআম | আয়াত নম্বর — ১২৯

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

[১] نُوَلّي এর একাধিক অর্থ বর্ণিত হয়েছে; অর্থাৎ, যেভাবে আমি মানুষ ও জ্বিনদেরকে একে অপরের সঙ্গী ও সাহায্যকারী বানিয়েছি, (যেমন, পূর্বের আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে) অনুরূপ আচরণ আমি অত্যাচারীদের সাথেও করি। অথবা একজন যালেমকে অপর যালেমের উপর (প্রবল করে) চাপিয়ে দিই। আর এইভাবে একজন অত্যাচারী অপর অত্যাচারীকে ধ্বংস করে এবং এক যালিমের প্রতিশোধ অপর যালিম দ্বারা নিয়ে নিই। অথবা জাহান্নামে ওদেরকে এক অপরের কাছাকাছি রাখব।

আয়াতে কারীমাহ্

قُلْ يَا قَوْمِ اعْمَلُوا عَلَىٰ مَكَانَتِكُمْ إِنِّي عَامِلٌ ۖ فَسَوْفَ تَعْلَمُونَ مَن تَكُونُ لَهُ عَاقِبَةُ الدَّارِ ۗ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ

[الأنعام: 135]

সরল অনুবাদ

বল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যা করছ, করতে থাক। আমিও আমার কাজ করছি।[১] তোমরা শীঘ্রই জানতে পারবে, কার পরিণাম মঙ্গলময়। নিশ্চয় যালেমরা সফলকাম হবে না। [২]
সূরার নাম — আল আনআম | আয়াত নম্বর — ১৩৫

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

[১] এটা কুফরী ও অবাধ্যতার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার এখতিয়ার বা অনুমতি দান নয়, বরং এ হল কঠোর ধমক; যা পরের শব্দগুলো থেকেও স্পষ্ট হয়। যেমন, অন্যত্র বলেন, {وَقُلْ لِلَّذِينَ لا يُؤْمِنُونَ اعْمَلُوا عَلَى مَكَانَتِكُمْ إِنَّا عَامِلُونَ، وَانْتَظِرُوا إِنَّا مُنْتَظِرُونَ} অর্থাৎ, আর যারা ঈমান আনে না, তাদেরকে বলে দাও যে, তোমরা নিজ নিজ অবস্থায় কাজ করে যাও, আমরাও কাজ করে যাই। আর তোমরাও অপেক্ষা করতে থাক, আমরাও অপেক্ষায় রইলাম। (সূরা হূদ ১১:১২১-১২২)

[২] যেমন, অল্প দিনের মধ্যেই মহান আল্লাহ তাঁর এই প্রতিশ্রুতিকে সত্য করে দেখালেন। ৮ম হিজরীতে মক্কা বিজয় হল। আর মক্কা বিজয় হওয়ার পর আরব গোত্রগুলো দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে আরম্ভ করল এবং এইভাবে সম্পূর্ণ আরব উপদ্বীপ মুসলিমদের অধীনে চলে এল। পরবর্তীতে তার সীমা আরো বাড়তে ও সম্প্রসারিত হতেই থাকল।

আয়াতে কারীমাহ্

وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَىٰ عَلَى اللَّهِ كَذِبًا أَوْ كَذَّبَ بِآيَاتِهِ ۗ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ

[الأنعام: 21]

সরল অনুবাদ

আর যে ব্যক্তি আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রচনা করে অথবা তাঁর আয়াতসমূহকে মিথ্যাজ্ঞান করে, তার থেকে অধিক যালেম (অত্যাচারী) আর কে? [১] যালেমরা অবশ্যই সফলকাম হবে না। [২]
সূরার নাম — আল আনআম | আয়াত নম্বর — ২১

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

[১] অর্থাৎ, যেমন আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপকারী (অর্থাৎ, নবী হওয়ার মিথ্যা দাবীদার) সবচেয়ে বড় যালেম, অনুরূপ সে ব্যক্তিও বড় যালেম, যে আল্লাহর নিদর্শনাবলী এবং তাঁর সত্য রসূলকে মিথ্যা মনে করে। নবী হওয়ার মিথ্যা দাবীদারদের উপর এত কঠোর হুমকি আসা সত্ত্বেও এটা বাস্তব যে, প্রত্যেক যুগে একাধিক ব্যক্তি নবী হওয়ার মিথ্যা দাবী উত্থাপন করেছে এবং এইভাবে নবী করীম (সাঃ)-এর ভবিষ্যদ্বাণীও বাস্তবে প্রমাণিত হয়েছে। তিনি বলেছিলেন, "ত্রিশজন মিথ্যুক দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে এবং তারা প্রত্যেকে দাবী করবে যে, সে নবী।" বিগত শতাব্দীতেও কাদিয়ানের (গুলাম আহমাদ নামক) এক ব্যক্তি নবী হওয়ার দাবী করেছিল। আর বর্তমানে তার অনুসারীরা তাকে সত্য নবী এবং কেউ কেউ 'প্রতিশ্রুত মসীহ' এই জন্য মনে করে যে, অল্প সংখ্যক কিছু লোক তাকে নবী বলে স্বীকার করে। অথচ কিছু মানুষের কোন মিথ্যুককে সত্যবাদী মনে করে নেওয়া, তার সত্যবাদী হওয়ার দলীল হতে পারে না। সত্যতার জন্য তো কুরআন ও হাদীসের সুস্পষ্ট দলীলের প্রয়োজন।

[২] যেহেতু এরা উভয়েই যালেম, তাই না সে সফল হবে, যে মিথ্যা রচনা করে, আর না সে, যে মিথ্যাজ্ঞান করে। কাজেই প্রয়োজন হল প্রত্যেকেই যেন নিজেদের পরিণামের ব্যাপারে ভালভাবে চিন্তা-ভাবনা করে।

আয়াতে কারীমাহ্

قَدْ نَعْلَمُ إِنَّهُ لَيَحْزُنُكَ الَّذِي يَقُولُونَ ۖ فَإِنَّهُمْ لَا يُكَذِّبُونَكَ وَلَٰكِنَّ الظَّالِمِينَ بِآيَاتِ اللَّهِ يَجْحَدُونَ

[الأنعام: 33]

সরল অনুবাদ

আমি অবশ্যই জানি যে, তারা যা বলে, তা তোমাকে নিশ্চিতই কষ্ট দেয়। আসলে তারা তো তোমাকে মিথ্যাবাদী বলে না, বরং অত্যাচারিগণ আল্লাহর আয়াতকেই অস্বীকার করে। [১]
সূরার নাম — আল আনআম | আয়াত নম্বর — ৩৩

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

[১] নবী করীম (সাঃ)-কে কাফেরদের মিথ্যা ভাবার কারণে যে দুঃখ-কষ্ট তাঁর হত, তা দূরীকরণের এবং তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বলা হচ্ছে যে, এই মিথ্যা মনে করা তোমাকে নয় (তোমাকে তো তারা সত্যবাদী ও বিশ্বাসী মনে করে), বরং প্রকৃতপক্ষে তারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে মিথ্যা মনে করে এবং এটা একটি মস্ত বড় যুলুমের কাজ তারা করছে। তিরমিযী ইত্যাদির একটি বর্ণনায় এসেছে যে, আবূ জাহল একদা রসূল (সাঃ)-কে বলল, 'হে মুহাম্মাদ, আমরা তোমাকে নয়, বরং তুমি যা নিয়ে এসেছ সেটাকে মিথ্যা মনে করি।' তার উত্তরে এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। তিরমিযীর এই বর্ণনা সনদের দিক দিয়ে দুর্বল হলেও অন্য সহীহ বর্ণনা দ্বারা এ ব্যাপারের সত্যতা প্রমাণিত হয়। মক্কার কাফেররা নবী করীম (সাঃ)-কে আমানতদার, বিশ্বস্ত এবং সত্যবাদী মনে করত, কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁর রিসালাতের উপর ঈমান আনা থেকে দূরেই ছিল। বর্তমানেও যারা নবী করীম (সাঃ)-এর উত্তম চরিত্র, গুণ ও কৃতিত্ব, তাঁর অমায়িক ব্যবহার এবং তাঁর আমানত ও বিশ্বস্ততার কথাকে গা-মাথা দুলিয়ে বড় মোহিত হয়ে বর্ণনা করে এবং এ বিষয়ের উপর সাহিত্য-শৈলী ভাষায় ও চমৎকার ভঙ্গিমায় বত্তৃজ্ঞতা, না'ত ও গজলও পরিবেশন করে, কিন্তু রসূল (সাঃ)-এর আনুগত্য ও তাঁর অনুসরণ করার ব্যাপারে কুণ্ঠাবোধ ও শৈথিল্য করে। তাঁর কথার উপর ফিকহ, কিয়াস (অনুমান) এবং ইমামদের কথাকে প্রাধান্য দেয়। তাদের চিন্তা করা উচিত যে, এ আচরণ কার যা তারা অবলম্বন করেছে?

আয়াতে কারীমাহ্

وَلَا تَدْعُ مِن دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَنفَعُكَ وَلَا يَضُرُّكَ ۖ فَإِن فَعَلْتَ فَإِنَّكَ إِذًا مِّنَ الظَّالِمِينَ

[يونس: 106]

সরল অনুবাদ

আর আল্লাহকে ছেড়ে এমন কিছুকে আহবান করো না, যা না তোমার কোন উপকার করতে পারে, না কোন ক্ষতি করতে পারে। বস্তুতঃ যদি এইরূপ কর, তাহলে তুমি অবশ্যই যালেমদেরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।[১]
সূরার নাম — ইউনুস | আয়াত নম্বর — ১০৬

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

[১] অর্থাৎ, যদি আল্লাহ ব্যতীত এমন উপাস্যকে ডাক, যে কারোর উপকার-অপকার করতে পারে না, তাহলে তা যুলম (অন্যায়) হবে। যুলম (অন্যায়) হল, وضع الشي في غير محله (কোন বস্তুকে তার নিজ স্থান থেকে সরিয়ে অন্য স্থানে রাখা।) ইবাদত একমাত্র সেই আল্লাহর হক, যিনি সমস্ত জগৎ সৃষ্টি করেছেন এবং জীবনধারণের সমস্ত উপকরণের ব্যবস্থাপনাও তিনিই করেছেন। সুতরাং সেই ইবাদতের অধিকারী ব্যতীত অন্য কারোর ইবাদত করলে, ইবাদতকে (যথাস্থানে না রেখে) বড় ভুল স্থানে রাখা হয়। এই জন্যই শিরককে বড় যুলম (মহা অন্যায়) বলা হয়েছে। এখানে যদিও সম্বোধিত নবী (সাঃ); কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সকল মানুষ ও উম্মতে মুহাম্মাদীই উদ্দিষ্ট।