বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

বিষয়ঃ সম্পদ বন্টন

(নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ আয়াত-এর তরজমা ও তাফসীর)

আয়াতে কারীমাহ্

كُتِبَ عَلَيْكُمْ إِذَا حَضَرَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ إِن تَرَكَ خَيْرًا الْوَصِيَّةُ لِلْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ بِالْمَعْرُوفِ ۖ حَقًّا عَلَى الْمُتَّقِينَ

[البقرة: 180]

সরল অনুবাদ

তোমাদের আদেশ দেওয়া হয়েছে যে, তোমাদের মধ্যে যখন কারো মৃত্যু উপস্থিত হয় এবং সে যদি ধন-সম্পত্তি রেখে যায়, তবে পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের জন্য বৈধভাবে ‘অসিয়ত’ করার বিধান দেওয়া হল। [১] ধর্মভীরুদের জন্য এটা অবশ্য পালনীয়।
সূরার নাম — আল বাকারা | আয়াত নম্বর — ১৮০

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

[১] 'অসিয়ত' (উইল) করার এ নির্দেশ উত্তরাধিকার বিষয়ক আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে তা রহিত হয়েছে। নবী করীম (সাঃ)-এর উক্তি হল-
(إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَعْطَى كُلِّ ذِي حَقٍّ حَقَّهُ فَلَا وَصِيَّةَ لِوَارِثٍ)
অর্থাৎ, "অবশ্যই আল্লাহ প্রত্যেক অধিকারীকে তার প্রাপ্য অধিকার দিয়ে দিয়েছেন (অর্থাৎ, ওয়ারেসীনদের অংশ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন)। অতএব কোন উত্তরাধিকারের জন্য অসিয়ত করা জায়েয নয়।" (আবূ দাউদ ২৮৭০, তিরমিযী ২১২১, নাসায়ী ৩৫৮১, ইবনে মাজা ২৭১৩, আহমদ ১৭২১২নং) তবে এমন আত্মীয়ের জন্য অসিয়ত করা যাবে, যে ওয়ারিস নয়। অনুরূপ সৎপথে ব্যয় করার জন্য অসিয়ত করা যাবে আর তার সর্বাধিক পরিমাণ হল (মোট সম্পত্তির) এক তৃতীয়াংশ। এর বেশী অসিয়ত করা যাবে না। (সহীহ বুখারী, অধ্যায়ঃ ফারায়েয, পরিচ্ছেদঃ মীরাসুল বানাত)

আয়াতে কারীমাহ্

فَمَن بَدَّلَهُ بَعْدَمَا سَمِعَهُ فَإِنَّمَا إِثْمُهُ عَلَى الَّذِينَ يُبَدِّلُونَهُ ۚ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ

[البقرة: 181]

সরল অনুবাদ

অতঃপর এ (বিধান) শোনার পরও যে এটিকে পরিবর্তন করে, তবে যে পরিবর্তন করবে, তার উপরেই অপরাধ বর্তাবে। নিশ্চয়, আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।
সূরার নাম — আল বাকারা | আয়াত নম্বর — ১৮১

আয়াতে কারীমাহ্

فَمَنْ خَافَ مِن مُّوصٍ جَنَفًا أَوْ إِثْمًا فَأَصْلَحَ بَيْنَهُمْ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

[البقرة: 182]

সরল অনুবাদ

তবে যদি কেউ অসিয়তকারীর (সম্পত্তি বণ্টনের নির্দেশদাতার) পক্ষপাতিত্ব অথবা অন্যায়ের আশংকা করে,[১] অতঃপর সে তাদের পরস্পরের মধ্যে (কিছু রদ-বদল করে) সন্ধি করে দেয়, তবে তার কোন দোষ নেই। নিশ্চয়ই আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।
সূরার নাম — আল বাকারা | আয়াত নম্বর — ১৮২

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

[১] পক্ষপাতিত্ব করা বা ঝুঁকে পড়া-এর অর্থ হল, ভুলে গিয়ে কোন এক আত্মীয়র প্রতি বেশী ঝুঁকে পড়ে অন্যের অধিকার হরণ করে। আর 'অন্যায়'-এর অর্থ হল, জেনে-শুনে এ রকম করা। (আইসারুত্ তাফাসীর) অথবা 'অন্যায়'এর অর্থ হল, অন্যায় অসিয়ত, যা পরিবর্তন করা এবং তা কার্যকরী না করা অত্যাবশ্যক। এ থেকে জানা গেল যে, অসিয়তে ন্যায় ও সুবিচারের খেয়াল রাখা খুবই জরুরী। তা না হলে দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার সময় অবিচার করার অপরাধে তার পারলৌকিক মুক্তি অতীব কঠিন হয়ে যাবে।

আয়াতে কারীমাহ্

وَالَّذِينَ يُتَوَفَّوْنَ مِنكُمْ وَيَذَرُونَ أَزْوَاجًا وَصِيَّةً لِّأَزْوَاجِهِم مَّتَاعًا إِلَى الْحَوْلِ غَيْرَ إِخْرَاجٍ ۚ فَإِنْ خَرَجْنَ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِي مَا فَعَلْنَ فِي أَنفُسِهِنَّ مِن مَّعْرُوفٍ ۗ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ

[البقرة: 240]

সরল অনুবাদ

তোমাদের মধ্যে যারা স্ত্রী রেখে মারা যায়, তারা তাদের স্ত্রীদের জন্য এই অসিয়ত করবে যে, তাদেরকে যেন এক বছর পর্যন্ত ভরণপোষণ দেওয়া হয়[১] এবং গৃহ থেকে বের করে দেওয়া না হয়, কিন্তু যদি (স্বেচ্ছায়) তারা বেরিয়ে যায়, তবে নিয়মমত নিজেদের জন্য যা করবে, তাতে তোমাদের কোন পাপ নেই। আল্লাহ পরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময়।
সূরার নাম — আল বাকারা | আয়াত নম্বর — ২৪০

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

[১] এই আয়াত ক্রমানুসারে পরে উল্লিখিত হলেও তা মানসুখ (রহিত)। এর রহিতকারী (২৩৪নং) আয়াত পূর্বেই উল্লিখিত হয়েছে, যাতে স্বামীর মৃত্যুর ইদ্দত চার মাস দশদিন বলা হয়েছে। এ ছাড়াও উত্তরাধিকার সম্পর্কীয় আয়াত স্ত্রীদের অংশ নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। কাজেই স্বামীকে স্ত্রীর জন্য কোন প্রকারের অসিয়ত (উইল) করার প্রয়োজন নেই। না বাসস্থানের, আর না খাওয়া-পরার।

আয়াতে কারীমাহ্

وَلِكُلٍّ جَعَلْنَا مَوَالِيَ مِمَّا تَرَكَ الْوَالِدَانِ وَالْأَقْرَبُونَ ۚ وَالَّذِينَ عَقَدَتْ أَيْمَانُكُمْ فَآتُوهُمْ نَصِيبَهُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدًا

[النساء: 33]

সরল অনুবাদ

(নারী-পুরুষ) সকলের জন্যই পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তির আমি উত্তরাধিকারী করেছি।[১] আর যাদের সাথে তোমরা অঙ্গীকারবদ্ধ তাদের (প্রাপ্য) অংশ তাদেরকে প্রদান কর। [২] নিঃসন্দেহে আল্লাহ সর্ব বিষয়ের প্রত্যক্ষদর্শী।
সূরার নাম — আন নিসা | আয়াত নম্বর — ৩৩

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

[১] مَوَالِيْ 'মাওয়ালী' হল مَوْلَى 'মাওলা'র বহুবচন। কয়েকটি অর্থে এটি ব্যবহার হয়। যেমন, বন্ধু, স্বাধীন করা ক্রীতদাস, চাচাতো ভাই এবং প্রতিবেশী। এখানে এর অর্থ হল ওয়ারেস বা উত্তরাধিকারী। অর্থাৎ, প্রত্যেক নারী-পুরুষের ত্যক্ত সম্পদের ওয়ারেস হবে তার পিতা-মাতা এবং অন্যান্য নিকটাত্মীয়রা。

[২] এই আয়াত রহিত, না রহিত নয় এ ব্যাপারে মুফাসসিরদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইবনে জারীর প্রভৃতি মুফাসসিরগণ এটিকে রহিত মানেন না এবং أَيْمَانُكُمْ (অঙ্গীকার বা চুক্তি) বলতে এমন শপথ ও অঙ্গীকারকে বুঝিয়েছেন যা একে অপরের সাহায্যের জন্য ইসলামের পূর্বে দুই ব্যক্তি অথবা দু'টি গোত্রের মধ্যে করা হয়েছে এবং ইসলামের পরেও তা বহাল আছে। نَصِيْبَهُمْ (অংশ) বলতে উক্ত শপথ ও অঙ্গীকার রক্ষা স্বরূপ পরস্পরের সাহায্য-সহযোগিতায় অংশগ্রহণ করাকে বুঝানো হয়েছে। আর ইবনে কাসীর এবং অন্য কিছু মুফাসসিরদের নিকট এ আয়াত রহিত। কেননা, أَيْمَانُكُمْ (অঙ্গীকার বা চুক্তি) বলতে তাঁদের নিকট সেই অঙ্গীকার, যা হিজরতের পর আনসারী ও মুহাজির সাহাবাগণের মাঝে ভ্রাতৃত্ব স্থাপনের মাধ্যমে হয়েছিল। এতে একজন মুহাজির সাহাবী আনসারী সাহাবীর মালের তাঁর আত্মীয়দের পরিবর্তে ওয়ারেস হতেন, কিন্তু এটা যেহেতু কেবল সাময়িক ব্যবস্থা স্বরূপ ছিল, তাই পরে
[وَأُولُوا الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَى بِبَعْضٍ فِي كِتَابِ اللهِ]
"যারা আত্মীয়, আল্লাহর বিধান মতে তারা পরস্পরের বেশী হকদার।" (আনফালঃ ৭৫) আয়াত নাযিল করে তা রহিত করে দিলেন। [فَآتُوهُمْ نَصِيبَهُمْ ] (তাদের (প্রাপ্য) অংশ তাদেরকে প্রদান কর) এর অর্থ বন্ধুত্ব, ভালবাসা ও এক অপরের সহযোগিতা; অনুরূপ অসীয়ত স্বরূপ কিছু দেওয়াও এর মধ্যে শামিল। বন্ধুত্বের বন্ধন এবং শপথ, অঙ্গীকার বা চুক্তিবন্ধন অথবা ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের ফলে ওয়ারেস হওয়ার কথা এখন আর ধারণাই করা যাবে না। আলেমদের একটি দল এ থেকে এমন দুই ব্যক্তিকে বুঝিয়েছেন, যাদের কমপক্ষে একজনের কোন ওয়ারেসই নেই। তারা পরস্পর এই চুক্তি করে যে, আমি তোমার বন্ধু। কোন অপরাধ করে ফেললে তুমি আমার সাহায্য করো। আর আমাকে হত্যা করা হলে, আমার রক্তপণ তুমি নিয়ে নিও। ফলে এই ওয়ারেসহীন ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার মাল উক্ত ব্যক্তি নিয়ে নেবে। তবে শর্ত হল, সত্যিকারেই যেন তার কোন ওয়ারেস না থাকে। অন্য একদল আলেম আয়াতের আরো এক অর্থ বর্ণনা করেছেন; তাঁরা বলেন, [وَالَّذِينَ عَقَدَتْ أَيْمَانُكُمْ] (যাদের সাথে তোমরা অঙ্গীকারবদ্ধ) থেকে স্ত্রী ও স্বামীকে বুঝানো হয়েছে এবং এর সম্পর্ক হল, الأَقْرَبُوْنَ (আত্মীয়-স্বজন) এর সাথে। অর্থ দাঁড়াবে, পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন এবং যাদের সাথে তোমরা অঙ্গীকারবদ্ধ (অর্থাৎ, স্বামী-স্ত্রী), তারা যা কিছু ছেড়ে যাবে, তাদের হকদার (ওয়ারেস) আমি নির্দিষ্ট করে দিয়েছি। অতএব এই হকদারদেরকে তাদের প্রাপ্য অংশ দিয়ে দাও। অর্থাৎ, পূর্বের আয়াতে বিস্তারিতভাবে মীরাসের অংশ নির্দিষ্ট করা হয়েছে, এখানে সংক্ষিপ্তাকারে তার প্রতি আরো একটু তাকীদ করা হয়েছে।