বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

বিষয়ঃ সালাম

(নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ আয়াত-এর তরজমা ও তাফসীর)

আয়াতে কারীমাহ্

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حَتَّىٰ تَسْتَأْنِسُوا وَتُسَلِّمُوا عَلَىٰ أَهْلِهَا ۚ ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ

[النور: 27]

সরল অনুবাদ

হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা নিজেদের গৃহ ব্যতীত অন্য কারও গৃহে গৃহবাসীদের অনুমতি না নিয়ে ও তাদেরকে সালাম না দিয়ে প্রবেশ করো না।[১] এটিই তোমাদের জন্য শ্রেয়, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।[২]
সূরার নাম — আন নূর | আয়াত নম্বর — ২৭

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

[১] পূর্বের আয়াতসমূহে ব্যভিচার, অপবাদ ও তার শাস্তির কথা ব্যক্ত করা হয়েছে। এখানে মহান আল্লাহ গৃহ-প্রবেশের কিছু নিয়ম-নীতি ও আদব-কায়দা বর্ণনা করছেন; যাতে নারী পুরুষের অবাধ মিলামেশা না ঘটে; যা সাধারণতঃ ব্যভিচার বা অপবাদের কারণ হয়ে থাকে। استِينَاس শব্দের অর্থ জানা। অর্থাৎ, যতক্ষণ তোমরা জানতে না পেরেছ যে, ঘরে কে আছে এবং সে তোমাদেরকে ভিতরে আসার অনুমতি না দিয়েছে, ততক্ষণ তোমরা ভিতরে প্রবেশ করবে না। কেউ কেউ تستَأنِسُوا কে تَستَأذِنُوا (অনুমতি নেওয়া) এর অর্থে ব্যবহার করেছেন, যেমন অনুবাদে প্রকাশ হয়েছে। আলোচ্য আয়াতে গৃহ-প্রবেশের অনুমতি নেওয়ার কথা আগে এবং সালাম দেওয়ার কথা পরে উল্লেখ হয়েছে। কিন্তু হাদীস হতে জানা যায় যে, নবী (সাঃ) প্রথমে সালাম দিতেন এবং পরে প্রবেশ করার অনুমতি নিতেন। অনুরূপ মহানবী (সাঃ)-এর এও অভ্যাস ছিল যে, তিনি তিন তিনবার অনুমতি চাইতেন। অতঃপর কোন উত্তর না পেলে তিনি ফিরে যেতেন। নবী (সাঃ)-এর বরকতময় এ অভ্যাসও ছিল যে, অনুমতি চাওয়ার সময় দরজার ডানে অথবা বামে দাঁড়াতেন এবং একেবারে সামনে দাঁড়াতেন না যাতে (দরজা খোলা থাকলে অথবা খোলা হলে) সরাসরি ভিতরে নজর না পড়ে। (বুখারীঃ ইসতি'যান অধ্যায়, আহমদ ৩/১৩৮, আবু দাউদঃ আদব অধ্যায়) অনুরূপ তিনি দরজায় দাঁড়িয়ে ভিতরে উঁকি মারতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। এমনকি বাড়ির ভিতরে যে উঁকি মারে সে ব্যক্তির চোখ বাড়ির লোকে নষ্ট করে দিলেও তার কোন অপরাধ নেই। (বুখারীঃ দিয়াত অধ্যায়, মুসলিমঃ কিতাবুল আদাব) মহানবী (সাঃ)-এর এটাও অপছন্দ ছিল যে, ভিতর থেকে বাড়ির মালিক 'কে তুমি?' জিজ্ঞাসা করলে, তার উত্তরে নাম না বলে কেবল 'আমি' বলা। অর্থাৎ, 'কে' জিজ্ঞাসা করা হলে উত্তরে নিজের নামসহ পরিচয় দিতে হবে। (বুখারীঃ ইসতে'যান অধ্যায়, মুসলিমঃ আদাব অধ্যায়)

[২] অর্থাৎ, উপদেশ কাজে বাস্তবায়ন করা। অর্থাৎ, হুট করে ঘরে প্রবেশ করা অপেক্ষা অনুমতি নিয়ে ও সালাম দিয়ে গৃহবাসী ও অতিথি উভয়ের জন্যই শ্রেয়।

আয়াতে কারীমাহ্

لَّيْسَ عَلَى الْأَعْمَىٰ حَرَجٌ وَلَا عَلَى الْأَعْرَجِ حَرَجٌ وَلَا عَلَى الْمَرِيضِ حَرَجٌ وَلَا عَلَىٰ أَنفُسِكُمْ أَن تَأْكُلُوا مِن بُيُوتِكُمْ أَوْ بُيُوتِ آبَائِكُمْ أَوْ بُيُوتِ أُمَّهَاتِكُمْ أَوْ بُيُوتِ إِخْوَانِكُمْ أَوْ بُيُوتِ أَخَوَاتِكُمْ أَوْ بُيُوتِ أَعْمَامِكُمْ أَوْ بُيُوتِ عَمَّاتِكُمْ أَوْ بُيُوتِ أَخْوَالِكُمْ أَوْ بُيُوتِ خَالَاتِكُمْ أَوْ مَا مَلَكْتُم مَّفَاتِحَهُ أَوْ صَدِيقِكُمْ ۚ لَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَن تَأْكُلُوا جَمِيعًا أَوْ أَشْتَاتًا ۚ فَإِذَا دَخَلْتُم بُيُوتًا فَسَلِّمُوا عَلَىٰ أَنفُسِكُمْ تَحِيَّةً مِّنْ عِندِ اللَّهِ مُبَارَكَةً طَيِّبَةً ۚ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمُ الْآيَاتِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ

[النور: 61]

সরল অনুবাদ

অন্ধের জন্য, খঞ্জের জন্য, রুগ্‌ণের জন্য এবং তোমাদের নিজেদের জন্য তোমাদের নিজেদের গৃহে আহার করা দূষণীয় নয়[১] অথবা তোমাদের পিতৃগণের গৃহে, মাতৃগণের গৃহে, ভ্রাতৃগণের গৃহে, ভগিনীগণের গৃহে, পিতৃব্যদের গৃহে, ফুফুদের গৃহে, মাতুলদের গৃহে, খালাদের গৃহে অথবা সে সব গৃহে যার চাবি তোমাদের হাতে আছে অথবা তোমাদের বন্ধুদের গৃহে; [২] তোমরা একত্রে আহার কর অথবা পৃথক পৃথকভাবে আহার কর,[৩] তাতে তোমাদের জন্য কোন অপরাধ নেই; তবে যখন তোমরা গৃহে প্রবেশ করবে, তখন তোমরা তোমাদের স্বজনদের প্রতি সালাম বলবে।[৪] এ হবে আল্লাহর নিকট হতে কল্যাণময় ও পবিত্র অভিবাদন। এভাবে তোমাদের জন্য নিদর্শনাবলী বিশদভাবে বিবৃত করেন; যাতে তোমরা বুঝতে পার।
সূরার নাম — আন নূর | আয়াত নম্বর — ৬১

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

[১] এর একটি অর্থ এই বলা হয়েছে যে, জিহাদে যাওয়ার সময় সাহাবা (রাঃ)গণ আয়াতে উল্লিখিত অক্ষম সাহাবাদেরকে নিজেদের ঘরের চাবি দিয়ে যেতেন এবং তাদেরকে তাঁদের ঘরের জিনিস-পত্র খাওয়া-পান করার অনুমতি দিয়ে রাখতেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই সব অক্ষম সাহাবা (রাঃ)গণ মালিকের বিনা উপস্থিতিতে সেখান হতে খাওয়া-পান করা অবৈধ মনে করতেন। আল্লাহ বললেন, উক্ত লোকদের জন্য নিজের আত্মীয়দের ঘর হতে বা যে সব ঘরের চাবি তাদের কাছে রয়েছে, সে সব ঘর হতে পানাহার করতে কোন পাপ বা দোষ নেই। আবার কেউ কেউ এর অর্থ বলেছেন যে, সুস্থ-সক্ষম সাহাবারা অসুস্থ-অক্ষম সাহাবাদের সাথে খেতে এই জন্য অপছন্দ করতেন, কারণ তাঁরা অক্ষমতার কারণে কম খাবেন, আর নিজেরা হয়তো বেশি খেয়ে ফেলবেন, যার ফলে তাঁদের প্রতি অন্যায় ও বে-ইনসাফী না হয়ে যায়। অনুরূপ অক্ষম সাহাবাগণ অন্য সক্ষম লোকদের সাথে খাওয়া এই জন্য পছন্দ করতেন না, যাতে কেউ তাঁদের সাথে খেতে ঘৃণা না করে। আল্লাহ তাআলা উভয় দলকেই পরিষ্কার করে দিলেন যে, এতে কোন পাপ নেই。

[২] এ অনুমতি সত্ত্বেও কিছু উলামাগণ পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, উপরে যে খাবার খাওয়ার কথা বলা হয়েছে, তা মামুলী ধরনের সাধারণ খাবার, যা খেলে কারো মনে ক্ষতির অনুভূতি হয় না। অবশ্য এমন ভালো জিনিস যা মালিক বিশেষভাবে নিজের জন্য গোপন করে রেখেছে, যাতে তার উপর কারো দৃষ্টি না পড়ে, অনুরূপ জমাকৃত মালপত্র; এ সব খাওয়া ও ব্যবহার করা বৈধ নয়। (আইসারুত্ তাফাসীর) এখানে 'তোমাদের নিজেদের জন্য তোমাদের নিজেদের গৃহে' বলতে নিজ সন্তানের গৃহকে বুঝানো হয়েছে। যেহেতু সন্তানের ঘর নিজের ঘর। যেমন, হাদীসে বলা হয়েছে, "তুমি ও তোমার সম্পদ সবই তোমার পিতার।" (ইবনে মাজাহ ২২৯১নং, আহমাদ ২/১৭৯,২০৪, ২১৪) অন্য একটি হাদীসে এসেছে, "মানুষের সন্তান তারই উপার্জন।" (আবু দাউদ ৩৫২৮, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ ২১৩৭নং)

[৩] এখানে অন্য একটি সংকীর্ণতা দূর করা হয়েছে। কিছু মানুষ একাকী খাওয়া পছন্দ করত না বরং কাউকে নিয়ে খাওয়া জরুরী মনে করত। আল্লাহ বললেন, 'একসাথে খাও বা একাকী, সবই জায়েয, কোনটাতে পাপ নেই।' অবশ্য একসঙ্গে খাওয়াতে অধিক বরকত লাভ হয়। যেমন কিছু হাদীস হতে এ কথা জানা যায়। (ইবনে কাসীর)

[৪] এই আয়াতে নিজ গৃহে প্রবেশের কিছু আদব বর্ণনা করা হয়েছে। আর তা হল এই যে, প্রবেশের সময় বাড়ির লোকদেরকে সালাম দাও। মানুষ নিজের স্ত্রী-সন্তানদের উপর সালাম করা বোঝা বা অপ্রয়োজনীয় মনে করে। কিন্তু ঈমানদার ব্যক্তির জন্য জরুরী আল্লাহর আদেশ পালন করে সালাম দেওয়া। নিজের স্ত্রী-সন্তানদেরকে শান্তির দু'আ দেওয়া থেকে কেন বঞ্চিত রাখা হবে?

আয়াতে কারীমাহ্

وَإِذَا جَاءَكَ الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِآيَاتِنَا فَقُلْ سَلَامٌ عَلَيْكُمْ ۖ كَتَبَ رَبُّكُمْ عَلَىٰ نَفْسِهِ الرَّحْمَةَ ۖ أَنَّهُ مَنْ عَمِلَ مِنكُمْ سُوءًا بِجَهَالَةٍ ثُمَّ تَابَ مِن بَعْدِهِ وَأَصْلَحَ فَأَنَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

[الأنعام: 54]

সরল অনুবাদ

যারা আমার নিদর্শনে বিশ্বাস করে, তারা যখন তোমার নিকট আসে, তখন তাদেরকে তুমি বলো, ‘তোমাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক,[১] তোমাদের প্রতিপালক দয়া করা নিজ কর্তব্য বলে স্থির করেছেন।[২] তোমাদের মধ্যে কেউ অজ্ঞানতাবশতঃ যদি খারাপ কাজ করে অতঃপর তওবা (অনুশোচনা) করে এবং (নিজেকে) সংশোধন করে, তাহলে তো আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’[৩]
সূরার নাম — আল আনআম | আয়াত নম্বর — ৫৪

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

[১] অর্থাৎ, তাদেরকে সালাম করে অথবা তাদের সালামের উত্তর দিয়ে তাদের সম্মান কর এবং তাদেরকে মর্যাদা দাও।

[২] আর তাদেরকে সুসংবাদ দাও যে, অনুগ্রহ স্বরূপ মহান আল্লাহ তাঁর কৃতজ্ঞ বান্দাদের প্রতি স্বীয় করুণা বর্ষণের ফায়সালা করে রেখেছেন। যেমন, হাদীসে এসেছে যে, যখন আল্লাহ তাআলা বিশ্বজগৎ সৃষ্টির কাজ সমাপ্ত করেন, তখন তিনি আরশে লিখে দেন যে, ((إِنَّ رَحْمَتِيْ تَغْلِبُ غَضَبِيْ)) "অবশ্যই আমার রহমত আমার ক্রোধের উপর বিজয়ী।" (বুখারী, মুসলিম)

[৩] এতেও ঈমানদারদের জন্য সুসংবাদ রয়েছে। কেননা, এ গুণ তাদেরই যে, অজানতে অথবা মানবিক চাহিদার দাবীতে তারা কোন পাপ করে বসলে, সত্বর তাওবা করে নিজেদের সংশোধন করে নেvয়। অব্যাহতভাবে পাপ করে না এবং তাওবা ও প্রত্যাবর্তন থেকেও বিমুখতা অবলম্বন করে না।